দমদম মেট্রো স্টেশনে ফের চাঞ্চল্য। প্ল্যাটফর্মে ঢোকে মাত্রই দক্ষিণেশ্বরমুখী একটি ট্রেন, আর ঠিক সেই সময়ই এক ব্যক্তি আচমকাই ঝাঁপ দেন লাইনের উপর। মুহূর্তে আতঙ্কে চিৎকার, দৌড়ঝাঁপ, এবং স্বাভাবিক পরিষেবা সম্পূর্ণরূপে এলোমেলো হয়ে যায় কলকাতার অন্যতম ব্যস্ত পরিবহন ব্যবস্থায়।
মেট্রো রেল কর্তৃপক্ষ দ্রুত জরুরি ব্রেক প্রয়োগ করে ট্রেন থামিয়ে দেন চালক। ঘটনা ঘটে সকাল ব্যস্ত সময়ে, যখন অফিস ও স্কুলে যাওয়ার ভিড় তুঙ্গে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই দক্ষিণেশ্বর থেকে গিরিশ পার্ক পর্যন্ত পরিষেবা বন্ধ ঘোষণা করা হয় তাৎক্ষণিকভাবে। যাত্রীদের মধ্যে ক্ষোভ, দুশ্চিন্তা এবং অনিশ্চয়তার আঁচ দেখা যায়।
গত কয়েক বছরে কলকাতা মেট্রোর বিভিন্ন স্টেশনে আত্মহত্যা বা আত্মহত্যার চেষ্টা সামলাতে গিয়ে বারংবার পরিষেবা বিপর্যস্ত হয়েছে। এ দিনের ঘটনাও সেই তালিকাতেই নতুন সংযোজন। প্রশ্ন উঠছে—নিরাপত্তা বাড়াতে আরও কী পদক্ষেপ প্রয়োজন?
এই ঘটনার জেরে প্ল্যাটফর্ম ফাঁকা করা হয়, আর রেল সুরক্ষা বাহিনী (RPF) দ্রুত তৎপর হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে এর মধ্যেই যাত্রী দুর্ভোগ চরমে পৌঁছে যায়।
ঘটনাস্থলে আতঙ্ক, চালকের তৎপরতা রক্ষা করল বড় বিপদ

ঘটনাটি ঘটে সকাল সাড়ে ন’টা নাগাদ। মেট্রো সূত্রে জানা যায়, ট্রেনটি দমদমে ঢোকার সময়ই হঠাৎ সেই ব্যক্তি দৌড়ে গিয়ে ঝাঁপ দেন লাইনের উপর। চালক তৎপরতার সঙ্গে কন্ট্রোল রুমে বার্তা পাঠিয়ে ট্রেন থামিয়ে দেন। এই দ্রুত সিদ্ধান্তই রক্ষা করে বড় বিপদ থেকে।
যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লেও দ্রুত প্ল্যাটফর্ম খালি করে দেওয়া হয়। লাইনে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়, যাতে উদ্ধারকাজ দ্রুত শুরু করা যায়। এ সময় প্ল্যাটফর্মের দু’পাশে যাত্রীদের আটকে রাখা হয় এবং মাইকে বারবার ঘোষণা করা হয় পরিষেবা ব্যাহত হওয়ার কথা।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ঘটনাটি এত হঠাৎ ঘটে যে বোঝার সুযোগই ছিল না। অনেকে মোবাইলে ভিডিও করা শুরু করলেও RPF সেই প্রচেষ্টা বন্ধ করে দেয়। তদন্তে সহযোগিতার স্বার্থে প্ল্যাটফর্মের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে।
দ্বিতীয় উপশিরোনাম (H2): দক্ষিণেশ্বর–গিরিশ পার্ক রুটে পরিষেবা বিপর্যয়, যাত্রীদের দুর্ভোগ চরমে

