কলকাতা, ৭ আগস্ট ২০২৬:
ভালোবাসার কি কোনও নির্দিষ্ট সংজ্ঞা হয়? ভালোবাসার অধিকার কি সবার জন্য সমান? আর একজন মানুষ যদি অটিজম বা ডাউন সিনড্রোমের মতো বিশেষ চাহিদা নিয়ে বেঁচে থাকেন, তাহলে তাঁর প্রেম, সম্পর্ক, বিয়ে কিংবা নিজের মতো করে জীবন বেছে নেওয়ার অধিকার কি অন্যদের থেকে আলাদা?
এই প্রশ্নগুলিকেই কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে আসন্ন বাংলা শর্ট ফিল্ম ‘একটি অন্য প্রেমের গল্প’। প্রেমের প্রচলিত গল্পের বাইরে গিয়ে এই ছবি তুলে ধরতে চেয়েছে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের আবেগ, স্বপ্ন, সম্পর্ক এবং সামাজিক স্বীকৃতির প্রয়োজনীয়তাকে। ছবিটির মূল ভাবনায় রয়েছে ভালোবাসা, মর্যাদা, সমতা এবং গ্রহণযোগ্যতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
প্রেমের গল্প, কিন্তু একটু অন্যরকম
‘একটি অন্য প্রেমের গল্প’ শুধুমাত্র একটি রোম্যান্টিক গল্প হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করতে চাইছে না। বরং ছবিটি এমন একটি সামাজিক ধারণাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাতে চায়, যেখানে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষদের অনেক সময় মূলস্রোতের সমাজ থেকে আলাদা করে দেখা হয়।
অটিজম বা ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত মানুষদের নিয়ে সমাজে এখনও নানা ভুল ধারণা রয়েছে। তাঁদের অনেক সময় ‘স্বাভাবিক’ জীবনের বাইরে থাকা মানুষ হিসেবে দেখা হয়। অথচ তাঁদেরও আবেগ রয়েছে, রয়েছে ভালো লাগা-মন্দ লাগা, স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা এবং সম্পর্ক গড়ে তোলার ইচ্ছা।

ছবিটির নির্মাতাদের বক্তব্য অনুযায়ী, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষকে শুধুমাত্র সহানুভূতির চোখে দেখার পরিবর্তে তাঁদের একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে দেখাই এই ছবির অন্যতম উদ্দেশ্য। তাঁদের আবেগ, স্বপ্ন এবং সমাজে সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকারকে সামনে আনতে চেয়েছে ‘একটি অন্য প্রেমের গল্প’।
প্রশ্ন উঠবে সমাজের কাছেই
ছবির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটি সম্ভবত এখানেই—বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন একজন মানুষ কি প্রেমে পড়তে পারেন? তিনি কি বিয়ে কিংবা পরিবার গঠনের স্বপ্ন দেখতে পারেন? নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কি তাঁর নেই?
এই প্রশ্নগুলির সরাসরি উত্তর দেওয়ার বদলে ছবিটি দর্শকের সামনে বিষয়গুলিকে তুলে ধরতে চায়। কারণ, সমস্যা শুধুমাত্র বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের জীবনে সীমাবদ্ধ নয়; তাঁদের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিও এই আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
‘একটি অন্য প্রেমের গল্প’ সেই প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গিকে চ্যালেঞ্জ করে বলতে চায়—কাউকে আলাদা ভাবে দেখার কারণ তাঁর সক্ষমতার পার্থক্য হতে পারে, কিন্তু তাঁর অনুভূতি বা ভালোবাসার অধিকারকে সেই পার্থক্য দিয়ে মাপা যায় না।
আমিকা ভট্টাচার্যের অভিনয়ে বিশেষ আকর্ষণ
ছবিটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আকর্ষণ আমিকা ভট্টাচার্য। তিনি নিজেও ডাউন সিনড্রোম নিয়ে বেড়ে ওঠা এক তরুণী এবং ছবিতে তাঁর অভিনয়কে নির্মাতারা বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।
প্রেস রিলিজ অনুযায়ী, আমিকার স্বাভাবিক অভিনয়, অভিব্যক্তি এবং আবেগের গভীরতা তাঁর চরিত্রকে বিশেষ মাত্রা দিয়েছে। ছবির টিজার প্রকাশের অনুষ্ঠানে উপস্থিত দর্শক ও অতিথিদের মধ্যেও তাঁর অভিনয় প্রশংসা পেয়েছে। তাঁর অংশগ্রহণ ছবিটির সামাজিক বার্তাকেও আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।

বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষদের নিয়ে কথা বলার সময় তাঁদের সক্ষমতার বদলে শুধুই সীমাবদ্ধতার কথা সামনে চলে আসে। আমিকার অভিনয় সেই জায়গায় একটি ভিন্ন বার্তা বহন করে—সুযোগ পেলে তাঁরাও নিজেদের প্রতিভা এবং সৃজনশীলতা প্রকাশ করতে পারেন।
ছবিটির নির্মাতারা তাই মনে করেন, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষদের জন্য করুণা নয়, প্রয়োজন সুযোগ, উৎসাহ এবং গ্রহণযোগ্যতা।
পুরুষ প্রধান চরিত্রে আমন
ছবির পুরুষ প্রধান চরিত্রে রয়েছেন আমন। এর আগে তিনি জনপ্রিয় নেটফ্লিক্স ওয়েব সিরিজ ‘খাকি’ এবং আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত শর্ট ফিল্ম ‘পায়েশ’-এ অভিনয় করেছেন।
আগের কাজের অভিজ্ঞতা থেকেই ‘একটি অন্য প্রেমের গল্প’-এ তাঁর অভিনয় দর্শকদের কাছে আরও একটি আকর্ষণের জায়গা হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন নির্মাতারা।
ছবির অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অভিনেতাদের মধ্যে রয়েছেন পরিমল ভট্টাচার্য, মন্তু ভট্টাচার্য এবং আমিকা ভট্টাচার্য।
কলকাতা প্রেস ক্লাবে প্রকাশ পেল টিজার
৭ আগস্ট কলকাতা প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রকাশ করা হয় ‘একটি অন্য প্রেমের গল্প’-এর টিজার। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের পাশাপাশি বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।
আমন্ত্রিত অতিথিদের তালিকায় ছিলেন প্যারানর্মাল রিসার্চার ড. উজ্জ্বল গুপ্ত, চাইল্ড অ্যান্ড উইমেন প্রোটেকশন স্পেশালিস্ট ড. সোমা গোহণ, বিশিষ্ট ফ্যাশন ডিজাইনার শান্তনু গুহ ঠাকুরতা, মডেল উপেন, নবাগত অভিনেত্রী আয়ুশ্রী পাল, অভিনেতা আমন, ড. সুনীপা রায়, সল্টলেক উত্তরায়ণের প্রতিষ্ঠাতা, প্রিন্সিপাল শম্পা দে শ্রীনিবাসন এবং স্পেশাল এডুকেটর কৌশিক পাল।

টিজার প্রকাশের পর অনুষ্ঠানে উপস্থিত অতিথিদের কাছ থেকে পাওয়া যায় আবেগঘন প্রতিক্রিয়া। বিশেষ করে আমিকা ভট্টাচার্যের স্বাভাবিক অভিনয় উপস্থিত দর্শকদের নজর কাড়ে। নির্মাতাদের মতে, বাংলা সিনেমায় এখনও তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত একটি বিষয়কে সামনে নিয়ে আসার জন্য ছবিটির উদ্যোগ প্রশংসিত হয়েছে।
শুধু প্রেম নয়, বাবা-মায়ের জন্যও একটি বার্তা
ছবিটির সামাজিক গুরুত্বের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। পরিচালক সৌমেন ডি.-র বক্তব্য অনুযায়ী, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানদের বাবা-মায়ের আত্মবিশ্বাস ও মনোবল বাড়ানোও এই ছবির অন্যতম উদ্দেশ্য।
