পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে ঘিরে সাম্প্রতিক জল্পনা যেন থামছেই না। রাজনৈতিক নাটক, কারাবন্দি থাকা, দলীয় চাপে তদন্তের দাবি—সব মিলিয়ে তাঁকে কেন্দ্র করে চাঞ্চল্য প্রতিদিনই নতুন মোড় নিচ্ছে। তবে তাঁর জীবনের অতীত অধ্যায়—বিশেষ করে ব্যক্তিগত সম্পর্ক—আজও সমানভাবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
বিশেষ করে বলিউডের চিরসবুজ অভিনেত্রী রেখার সঙ্গে ইমরানের সম্পর্ক বহু দশক ধরে রহস্যের আবরণে ঢাকা। ভারত-পাকিস্তানের দুই প্রান্তের দুই তারকার চমকপ্রদ রসায়ন তখন বলিউড থেকে ক্রিকেট দুনিয়া—সব জায়গাতেই গুঞ্জন তুলেছিল। সেই সময় প্রায় পাকা হয়েছিল বিয়ের কথাও, এমনটা দাবি বহু আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে।
কিন্তু কেন শেষ পর্যন্ত সেই সম্পর্ক অঙ্কুরেই ঝরে গেল? কেন ভেঙে গেল এমন একটি সম্পর্ক, যা যদি পূর্ণতা পেত, তবে হয়তো উপমহাদেশের পপ-কালচারের ইতিহাসই অন্যরকম হতো?
এই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হল সেই রহস্যঘেরা অধ্যায়—ইমরান ও রেখার ‘প্রকাশ্যে অপ্রকাশ্য’ সম্পর্কের সেই হারিয়ে যাওয়া অধ্যায়, যা আজও মানুষের কৌতূহলের কেন্দ্রে।
রেখা–ইমরান সম্পর্কের সূচনা: গ্ল্যামার ও মিস্ট্রির এক অদ্ভুত মিশেল

৮০–র দশক ছিল ইমরান খানের ক্রিকেট-খ্যাতির চূড়ান্ত সময়। লন্ডন থেকে মুম্বাই—সব জায়গায় তাঁর উপস্থিতি ছিল আলোচনার প্রধান আকর্ষণ। অন্যদিকে, তখন বলিউডের জগতে নিজের ক্যারিয়ারের শীর্ষে পৌঁছে গিয়েছেন রেখা।
বলা হয়ে থাকে, একাধিক আন্তর্জাতিক ফটোশুট এবং মুম্বাই-লন্ডনের সামাজিক অনুষ্ঠানে তাঁদের দেখা-সাক্ষাৎ বাড়তে থাকে। সেই সব আলাপ থেকেই জন্ম নেয় ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা। ইমরানের ব্যক্তিত্ব, সৌজন্য, বুদ্ধিমত্তা ও ক্যারিশমায় নাকি মুগ্ধ হয়েছিলেন রেখা। আবার রেখার কিংবদন্তি সত্তা, বর্ণময় জীবন ও চৌম্বক আকর্ষণ ইমরানকে টেনে নিয়েছিল বলে দাবি শোবিজ মহলের।
সে সময়ের পাকিস্তানি ও ভারতীয় ম্যাগাজিনগুলোর অনেক প্রতিবেদনেই ইঙ্গিত ছিল—এই সম্পর্ক ‘গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে’ পৌঁছে গিয়েছিল। এমনকি বিয়ের কথাও উঠেছিল।
কিন্তু সেই আলোয় আড়ালে জমে উঠছিল বিতণ্ডার ছায়াও।
বিয়ের পথে বাধা: সংস্কৃতি, রাজনীতি ও ব্যক্তিগত দ্বিধা

