পশ্চিমবঙ্গের রেল যাত্রীদের জন্য বড়সড় স্বস্তির খবর। ট্রেন চলাচলের নিরাপত্তা আরও এক ধাপ বাড়াতে রাজ্যে ১০০ শতাংশ ‘কবচ’ (Kavach) নিরাপত্তা ব্যবস্থার আওতায় আসতে চলেছে Eastern Railway। ২২৪ কোটি টাকার অনুমোদিত প্রকল্পে ধাপে ধাপে আধুনিক অ্যান্টি-কলিশন প্রযুক্তি বসানো হবে রাজ্যের ব্যস্ততম ও গুরুত্বপূর্ণ রুটগুলিতে।
দীর্ঘদিন ধরেই ট্রেন দুর্ঘটনা, সিগন্যাল অমান্য, মানবিক ভুল এবং ঘন কুয়াশায় দৃশ্যমানতা কমে যাওয়া—এই সব ঝুঁকি ভারতীয় রেলের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। সেই বাস্তবতাকে সামনে রেখে ‘কবচ’ প্রযুক্তিকে ভবিষ্যতের রেল নিরাপত্তার মেরুদণ্ড হিসেবে তুলে ধরছে রেল কর্তৃপক্ষ।
হাওড়া থেকে কৃষ্ণনগর, শিয়ালদহ শাখা থেকে গ্রামীণ রুট—সব মিলিয়ে পূর্ব রেলের নেটওয়ার্কে এই প্রযুক্তি কার্যকর হলে দুর্ঘটনার সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এই প্রকল্প শুধুমাত্র প্রযুক্তিগত উন্নয়ন নয়, বরং যাত্রী আস্থা পুনর্গঠন এবং স্মার্ট রেল ব্যবস্থার দিকে এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ—যা পশ্চিমবঙ্গের রেল পরিকাঠামোকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।
কবচ কী এবং কেন এটি রেল নিরাপত্তায় গেমচেঞ্জার

‘কবচ’ হল ভারতীয় রেলের নিজস্বভাবে উন্নত করা একটি স্বয়ংক্রিয় ট্রেন সুরক্ষা ব্যবস্থা। এটি মূলত ট্রেন, সিগন্যাল এবং ট্র্যাকের মধ্যে রিয়েল-টাইম যোগাযোগ স্থাপন করে কাজ করে। কোথাও যদি সিগন্যাল অমান্য হয় বা সামনে থাকা ট্রেনের সঙ্গে দূরত্ব বিপজ্জনকভাবে কমে যায়, তাহলে সিস্টেম নিজে থেকেই সতর্কতা জারি করে এবং প্রয়োজনে স্বয়ংক্রিয় ব্রেক প্রয়োগ করে।
এই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় শক্তি হল মানবিক ভুলের প্রভাব কমিয়ে আনা। চালক যদি কোনও কারণে প্রতিক্রিয়া জানাতে দেরি করেন, ‘কবচ’ সেই ফাঁক পূরণ করে। কুয়াশা, রাতের অন্ধকার বা প্রতিকূল আবহাওয়াতেও এটি সমানভাবে কার্যকর।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে চালু হলে সিগন্যাল পাশ করা সংক্রান্ত দুর্ঘটনা প্রায় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব। ফলে এটি শুধুই একটি প্রযুক্তি নয়, বরং যাত্রী নিরাপত্তার এক শক্তিশালী ঢাল।
হাওড়া–কৃষ্ণনগরসহ কোন কোন রুটে বিস্তার পাচ্ছে প্রকল্প


এই ২২৪ কোটি টাকার প্রকল্পে মূলত সেই সব রুটকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে, যেখানে দৈনিক যাত্রীচাপ অত্যন্ত বেশি এবং ট্রেন চলাচলের ঘনত্ব সর্বাধিক। হাওড়া–কৃষ্ণনগর শাখা, শিয়ালদহ ডিভিশনের একাধিক উপশাখা এবং পণ্যবাহী ট্রেন চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ করিডর এই তালিকায় রয়েছে।
হাওড়া স্টেশন থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার লোকাল ও দূরপাল্লার ট্রেন যাতায়াত করে। এখানে সামান্য প্রযুক্তিগত ত্রুটিও বড় বিপদের কারণ হতে পারে। সেই কারণেই কবচ প্রযুক্তি বসানোর মাধ্যমে ঝুঁকি কমানোই রেল কর্তৃপক্ষের মূল লক্ষ্য।
কৃষ্ণনগর ও সংলগ্ন জেলাগুলিতে লোকাল ট্রেনই সাধারণ মানুষের প্রধান ভরসা। এই রুটে নিরাপত্তা বাড়লে গ্রামীণ যাত্রীদের আস্থাও বহুগুণ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
২২৪ কোটি টাকার বিনিয়োগ: ভবিষ্যতের স্মার্ট রেলের দিকে পদক্ষেপ

২২৪ কোটি টাকার এই বিনিয়োগ শুধুমাত্র একটি রাজ্যের জন্য নয়, বরং জাতীয় স্তরে রেল নিরাপত্তা উন্নয়নের বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ। কেন্দ্র সরকার ও রেল মন্ত্রকের লক্ষ্য, আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই দেশের প্রধান রেল করিডরগুলিকে সম্পূর্ণভাবে আধুনিক সুরক্ষা ব্যবস্থার আওতায় আনা।
এই প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে শুধু দুর্ঘটনা কমবে না, ট্রেন চলাচলের সময়ানুবর্তিতাও বাড়বে। কারণ নিরাপত্তা বাড়লে সিগন্যালিং ও অপারেশন আরও মসৃণভাবে পরিচালিত হয়। দীর্ঘমেয়াদে এটি যাত্রী পরিষেবার মান উন্নত করবে।
রেল বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই বিনিয়োগ পূর্ব রেলকে প্রযুক্তিগতভাবে দেশের অন্যতম অগ্রগামী জোনে পরিণত করতে পারে। পাশাপাশি, এটি ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ উদ্যোগের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ, কারণ কবচ প্রযুক্তি সম্পূর্ণ দেশীয়ভাবে উন্নত।
পশ্চিমবঙ্গে ১০০ শতাংশ কবচ কভারেজের লক্ষ্য শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়—এটি নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য এবং ভবিষ্যতমুখী রেল ব্যবস্থার প্রতিশ্রুতি। হাওড়া, কৃষ্ণনগরসহ গুরুত্বপূর্ণ রুটে এই প্রযুক্তি কার্যকর হলে প্রতিদিনের যাত্রা হবে আরও নিশ্চিন্ত। ২২৪ কোটি টাকার এই প্রকল্প পূর্ব রেলের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবেই চিহ্নিত হবে।






