হুগলি নদী পশ্চিমবঙ্গের জীবনরেখা—শিল্প, বাণিজ্য, সংস্কৃতি ও দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরেই শিল্পবর্জ্য, নিকাশি জল, প্লাস্টিক ও অনিয়ন্ত্রিত মানব কার্যকলাপে এই নদীর দূষণ বেড়েছে উদ্বেগজনক হারে। শুধু পরিবেশ নয়, জনস্বাস্থ্য ও জীববৈচিত্র্যও পড়ছে সরাসরি প্রভাবের মুখে।
এই প্রেক্ষাপটে নদী দূষণ রুখতে বড়সড় প্রযুক্তিগত পদক্ষেপ নিল রাজ্য প্রশাসন। প্রায় ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ হুগলি নদীপথ জুড়ে ড্রোনের মাধ্যমে নিয়মিত নজরদারির পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। লক্ষ্য—দূষণের উৎস চিহ্নিত করা, অবৈধ বর্জ্য নিক্ষেপ রোধ করা এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া।
নতুন এই উদ্যোগে পরিবেশ রক্ষায় প্রশাসনিক নজরদারি যেমন জোরদার হবে, তেমনই ডেটা-নির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্ভব হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। আধুনিক প্রযুক্তি ও পরিবেশ সংরক্ষণের এই মেলবন্ধন হুগলি নদীর ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে বলেই আশাবাদী পরিবেশবিদরা।
হুগলি নদীতে ড্রোন নজরদারি: কীভাবে কাজ করবে এই ব্যবস্থা

ড্রোন নজরদারি প্রকল্পে উচ্চ রেজোলিউশনের ক্যামেরা ও জিও-ট্যাগিং প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। নদীর তীরবর্তী শিল্পাঞ্চল, নিকাশি মুখ, জেটি ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা ড্রোনের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা হবে। নির্দিষ্ট সময় অন্তর আকাশপথে টহল দিয়ে সন্দেহজনক দূষণের উৎস চিহ্নিত করা হবে।
এই ড্রোনগুলি লাইভ ভিডিও ফিড ও সংরক্ষিত ফুটেজ পাঠাবে একটি কেন্দ্রীয় কন্ট্রোল রুমে। সেখানে পরিবেশ দফতর ও দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের আধিকারিকরা ফুটেজ বিশ্লেষণ করে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে পারবেন। ফলে আগের মতো শুধুমাত্র অভিযোগের উপর নির্ভর না করে প্রমাণ-ভিত্তিক পদক্ষেপ সম্ভব হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ড্রোন প্রযুক্তি ব্যবহারে মানবসম্পদের চাপ কমবে এবং দুর্গম এলাকাতেও নজরদারি সহজ হবে। নদীর মাঝখানে বা কাদাময় তীরে যেখানে পৌঁছনো কঠিন, সেখানে ড্রোন কার্যকর ভূমিকা নেবে।
শিল্প বর্জ্য ও নিকাশি জলের উপর কড়া নজর

হুগলি নদীর দূষণের বড় অংশ আসে শিল্প বর্জ্য ও অপরিশোধিত নিকাশি জল থেকে। বহু ক্ষেত্রে নির্ধারিত মান না মেনেই বর্জ্য নদীতে ফেলা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ড্রোন নজরদারির মাধ্যমে এই ধরনের অবৈধ কার্যকলাপ দ্রুত ধরা পড়বে।
ড্রোন ফুটেজের সাহায্যে কোন কারখানা বা নিকাশি মুখ থেকে দূষণ ছড়াচ্ছে, তা চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নোটিস পাঠানো হবে। প্রয়োজনে জরিমানা, উৎপাদন বন্ধ বা আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এতে শিল্প সংস্থাগুলির উপর পরিবেশগত দায়বদ্ধতার চাপ বাড়বে।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে শিল্পগুলিকে আধুনিক বর্জ্য শোধন ব্যবস্থায় বিনিয়োগে বাধ্য করবে। ফলে নদীর জলমান ধীরে ধীরে উন্নত হবে এবং জলজ প্রাণের আবাসস্থল রক্ষা পাবে।
পরিবেশ রক্ষা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

ড্রোন নজরদারি শুধু তাৎক্ষণিক দূষণ নিয়ন্ত্রণেই সীমাবদ্ধ নয়। সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদি নদী সংস্কার ও সংরক্ষণ পরিকল্পনা তৈরি করা হবে। কোন অংশে দূষণ বেশি, কোথায় তীরভাঙন বা জলজ উদ্ভিদ ক্ষতিগ্রস্ত—সবকিছুরই ডেটা সংরক্ষণ করা হবে।
ভবিষ্যতে এই তথ্য ব্যবহার করে বায়ো-রিমিডিয়েশন, নদীতীর সবুজায়ন ও সচেতনতা কর্মসূচি চালানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। প্রশাসনের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষকে যুক্ত করে নদী রক্ষার সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার কথাও ভাবা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হুগলি নদীতে এই মডেল সফল হলে গঙ্গা ও অন্যান্য নদীতেও একই প্রযুক্তি প্রয়োগ করা যেতে পারে। এতে দেশের নদী সংরক্ষণ নীতিতে এক নতুন অধ্যায় সূচিত হবে।
১২০ কিলোমিটার হুগলি নদীপথে ড্রোন নজরদারি নিঃসন্দেহে পরিবেশ রক্ষায় এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। প্রযুক্তি-নির্ভর এই উদ্যোগ দূষণের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে। প্রশাসন, শিল্প ও সাধারণ মানুষের যৌথ সহযোগিতায় হুগলি আবার তার স্বচ্ছতা ও প্রাণ ফিরে পাবে—এমনটাই প্রত্যাশা।






