পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে দেশজুড়ে। কারাগারে তাঁর নিরাপত্তা নিয়ে পাকিস্তানি সরকারের বক্তব্য ও পিটিআই-এর পাল্টা অভিযোগ এক অদ্ভুত রাজনৈতিক সঙ্কট তৈরি করেছে।
সম্প্রতি ইমরান খানের মৃত্যুর গুজব সোশ্যাল মিডিয়ায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। যদিও পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট জানিয়েছে—ইমরান খান পুরোপুরি নিরাপদ, আর্মি মনিটরিংয়ের মধ্যে রয়েছেন এবং কোনো ক্ষতির আশঙ্কা নেই। তবুও, পিটিআই নেতৃত্ব এই বিবৃতিকে বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে করছে না এবং একটি স্বাধীন, আন্তর্জাতিক মানের তদন্ত কমিশন গঠনের দাবি তুলেছে।
ইমরান খানের বিরুদ্ধে আনা বিভিন্ন মামলার জেরেই তিনি বর্তমানে কারাবন্দী। রাজনৈতিক মহলের মতে, তাঁর জনপ্রিয়তা দেশের ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর জন্য চিরকালই একটি চ্যালেঞ্জ। তাই তাঁর কারাজীবন নিয়ে গুজব, উত্তেজনা ও তথ্যযুদ্ধ—সবই পাকিস্তানের অশান্ত ক্ষমতার লড়াইয়ের প্রতিচ্ছবি।
এ পরিস্থিতি যত বাড়ছে, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরাও উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। পাকিস্তানে নির্বাচন-পরবর্তী অস্থিতিশীলতা, বিচার ব্যবস্থার রাজনৈতিক ব্যবহার, সেনাবাহিনীর প্রভাব—সব মিলিয়ে ইমরান খানকে ঘিরে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।
সরকারের দাবি—‘ইমরান খান সম্পূর্ণ নিরাপদ’**

ইসলামাবাদ প্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইমরান খানের প্রতি কোনো ধরনের হুমকির প্রমাণ নেই। তাঁকে ‘হাই-সিকিউরিটি উইং’-এ রাখা হয়েছে এবং সেনাবাহিনীসহ বহু সংস্থা তাঁর অবস্থার ওপর নজর রাখছে।
সরকারের দাবি, খানের ‘স্বাস্থ্য ভালো’, তাঁকে প্রতিনিয়ত মেডিক্যাল চেক-আপ করানো হচ্ছে এবং কারাজীবন নিয়ে যে কোনো ধরনের বিভ্রান্তিকর খবর সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান—গুজবকে কেন্দ্র করে সোশ্যাল মিডিয়ায় রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা হচ্ছে। তাঁদের মতে, পিটিআই ইচ্ছাকৃতভাবে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করে আন্তর্জাতিক সাপোর্ট পেতে চাইছে।
তবে এই অবস্থানকে বিশেষজ্ঞরা সর্বসম্মতভাবে বিশ্বাস করতে পারছেন না। পাকিস্তানে আগেও বহু রাজনৈতিক বন্দির নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ফলে সরকারের কোনো বিবৃতিই এখন জনগণের কাছে সম্পূর্ণ গ্রহণযোগ্য মনে হচ্ছে না।
পিটিআই-এর অভিযোগ—‘স্বাধীন তদন্ত না হলে সত্য প্রকাশ পাবে না’**

পিটিআই নেতৃত্ব সরাসরি অভিযোগ করেছে—সরকার ইমরান খানের বাস্তব পরিস্থিতি গোপন করছে। তাঁদের মতে, জেলের ভেতরের তথ্য নিয়ন্ত্রিত, বাহিরের সঙ্গে যোগাযোগ সীমিত এবং আইনজীবীদেরও সবসময় দেখা করার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না।
এক শীর্ষস্থানীয় পিটিআই মুখপাত্র জানান—ইমরান খানের বিরুদ্ধে ‘রাজনৈতিকভাবে নির্মিত’ মামলা চলছে, আর কারাগারে তাঁর নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধ। তাই একটি নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক কমিশনই একমাত্র সমাধান।
দলটির আরও দাবি, সরকারি বিবৃতিতে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। যদি সব সত্যিই স্বাভাবিক হয়, তবে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক বা মানবাধিকার সংগঠনগুলোকে জেল পরিদর্শনের অনুমতি দিতে বাধা কোথায়?
এই উত্তেজনার মাঝে পিটিআই সমর্থকদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। তাঁরা মনে করছেন—ইমরান খানকে রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় করতে একটি বড় ষড়যন্ত্র চলছে, যার অংশ হিসেবেই এই অস্পষ্টতা।
গুজবের জেরে আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগ বাড়ছে**

ইমরান খানের প্রতি সম্ভাব্য হুমকি বা দুর্ব্যবহারের জল্পনা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও তুমুল আলোচনা তুলেছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন পাকিস্তানের বিচারব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার দফতর থেকেও বলা হয়েছে—রাজনৈতিক বন্দিদের সঙ্গে আচরণে স্বচ্ছতা ও আইন-সম্মত প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা জরুরি। ইমরান খানের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠছে তা দ্রুত দূর করা উচিত।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই বিতর্ক পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতার প্রতিফলন। সেনাবাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা, রাজনৈতিক দল—সবাই যে ক্ষমতার লড়াইয়ে যুক্ত, তা এ ঘটনার মাধ্যমে আবারও স্পষ্ট।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, যদি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দুর্বল করার নামে ইমরান খানের ক্ষতি হয়, তবে তা পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য মারাত্মক ইঙ্গিত বয়ে আনবে।
পাকিস্তানে ইমরান খানের অবস্থানকে ঘিরে যে তীব্র বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে, তা দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, শাসনব্যবস্থা ও সেনাবাহিনীর ভূমিকাকে নতুন করে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। সরকারের দাবি সত্ত্বেও জনগণের বড় অংশ নিশ্চিত নন যে ইমরান খান সত্যিই নিরাপদ।
পিটিআই-এর স্বাধীন তদন্ত দাবি পরিস্থিতিকে আরও আলোচনার কেন্দ্রে এনে দিয়েছে। গুজব, তথ্যযুদ্ধ ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচার—সব মিলিয়ে পাকিস্তানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে।
আগামী দিনগুলোতে সরকার, আদালত ও আন্তর্জাতিক মহলের পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে—ইমরান খানের নিরাপত্তা বিতর্ক কোন দিকে যায়, এবং পাকিস্তান কি সত্যিই একটি স্বচ্ছ ও গণতান্ত্রিক পথ বেছে নিতে পারে।






