ভারতের হোটেল ও হসপিটালিটি শিল্প ২০২৬ সালের শুরুতেই নতুন বিনিয়োগ ও কর্পোরেট চুক্তির জোয়ারে ভাসছে। মহামারির ধাক্কা কাটিয়ে পর্যটন ও ব্যবসায়িক ভ্রমণ ফের চাঙ্গা হওয়ায় দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নজর এখন ভারতের হোটেল বাজারে।
বিলাসবহুল রিসর্ট থেকে বাজেট হোটেল, বিজনেস ট্রাভেলারদের জন্য সার্ভিসড অ্যাপার্টমেন্ট থেকে স্টার্টআপ-চালিত হসপিটালিটি প্ল্যাটফর্ম—সব ক্ষেত্রেই বাড়ছে ডিল অ্যাক্টিভিটি। ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিকে শুরু হওয়া এই বিনিয়োগ প্রবণতা ২০২৬ সালে আরও গতি পেয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের অভ্যন্তরীণ পর্যটনের শক্ত ভিত, আন্তর্জাতিক ফ্লাইট কানেক্টিভিটির উন্নতি এবং বড় শহরের পাশাপাশি টিয়ার-২ ও টিয়ার-৩ শহরে হোটেল চাহিদা বৃদ্ধি এই বিনিয়োগের মূল চালিকাশক্তি।
এই প্রেক্ষাপটে, হোটেল শিল্পে বাড়তে থাকা মার্জার, অধিগ্রহণ ও প্রাইভেট ইকুইটি বিনিয়োগ শুধু ব্যবসায়িক আত্মবিশ্বাসের ইঙ্গিতই নয়, বরং ভারতের হসপিটালিটি সেক্টরের দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনার প্রতিফলনও বটে।
বিনিয়োগকারীদের নজরে ভারতের হোটেল বাজার

গত এক বছরে ভারতের হোটেল শিল্পে প্রাইভেট ইকুইটি ও ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফান্ডের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বড় কর্পোরেট গোষ্ঠীর পাশাপাশি গ্লোবাল হোটেল চেইনগুলোও ভারতকে তাদের পরবর্তী গ্রোথ ডেস্টিনেশন হিসেবে দেখছে।
বিশেষ করে দিল্লি, মুম্বই, বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদ এবং কলকাতার মতো মেট্রো শহরে বিলাসবহুল ও আপস্কেল হোটেলের জন্য বিনিয়োগ বাড়ছে। পাশাপাশি উত্তর-পূর্ব ভারত, হিমালয় সংলগ্ন অঞ্চল ও উপকূলীয় পর্যটন কেন্দ্রগুলিতেও নতুন রিসর্ট প্রকল্পে অর্থ ঢালছেন বিনিয়োগকারীরা।
বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের হোটেল রুমের ঘাটতি এখনো প্রকট। আন্তর্জাতিক মানের হোটেলের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় নতুন প্রকল্পে রিটার্নের সম্ভাবনা বেশি। এই বাস্তবতাই বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াচ্ছে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দীর্ঘমেয়াদি লিজ মডেল ও অ্যাসেট-লাইট স্ট্র্যাটেজি। অনেক হোটেল ব্র্যান্ড নিজেরা সম্পত্তি না কিনেও অপারেশনাল মডেলে প্রবেশ করছে, যা বিনিয়োগ ঝুঁকি কমিয়ে লাভের সম্ভাবনা বাড়াচ্ছে।
কর্পোরেট ডিল, মার্জার ও সম্প্রসারণের ধারা

২০২৬ সালে হোটেল শিল্পে কর্পোরেট ডিলের সংখ্যা চোখে পড়ার মতো। একাধিক মিড-সাইজ হোটেল চেইন বড় ব্র্যান্ডের সঙ্গে মার্জ করছে বা কৌশলগত অংশীদারিত্বে যাচ্ছে। এর ফলে বাজারে প্রতিযোগিতা যেমন বাড়ছে, তেমনই পরিষেবার মানও উন্নত হচ্ছে।
বাজেট ও মিড-স্কেল হোটেল সেগমেন্টে বিশেষভাবে এই প্রবণতা স্পষ্ট। ব্যবসায়িক ভ্রমণকারী ও তরুণ পর্যটকদের লক্ষ্য করে নতুন ব্র্যান্ডিং, ডিজিটাল বুকিং সিস্টেম এবং লয়্যালটি প্রোগ্রাম চালু করা হচ্ছে।
একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক হোটেল ব্র্যান্ডগুলিও ভারতীয় সংস্থার সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে নতুন প্রপার্টি চালু করছে। এতে বিদেশি ম্যানেজমেন্ট দক্ষতা ও স্থানীয় বাজার বোঝাপড়ার মেলবন্ধন ঘটছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মার্জার ও অধিগ্রহণের ফলে অপারেশনাল খরচ কমছে এবং স্কেলিং সহজ হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এটি ভারতের হোটেল শিল্পকে আরও সংগঠিত ও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলবে।
টিয়ার-২ ও টিয়ার-৩ শহরে হসপিটালিটি বুম


আগে যেখানে হোটেল বিনিয়োগ মূলত বড় শহরেই সীমাবদ্ধ ছিল, এখন সেই চিত্র বদলাচ্ছে। উন্নত সড়ক, বিমানবন্দর ও রেল সংযোগের ফলে ছোট শহর ও পর্যটন কেন্দ্রগুলিতে ভ্রমণকারীর সংখ্যা বাড়ছে।
কর্পোরেট মিটিং, গন্তব্য বিবাহ এবং অভ্যন্তরীণ পর্যটনের চাহিদা টিয়ার-২ ও টিয়ার-৩ শহরে নতুন হোটেল প্রকল্পের পথ খুলে দিয়েছে। তুলনামূলক কম জমির দাম ও অপারেশনাল খরচ বিনিয়োগকারীদের জন্য বাড়তি আকর্ষণ তৈরি করছে।
এছাড়া, এই শহরগুলিতে স্থানীয় কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়ছে। হোটেল শিল্পের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে খাদ্য, পরিবহণ ও পরিষেবা খাতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী পাঁচ বছরে ভারতের হোটেল শিল্পের সবচেয়ে বড় গ্রোথ আসবে এই ছোট ও মাঝারি শহরগুলি থেকেই।
সব মিলিয়ে, ২০২৬ সালে ভারতের হোটেল ও হসপিটালিটি শিল্প এক নতুন বিনিয়োগ চক্রের মধ্যে প্রবেশ করেছে। বাড়তে থাকা কর্পোরেট ডিল, প্রাইভেট ইকুইটি ফান্ডিং এবং টিয়ার-২ ও টিয়ার-৩ শহরের উত্থান এই শিল্পকে আরও শক্ত ভিত দিচ্ছে।
পর্যটন ও ব্যবসায়িক ভ্রমণের ধারাবাহিক বৃদ্ধি বজায় থাকলে, আগামী দিনে ভারতের হোটেল বাজার শুধু এশিয়াতেই নয়, বিশ্ব মঞ্চেও আরও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান দখল করতে পারে।