দু’জনের সম্পর্ক গা ছমছমে রহস্যের মতো এগোলেও বাস্তবে তাকে আটকে দেয় বহু বাস্তব কারণে।
১. ভারত–পাকিস্তান সম্পর্কের জটিলতা
উপমহাদেশের দুই দেশের রাজনৈতিক উত্তেজনা তখনও চরমে। এক দেশের তারকা আরেক দেশের বৃহত্তর পাবলিক ফিগারের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ালে যে বিতর্ক সৃষ্টি হবে, তা দু’জনই জানতেন। ইমরান তখনই কেবল ক্রিকেটার নন; ভবিষ্যতে তাঁর রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাও গুঞ্জনের বিষয় ছিল। রেখাও বলিউডে বহু বিতর্কে জড়িত ছিলেন। দুই বিতর্কপ্রবণ মানুষকে নিয়ে সীমান্ত জুড়ে যে সমালোচনা উঠতে পারে, তা তাঁদের দু’জনকেই ভাবনায় ফেলেছিল।
২. জীবনযাপনের প্রকট পার্থক্য
ইমরান ছিলেন একদিকে সরল, সাদামাটা জীবনযাপনের পক্ষে; অন্যদিকে রেখা পরিচিত ছিলেন বিলাসবহুল, আবেগপ্রবণ এবং শিল্পময় জীবনদর্শনের জন্য। তাঁদের দু’জনের জীবনের রিদমই ছিল আলাদা। কাছের মহলের বক্তব্য—এ পার্থক্যই পরিণতি আনার পথে বড় অন্তরায় হয়।
৩. ইমরানের পরিবারের আপত্তি
ইমরান খানের পরিবার ছিল রক্ষণশীল পটভূমির। বলিউড অভিনেত্রী, তাও রহস্যময় ব্যক্তিগত জীবনের বরণীয় তারকা—রেখাকে পরিবারের অনেকেই মেনে নিতে পারেননি বলে দাবি একাধিক সংবাদমাধ্যমে।
৪. রেখার ব্যক্তিগত সংকট
সে সময় রেখার জীবনও নানা ব্যক্তিগত ঝড়ে জর্জরিত ছিল—সম্পর্ক ভাঙন, পেশাগত চাপ, মিডিয়ার নজরদারি—সবই তাঁকে মানসিকভাবে অস্থির করে তুলেছিল। নতুন সম্পর্কে প্রবেশের মানসিক প্রস্তুতি হয়তো পুরোপুরি ছিল না।
এই কারণগুলি মিলিয়ে ধীরে ধীরে দূরত্ব বাড়তে থাকে। আলোচনায় আসা বিয়ের কথা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি।
গুঞ্জনের শেষ অধ্যায়: নীরবতা, বিচ্ছেদ ও পরবর্তী জীবন

ক্রিকেট থেকে রাজনীতিতে যাত্রা শুরু করেন ইমরান খান। পরে বিবাহিত হন জেমাইমা গোল্ডস্মিথের সঙ্গে, এরপর আরও দু’বার বিয়ে করেন। রেখা নিজের জীবনকে ক্রমশ গুটিয়ে নেন গ্ল্যামারের আড়ালে।
উভয়েই কখনও প্রকাশ্যে সম্পর্ক স্বীকার বা অস্বীকার করেননি। অতীতের সেই অধ্যায় রয়ে গেছে রহস্যের পর্দায়। তবে সময়ের সঙ্গে স্থির হয়ে গেছে একটি বিষয়—এ সম্পর্ক যদি পূর্ণতা পেত, উপমহাদেশের পপ-কালচার অন্য মোড় নিতে পারত।
বর্তমানের রাজনৈতিক আলোচনায় ইমরান খানকে ঘিরে যত বিতর্কই থাক, তাঁর ব্যক্তিজীবনের এই অধ্যায় এখনও মানুষের কৌতূহলের অন্যতম উৎস। আর রেখা—চিরকালই এক রহস্যময় প্রতীক হয়ে—এই গল্পটাকে আরও সূক্ষ্ম রহস্যে ঢেকে রাখেন।
ইমরান খান ও রেখা—দু’জনই তাঁদের নিজ নিজ জগতের কিংবদন্তি। তাঁদের সম্ভাব্য সম্পর্ক ও বিয়ের গল্প শুধু তারকাখ্যাতির কারণে নয়, বরং দুই সংস্কৃতি, দুই ইতিহাস, দুই আবেগের অদ্ভুত মিলন বলে মানুষের মনে জায়গা করে থেকে গেছে।
কারণটি যতই রহস্যে আচ্ছন্ন থাক, একটি বিষয় স্পষ্ট—এ সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া উপমহাদেশের ইতিহাসকে নীরবে বদলে দিয়েছে। ইমরান রাজনীতির ঝড়ে এবং রেখা চিরাচরিত রহস্যময়তা নিয়ে এগিয়ে গেছেন নিজেদের পথে; কিন্তু তাঁদের সেই ‘অসম্পূর্ণ অধ্যায়’ এখনও রয়ে গেছে অমলিন।