পরিষেবা বন্ধ ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই দমদম মেট্রো স্টেশন থেকে উত্তরের সমস্ত মেট্রো স্টেশনে দীর্ঘ লাইন পড়ে যায়। দক্ষিণেশ্বর, বরানগর, নোয়াপাড়া—প্রতিটি স্টেশনে একই দৃশ্য। অফিসের ব্যস্ত সময়ে এমন দুর্ঘটনার ফলে বহু যাত্রীকে বিকল্প পরিবহনের সন্ধানে ছুটতে দেখা যায়।
অনেকে বাধ্য হয়ে বাস বা অটোতে যাত্রা শুরু করেন, যার ফলে দমদম–লেকটাউন–বেলঘরিয়া রুটে রাস্তাতেও তীব্র যানজট তৈরি হয়। যে যাত্রা সাধারণত ২০ মিনিটে পৌঁছনো যায়, সেখানে ঘণ্টাখানেক বা তারও বেশি সময় লেগে যায়।
মেট্রো কর্তৃপক্ষ জানান, নিয়ম মেনে উদ্ধারকাজ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত পরিষেবা স্বাভাবিক করা যায় না। ফলে দক্ষিণ অংশে যেমন গিরিশ পার্ক পর্যন্ত ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকে, তেমনই উত্তরের দিকেও রেক ব্যস্ততার কারণে বিলম্ব ঘটে।
কমিউটাররা প্রশ্ন তুলেছেন—“এত নিয়ম-কানুন থাকা সত্ত্বেও প্ল্যাটফর্মে ঝাঁপের ঘটনা রোখা যাচ্ছে না কেন?” অনেকেই প্ল্যাটফর্ম স্ক্রিন ডোরের দাবি তোলেন, যা বহু আন্তর্জাতিক মেট্রো রুটে বাধ্যতামূলক নিরাপত্তা কাঠামো।
তৃতীয় উপশিরোনাম (H2): নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন—স্ক্রিন ডোর কি এখন সময়ের দাবি?

কলকাতা মেট্রোর লাইন ২—ইস্ট–ওয়েস্ট করিডরে স্ক্রিন ডোর থাকা সত্ত্বেও লাইন ১-এ অর্থাৎ দমদম থেকে নোয়াপাড়া পর্যন্ত রুটে কেন এখনও তা বসানো হয়নি, সে প্রশ্ন আগেই উঠেছিল। এ দিনের ঘটনার পর আলোচনায় ফের নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, স্ক্রিন ডোর বসালে আত্মহত্যার ঘটনা প্রায় সম্পূর্ণরূপে ঠেকানো সম্ভব। ট্রেন ঢোকার আগ পর্যন্ত ডোর খুলতে না পারার ফলে প্ল্যাটফর্মে যাত্রীদের লাইনে নামার সুযোগই থাকে না।
যাত্রী সুরক্ষা কমিটি জানিয়েছে, মেট্রোর উত্তর–দক্ষিণ করিডরে প্রতিদিন যে ভিড় থাকে, সেখানে স্ক্রিন ডোরই ভবিষ্যতের একমাত্র স্থায়ী সমাধান। যদিও প্রকল্পটি দীর্ঘদিন ধরেই কাগজে–কলমে চলছে, এখনও তার বাস্তবায়ন হয়নি।
এ ছাড়া মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা নিয়েও আলোচনা বাড়ছে। গত কয়েক বছরে মেট্রো কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন হেল্পলাইন শুরু করলেও খোলা প্রয়োজনে আরও উদ্যোগ জরুরি বলে মনে করছেন মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা।
দমদম স্টেশনে এ দিনের ঘটনা আবারও দেখিয়ে দিল—কলকাতায় মেট্রো পরিষেবার সঙ্গে জড়িত নিরাপত্তা এখনও বড় প্রশ্নের মুখে। স্ক্রিন ডোর থেকে শুরু করে মানসিক সহায়তা—প্রতিটি স্তরে উন্নয়ন জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু প্রযুক্তিগত নয়, সামাজিক দায়িত্বও বটে।
দক্ষিণেশ্বর থেকে গিরিশ পার্ক পর্যন্ত পরিষেবা দ্রুত স্বাভাবিক হলেও যাত্রীদের অসুবিধা, জট, আতঙ্ক—এই সবই ভবিষ্যতের প্রস্তুতি নিয়ে নতুন করে ভাবাচ্ছে সবার মন।






