২০২৬ সালের মেগা ফাইটের আগে উত্তপ্ত তিলোত্তমার রাজপথ। মঙ্গলবার দুপুরে কলকাতার স্ট্র্যান্ড রোডে অবস্থিত মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের (CEO) অফিসের সামনে কার্যত রণক্ষেত্রের চেহারা নিল এলাকা। অভিযোগ, বৈধ পরিচয়পত্র ছাড়াই কয়েকশো ‘ফর্ম ৬’ (নতুন ভোটার হওয়ার আবেদনপত্র) নিয়ে এক যুবক সরকারি দপ্তরে প্রবেশের চেষ্টা করছিলেন। বিষয়টি নজরে আসতেই ‘বিএলও অধিকার মঞ্চ’ এবং তৃণমূল সমর্থিত কর্মীরা বাধা দেন। মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। তৃণমূলের অভিযোগ, বিজেপি পরিকল্পিতভাবে ভিন রাজ্য থেকে আসা ‘বহিরাগত’দের বাংলার ভোটার তালিকায় ঢোকানোর চেষ্টা করছে।
ঘটনাস্থলে পুলিশ পৌঁছালেও পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খেতে হয়। তৃণমূলের দাবি, ধৃত যুবকের কাছ থেকে প্রায় ৪০০-র বেশি ফর্ম উদ্ধার হয়েছে, যা নিয়মবহির্ভূত। নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী, একজন ব্যক্তি নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি ফর্ম ব্যক্তিগতভাবে জমা দিতে পারেন না। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ‘ভোটার হাইজ্যাকিং’-এর অভিযোগ তুলেছেন। অন্যদিকে, এই উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার পর বিজেপি কর্মীরাও ঘটনাস্থলে পাল্টা জমায়েত করলে দুই পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি এবং ইটবৃষ্টি শুরু হয়। লালবাজার থেকে বিশাল পুলিশ বাহিনী ও র্যাফ (RAF) নামিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।
এই ঘটনার রেশ পৌঁছেছে খোদ নবান্ন এবং দিল্লির নির্বাচন সদন পর্যন্ত। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরাসরি মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে চিঠি লিখে জানিয়েছেন যে, বিজেপি বাংলা ও উত্তরপ্রদেশ-বিহারের সীমানা ব্যবহার করে ভোটার তালিকায় কারচুপি করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। অন্যদিকে, রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ আগরওয়াল জানিয়েছেন, ঘটনার তদন্ত শুরু হয়েছে এবং সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তবে এই ‘ফর্ম ৬’ ঝড় যে ভোটের আগে রাজনৈতিক পারদ কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিল, তা বলাই বাহুল্য।
ফর্ম ৬ এবং গণ-আবেদনের রহস্য: কী ঘটেছিল সিইও অফিসের দরজায়?
মঙ্গলবার দুপুরে যখন রোদের তেজ তুঙ্গে, ঠিক তখনই স্ট্র্যান্ড রোডের সিইও অফিসের সামনে হইচই শুরু হয়। এক যুবককে প্লাস্টিকের ব্যাগভর্তি ফর্ম নিয়ে দপ্তরের ভেতরে ঢুকতে দেখে সন্দেহ হয় তৃণমূলের বিএলও কর্মীদের। তাঁদের অভিযোগ, ওই ব্যাগ থেকে শয়ে শয়ে ‘ফর্ম ৬’ উদ্ধার হয়েছে। তৃণমূলের দাবি, নিয়ম অনুযায়ী এত বিপুল সংখ্যক আবেদনপত্র কোনো একক ব্যক্তি জমা দিতে পারেন না। তাঁদের প্রশ্ন, এই আবেদনকারীরা কারা? তাঁদের কি আদপেও বাংলায় বসবাস রয়েছে? নাকি অন্য রাজ্য থেকে নাম তুলে এখানে ভোটার করার প্রক্রিয়া চলছে?

