পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে আবারও কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে ফর্ম-৭ বিতর্ক। ভোটার তালিকা সংশোধনের এই নির্দিষ্ট প্রক্রিয়াকে ঘিরে রাজ্যের একাধিক জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে উত্তেজনা, বিক্ষোভ ও সংঘর্ষ। প্রশাসন ও রাজনৈতিক দলগুলির মুখোমুখি অবস্থান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
ফর্ম-৭ মূলত ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার আবেদন সংক্রান্ত একটি প্রক্রিয়া। অভিযোগ উঠেছে, এই ফর্মের অপব্যবহার করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নির্দিষ্ট শ্রেণির ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। বিরোধীদের দাবি, এতে গণতন্ত্রের মূল কাঠামোই প্রশ্নের মুখে পড়ছে।
গত কয়েক দিনে কলকাতা, উত্তর ২৪ পরগনা, হাওড়া, মুর্শিদাবাদ ও নদিয়ার মতো জেলাগুলিতে বিক্ষোভ, রাস্তা অবরোধ এবং প্রশাসনের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা সামনে এসেছে। কোথাও কোথাও পুলিশের লাঠিচার্জ ও গ্রেফতারের খবরও মিলেছে।
এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে ভয় ও বিভ্রান্তি। ভোটার তালিকা নিয়ে অনিশ্চয়তা, রাজনৈতিক চাপানউতোর এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত—সব মিলিয়ে ফর্ম-৭ বিতর্ক এখন শুধু রাজনৈতিক ইস্যু নয়, বরং সামাজিক অস্থিরতার কারণ হয়ে উঠেছে।
ফর্ম-৭ কী এবং কেন এই বিতর্ক?

ফর্ম-৭ হল ভোটার তালিকা থেকে কোনও ব্যক্তির নাম বাদ দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত একটি সরকারি আবেদনপত্র। সাধারণত মৃত্যু, স্থানান্তর বা দ্বৈত নাম নথিভুক্ত থাকার ক্ষেত্রে এই ফর্ম ব্যবহার করা হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে অভিযোগ উঠেছে, এই ফর্মের মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
বিরোধী দলগুলির বক্তব্য, বহু ক্ষেত্রে ভোটারদের না জানিয়ে বা যথাযথ যাচাই ছাড়াই ফর্ম-৭ জমা দেওয়া হয়েছে। এতে সংখ্যালঘু, প্রান্তিক ও বিরোধী সমর্থক ভোটারদের নাম লক্ষ্য করে বাদ দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে বলে অভিযোগ।
অন্যদিকে প্রশাসনের দাবি, প্রতিটি ফর্ম যাচাই করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে এবং কোনও বেআইনি কাজ হচ্ছে না। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, নিয়ম মেনেই প্রক্রিয়া চলছে এবং অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত করা হবে।
তবে বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ফর্ম-৭ সংক্রান্ত নোটিস পেয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়ছেন বহু সাধারণ ভোটার। তাঁদের আশঙ্কা, নাম বাদ গেলে ভবিষ্যতের নির্বাচনে ভোটাধিকার হারাতে পারেন।
জেলায় জেলায় সংঘর্ষ: রাস্তায় নামছে রাজনীতি

ফর্ম-৭ ইস্যুতে উত্তেজনার কেন্দ্র হয়ে উঠেছে একাধিক জেলা। উত্তর ২৪ পরগনায় বিরোধী কর্মীদের মিছিল থেকে রাস্তা অবরোধের চেষ্টা হলে পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তি শুরু হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করতে হয় বলে অভিযোগ।
মুর্শিদাবাদ ও নদিয়ায় স্থানীয় প্রশাসনিক দফতরের সামনে বিক্ষোভ দেখান সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক কর্মীরা। তাঁদের দাবি, অবিলম্বে ফর্ম-৭ সংক্রান্ত সব আবেদন প্রকাশ্যে আনতে হবে এবং স্বচ্ছ তদন্ত করতে হবে।
কলকাতার একাধিক এলাকায় প্রতিবাদ সভা ও অবস্থান বিক্ষোভ হয়েছে। কোথাও কোথাও সরকারি সম্পত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগও উঠেছে। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভোটের আগে এই ধরনের সংঘর্ষ রাজ্যের রাজনৈতিক পরিবেশকে আরও উত্তপ্ত করে তুলছে। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনও এতে ব্যাহত হচ্ছে।
গণতন্ত্র, প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের উদ্বেগ
ফর্ম-৭ বিতর্ক নতুন করে সামনে এনেছে ভারতের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সংবেদনশীল দিকগুলি। ভোটার তালিকা কোনও দলের সম্পত্তি নয়—এটি সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষার একটি মৌলিক নথি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা না থাকে, তবে মানুষের আস্থা নষ্ট হতে বাধ্য। প্রশাসনের দায়িত্ব শুধু আইন প্রয়োগ নয়, বরং সাধারণ মানুষকে আস্থা ও তথ্য দেওয়া।
এই পরিস্থিতিতে নাগরিক সমাজ ও নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাঁরা দাবি করছেন, প্রতিটি ফর্ম-৭ আবেদন প্রকাশ্যে যাচাইযোগ্য হোক এবং ভোটারদের আপত্তি জানানোর সুযোগ দেওয়া হোক।
সাধারণ মানুষের মধ্যেও সচেতনতা বাড়ছে। অনেকেই নিজেদের নাম ভোটার তালিকায় আছে কিনা তা যাচাই করছেন এবং প্রয়োজন হলে প্রশাসনের দ্বারস্থ হচ্ছেন।
ফর্ম-৭ বিতর্ক পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এক গভীর সংকেত বহন করছে। এটি শুধু একটি প্রশাসনিক ফর্মের প্রশ্ন নয়, বরং গণতন্ত্রের বিশ্বাসযোগ্যতা ও নাগরিক অধিকারের বিষয়। রাজনৈতিক দল, প্রশাসন ও নির্বাচন সংস্থার সম্মিলিত দায়িত্ব—এই প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও ন্যায়সঙ্গত রাখা।
সংঘর্ষ ও অশান্তির পথ নয়, আলোচনাই হতে পারে সমাধানের রাস্তা। অন্যথায়, ভোটের আগে এই ধরনের বিতর্ক রাজ্যের সামাজিক স্থিতিশীলতাকে আরও বিপন্ন করতে পারে।






