চলতি অর্থবর্ষের শুরুতেই দেশের কর-সংগ্রহ সংক্রান্ত পরিসংখ্যান নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে। সদ্য প্রকাশিত তথ্যে দেখা যাচ্ছে, গ্রস ডাইরেক্ট ট্যাক্স সংগ্রহ ৪ শতাংশ বেড়েছে, কিন্তু একই সময়ে ট্যাক্স রিফান্ড কমেছে প্রায় ১৭ শতাংশ। প্রথম নজরে এই তথ্য স্বস্তির মনে হলেও, এর ভেতরের অর্থনীতি ও প্রশাসনিক ইঙ্গিত যথেষ্ট গভীর।
ডাইরেক্ট ট্যাক্স মানে এমন কর, যা সরাসরি ব্যক্তি বা সংস্থার আয়ের উপর আরোপিত হয়—ইনকাম ট্যাক্স, কর্পোরেট ট্যাক্স ইত্যাদি। এই খাতের বৃদ্ধি সাধারণত অর্থনীতির আনুষ্ঠানিকতার প্রসার, আয় বৃদ্ধির ধারা এবং কর প্রশাসনের দক্ষতার ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু রিফান্ড কমে যাওয়া একাধিক প্রশ্নও তুলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দুই বিপরীত প্রবণতা একসঙ্গে দেখা যাওয়া মানে শুধু রাজস্ব বৃদ্ধির গল্প নয়, বরং কর ব্যবস্থার কড়াকড়ি, মূল্যায়ন প্রক্রিয়া এবং সরকারের নগদ প্রবাহ কৌশলের দিকেও ইঙ্গিত করছে। সাধারণ করদাতা থেকে বড় কর্পোরেট—সবাই এই পরিবর্তনের প্রভাব অনুভব করছে।
তাহলে প্রশ্ন উঠছেই—এই ৪ শতাংশ বৃদ্ধি ও ১৭ শতাংশ রিফান্ড হ্রাস আসলে কী বোঝাচ্ছে? অর্থনীতি কি সত্যিই শক্ত ভিতের উপর দাঁড়াচ্ছে, নাকি এটি সাময়িক প্রশাসনিক সমন্বয়ের ফল?
গ্রস ডাইরেক্ট ট্যাক্স বাড়ার নেপথ্যের কারণ

গ্রস ডাইরেক্ট ট্যাক্সে ৪ শতাংশ বৃদ্ধির পেছনে একাধিক কাঠামোগত ও নীতিগত কারণ কাজ করছে। প্রথমত, কর্পোরেট লাভে স্থিতিশীলতা এসেছে। গত কয়েক বছরে কর্পোরেট ট্যাক্স কাঠামো সরলীকরণের ফলে বহু সংস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের আয় ঘোষণা করতে আগ্রহী হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও ডেটা অ্যানালিটিক্স ব্যবস্থার উন্নতির ফলে কর ফাঁকি দেওয়া আগের মতো সহজ নয়। প্যান-আধার লিঙ্কিং, ডিজিটাল লেনদেনের নজরদারি এবং স্বয়ংক্রিয় স্ক্রুটিনি সিস্টেম কর প্রশাসনকে আরও কার্যকর করেছে।
তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিক হল চাকরি ও বেতনের স্থিতি। সংগঠিত ক্ষেত্রের বেতনভোগী কর্মীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে টিডিএস সংগ্রহও বেড়েছে। এর প্রভাব সরাসরি ডাইরেক্ট ট্যাক্সের মোট অঙ্কে পড়ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই বৃদ্ধি খুব বড় লাফ না হলেও এটি ধারাবাহিক হলে রাজস্ব ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের জন্য বড় সহায়ক হতে পারে।
ট্যাক্স রিফান্ড ১৭% কমার অর্থ কী?
গ্রস সংগ্রহ বাড়লেও রিফান্ড কমে যাওয়া সাধারণ করদাতাদের কাছে সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয়। ১৭ শতাংশ রিফান্ড হ্রাস মানে বহু ক্ষেত্রে করদাতারা আগের তুলনায় কম টাকা ফেরত পাচ্ছেন বা রিফান্ড পেতে দেরি হচ্ছে।
এর একটি বড় কারণ হতে পারে অ্যাডভান্স ট্যাক্স ও টিডিএস হিসাবের নিখুঁততা বৃদ্ধি। এখন অনেক ক্ষেত্রেই কর কর্তন তুলনামূলকভাবে বাস্তব আয়ের কাছাকাছি হচ্ছে, ফলে অতিরিক্ত কর জমা পড়ছে কম।
তবে সমালোচকরা বলছেন, কঠোর স্ক্রুটিনি ও বাড়তি যাচাই প্রক্রিয়ার কারণেও রিফান্ড আটকে থাকতে পারে। বিশেষ করে ফ্রিল্যান্সার, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও স্বনিযুক্ত পেশাজীবীদের ক্ষেত্রে এই চাপ বেশি অনুভূত হচ্ছে।
সরকারি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, কম রিফান্ড মানে তাৎক্ষণিকভাবে রাজকোষে বেশি নগদ থাকা। এটি অবকাঠামো খরচ, সামাজিক প্রকল্প বা ঋণ পরিশোধে কাজে লাগানো যায়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে করদাতার আস্থার উপর এর প্রভাব পড়তে পারে।
রাজকোষ, অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ করনীতি

গ্রস ডাইরেক্ট ট্যাক্স বৃদ্ধি ও রিফান্ড হ্রাস—এই দুই মিলিয়ে সরকারের আর্থিক অবস্থান আপাতদৃষ্টিতে মজবুত হচ্ছে। রাজস্ব ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং উন্নয়নমূলক ব্যয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
তবে এখানে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্যের প্রশ্ন আছে। কর সংগ্রহ বাড়ানো যতটা জরুরি, করদাতার বিশ্বাস বজায় রাখাও ততটাই গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো ও স্বচ্ছ রিফান্ড প্রক্রিয়া না হলে কর ব্যবস্থার প্রতি অনীহা তৈরি হতে পারে।
ভবিষ্যতে করনীতি কোন পথে যাবে, তার ইঙ্গিত এই পরিসংখ্যানেই লুকিয়ে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সরকার হয়তো আরও ডেটা-নির্ভর মূল্যায়ন ও লক্ষ্যভিত্তিক কর সংগ্রহের পথে হাঁটবে। একই সঙ্গে রিফান্ড ব্যবস্থাকে স্বয়ংক্রিয় ও দ্রুত করার চাপও বাড়বে।
গ্রস ডাইরেক্ট ট্যাক্সে ৪ শতাংশ বৃদ্ধি নিঃসন্দেহে অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক সংকেত। এটি কর প্রশাসনের দক্ষতা ও আয়ের আনুষ্ঠানিকতার প্রসারকে তুলে ধরে। তবে ১৭ শতাংশ রিফান্ড হ্রাস সেই ইতিবাচক ছবির পাশে একটি সতর্কবার্তাও রাখছে।
সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ হল—রাজস্ব বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে করদাতার আস্থা ও স্বচ্ছতা বজায় রাখা। আগামী মাসগুলোতে রিফান্ড প্রক্রিয়া ও করনীতিতে কী ধরনের সমন্বয় আসে, সেটাই নির্ধারণ করবে এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে আশীর্বাদ না অভিশাপ।