তৃণমূলের অভিযোগের তির সরাসরি বিজেপির দিকে। দলের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় সোশাল মিডিয়ায় সরব হয়ে দাবি করেছেন, প্রায় ৩০ হাজার এই ধরনের আবেদনপত্র অবৈধভাবে জমা দেওয়ার ছক কষেছে গেরুয়া শিবির। তাঁর দাবি, উত্তরপ্রদেশ এবং বিহার থেকে লোক এনে বাংলার জনবিন্যাস (Demography) বদলে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। বিক্ষোভকারীদের দাবি ছিল, যতক্ষণ না সিইও নিজে এসে এই বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিচ্ছেন, ততক্ষণ তাঁরা অবস্থান বিক্ষোভ চালিয়ে যাবেন। এর ফলে মধ্য কলকাতার যান চলাচল দীর্ঘক্ষণ স্তব্ধ হয়ে পড়ে।
বিজেপির পাল্টা অভিযোগ ও কমিশনের অবস্থান
তৃণমূলের এই বিক্ষোভকে ‘নাটক’ বলে কটাক্ষ করেছে বিজেপি নেতৃত্ব। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর দাবি, তৃণমূল হার নিশ্চিত জেনে এখন নির্বাচন কমিশনের ওপর চাপ তৈরির চেষ্টা করছে। বিজেপির পাল্টা অভিযোগ, সিইও অফিসের সামনে তৃণমূলের গুন্ডাবাহিনী সাধারণ ভোটারদের ভয় দেখাচ্ছে এবং আইনানুগ কাজ করতে বাধা দিচ্ছে। বিজেপির দাবি, যারা ফর্ম জমা দিতে এসেছিলেন তাঁরা সকলেই বৈধ ভারতীয় নাগরিক। তৃণমূল ইচ্ছাকৃতভাবে তাঁদের ‘বহিরাগত’ তকমা দিয়ে হেনস্তা করছে।

পরিস্থিতি জটিল হওয়ায় সিইও মনোজ আগরওয়াল সংবাদমাধ্যমকে জানান, “কার্যালয়ে নথি জমা দেওয়ার একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতি আছে। কে কতগুলো ফর্ম আনছে তা প্রবেশদ্বারে পরীক্ষা করা সবসময় সম্ভব হয় না। তবে প্রতিটি আবেদন খুঁটিয়ে যাচাই করা হবে।” তিনি আরও স্পষ্ট করে দেন যে, নিয়ম অনুযায়ী স্ক্রুটিনি ছাড়া কাউকেই ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে না। এদিকে, পুলিশ বিক্ষোভকারীদের সরাতে লাঠিচার্জ করলে পরিস্থিতি আরও ঘোরালো হয়ে ওঠে। বেশ কয়েকজন কর্মীকে আটক করা হয়েছে বলে খবর।
ভোটার তালিকা সংশোধন ও বিশেষ নিবিড় পুনর্নিরীক্ষণ (SIR) বিতর্ক
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলায় ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। বিশেষ নিবিড় পুনর্নিরীক্ষণ বা SIR প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নাম বাদ যাওয়া নিয়ে আগেই সরব হয়েছিল শাসকদল। এবার নতুন করে নাম তোলা বা ‘ফর্ম ৬’ নিয়ে এই বিতর্ক রাজ্য রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভোটার তালিকার প্রত্যেকটি নাম এখন নির্ণায়ক হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে সীমান্ত এলাকা এবং শহরাঞ্চলের জনবিন্যাস বদলে যাওয়ার যে তত্ত্ব বিজেপি এবং তৃণমূল একে অপরের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে, এই ঘটনা তারই প্রতিফলন।

তৃণমূলের স্পষ্ট দাবি, নির্বাচন কমিশনকে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হবে। অন্যদিকে বিজেপি বলছে, নির্বাচন কমিশন একটি স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা এবং তাকে তার কাজ করতে দেওয়া উচিত। এই টানাপোড়েনের মাঝে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত। বিশেষ করে যাদের নাম সত্যিই ভোটার তালিকায় ওঠেনি, তারা এই রাজনৈতিক ডামাডোলের কারণে পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন। মঙ্গলবার রাতের দিকে এলাকা কিছুটা শান্ত হলেও সিইও দপ্তরের সামনে পুলিশি পাহারা বজায় রাখা হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬-এর বাদ্যি বেজে গিয়েছে এই ‘ফর্ম ৬’ ঝড়ের মাধ্যমেই। সিইও অফিসের সামনের এই ঘটনা কেবল একটি সাময়িক উত্তেজনা নয়, বরং এটি আগামী নির্বাচনের রণকৌশলের একটি অংশ। শাসক ও বিরোধী—উভয় পক্ষই এখন ভোটার তালিকার প্রতিটি ইঞ্চি নিয়ে লড়াই করতে প্রস্তুত। রাজপথের লড়াই এবার আইনি লড়াইয়েও মোড় নিতে পারে, কারণ তৃণমূল ইতিমধ্যেই আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত ভোটার তালিকা কতটা স্বচ্ছ থাকে এবং কমিশন কীভাবে এই ‘অবৈধ অনুপ্রবেশ’ বা ‘অবৈধ সংযোজন’-এর অভিযোগ মোকাবিলা করে, সেটাই এখন দেখার।