অনেক বাবা-মায়ের কাছে সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ স্বাভাবিক। সমাজ তাঁদের সন্তানকে কীভাবে দেখবে, তাঁরা কতটা স্বনির্ভর হতে পারবেন কিংবা নিজেদের প্রতিভা কতটা প্রকাশ করতে পারবেন—এসব প্রশ্ন তাঁদের মনে থাকে।
‘একটি অন্য প্রেমের গল্প’ সেই জায়গায় আশার বার্তা দিতে চায়। নির্মাতাদের বিশ্বাস, যথাযথ সুযোগ, উৎসাহ এবং সহায়তা পেলে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষরাও নিজেদের প্রতিভা তুলে ধরতে পারেন, এগিয়ে যেতে পারেন এবং সমাজে নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করতে পারেন।
আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের পথে
ছবিটির যাত্রা শুধু বাংলা দর্শকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখার পরিকল্পনা নেই নির্মাতাদের। ইতিমধ্যেই ‘একটি অন্য প্রেমের গল্প’-কে একাধিক আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে পাঠানোর প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে।
চলচ্চিত্র উৎসবগুলিতে প্রদর্শনের পর ছবিটি সাধারণ দর্শকদের জন্য মুক্তি পাওয়ার কথা রয়েছে। অর্থাৎ, ছবিটি প্রথমে উৎসবের পরিসরে নিজের বক্তব্য তুলে ধরবে, এরপর আরও বৃহত্তর দর্শকের কাছে পৌঁছনোর সম্ভাবনা তৈরি হবে।
নির্মাণে কারা
ছবিটি প্রযোজনা করেছেন পরিমল ভট্টাচার্য। গল্প ও পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন সৌমেন ডি.। সহ-পরিচালনা ও চিত্রগ্রহণ করেছেন তাপস ব্যানার্জি এবং সম্পাদনার দায়িত্বে রয়েছেন সায়নহ্য ডি.
নির্মাণের ক্ষেত্রে ছবিটির লক্ষ্য শুধু একটি প্রেমের গল্প বলা নয়; বরং সেই গল্পের মধ্য দিয়ে এমন কিছু প্রশ্ন দর্শকের সামনে রাখা, যেগুলি নিয়ে সমাজে এখনও যথেষ্ট আলোচনা হয় না।
ভালোবাসার অধিকার সবার
‘একটি অন্য প্রেমের গল্প’-এর সবচেয়ে বড় শক্তি হয়তো এর বিষয় নির্বাচনে। প্রেম নিয়ে অসংখ্য গল্প তৈরি হয়েছে, কিন্তু বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের প্রেম, সম্পর্ক এবং সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্নকে কেন্দ্র করে গল্প বলার উদ্যোগ এখনও তুলনামূলকভাবে বিরল।
এই ছবি তাই শুধু দু’টি মানুষের সম্পর্কের গল্প নয়। এটি সমাজের সঙ্গে একটি কথোপকথনেরও চেষ্টা—যেখানে প্রশ্ন থাকবে, আমরা কাকে ‘স্বাভাবিক’ বলি? কেন কিছু মানুষকে তাঁদের সক্ষমতার ভিত্তিতে বিচার করি? আর ভালোবাসার মতো একটি মৌলিক মানবিক অনুভূতির ক্ষেত্রে কেন তৈরি করি এতগুলি সীমারেখা?
‘একটি অন্য প্রেমের গল্প’ সেই সীমারেখাগুলির দিকেই তাকাতে চায়। সহানুভূতির জায়গা থেকে নয়, সম্মান, সমতা এবং মানবিক মর্যাদার জায়গা থেকে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষদের দেখতে শেখানোর একটি প্রচেষ্টা হিসেবেই ছবিটি নিজের জায়গা তৈরি করতে চাইছে।
শেষ পর্যন্ত ছবিটি দর্শককে কী উত্তর দেবে, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে ছবিটি দেখে দর্শকের মনে তৈরি হওয়া প্রশ্নগুলি। কারণ কিছু গল্পের উদ্দেশ্য শুধু বিনোদন দেওয়া নয়—কিছু গল্পের কাজ হলো আমাদের চেনা ধারণাগুলিকে একটু থামিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করা।
‘একটি অন্য প্রেমের গল্প’ সেই দ্বিতীয় ধরনের গল্প হওয়ারই চেষ্টা করছে।






