কোলাহলময় কলকাতার এক কোণে ধাপা ঢিপি। বছরের পর বছর ধরে বর্জ্যভূমির পাশে গড়ে ওঠা এই বসতি আজ এক গভীর সংকটের মুখে—পরিচয় প্রমাণের সংগ্রাম। সরকারি রেকর্ডে জায়গার মালিকানা নেই, ঠিকানার স্বীকৃতি নেই, ফলে ধাপা ঢিপির মানুষরা নিজেদের অস্তিত্বের বৈধতা প্রমাণ করতেই সবচেয়ে বেশি হোঁচট খাচ্ছেন।
দৈনন্দিন জীবনের মৌলিক অধিকার পাওয়া থেকে শুরু করে সরকারি সুবিধা অর্জন—সবকিছুর সামনে দেয়াল তুলে দাঁড়িয়েছে এই পরিচয় সংকট। এই প্রতিবেদন সেই সংগ্রামের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে।
ধাপা ঢিপির বাস্তবতা: উজাড় জমিতে জীবনের নির্মম পরীক্ষা
ধাপা ঢিপি মূলত কলকাতার বৃহত্তম বর্জ্য নিষ্কাশন এলাকার কাছে একটি অনানুষ্ঠানিক বসতি। বহু বছর ধরে হাজারো মানুষ এখানে অস্থায়ী ঘর বেঁধে থাকছেন।
কিন্তু সমস্যা শুরু হয়েছে তখনই, যখন জমির প্রকৃত মালিকানা, ঠিকানার বৈধতা এবং সরকারি নথিতে নাম অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি সামনে আসে।
সরকারি রেকর্ডে নাম নেই—সুবিধা থেকেও বঞ্চিত
জমির মালিকানা না থাকায় ধাপার বাসিন্দারা পাচ্ছেন না:
- রেশন কার্ড
- আধার ও ভোটার কার্ডে সঠিক ঠিকানা
- স্বাস্থ্যসেবা ও সরকারি প্রকল্পের সুবিধা
- শিক্ষা ব্যবস্থায় স্থায়ী ঠিকানা উল্লেখের সুযোগ
বসবাসের জায়গা অননুমোদিত হওয়ায় সরকারি দপ্তরগুলোও অনেক ক্ষেত্রে এই লোকজনের নথি গ্রহণে অনিচ্ছুক। ফলে পরিচয় প্রমাণ করাই হয়ে দাঁড়িয়েছে সবচেয়ে কঠিন কাজ।

পরিচয়ের প্রমাণ দিতে না পারার চরম মূল্য
ধাপা ঢিপির মানুষের এই পরিচয়সংকট শুধু কাগজপত্রের সমস্যা নয়—এটি তাদের সমগ্র জীবনযাত্রাকে প্রভাবিত করে।
১. স্বাস্থ্যসেবায় বাধা
পরিচয় ও ঠিকানার নথি না থাকায় সরকারি হাসপাতালের অনেক পরিষেবা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ ও গর্ভবতী নারীদের জন্য এই অবস্থা আরও ভয়াবহ।
২. শিক্ষায় অনিশ্চয়তা
অনেক শিশু স্কুলে ভর্তি হতে না পারার মূল কারণ—স্থায়ী ঠিকানার অভাব। যে শিশুরা ভর্তি হয়, তাদেরও বারবার ঠিকানার প্রমাণ চাইলে সমস্যায় পড়ে পরিবারগুলো।
৩. কর্মসংস্থানে বৈধতার প্রশ্ন
অনেক কর্মস্থলে ঠিকানা প্রমাণ বাধ্যতামূলক। ধাপা ঢিপির বাসিন্দারা পরিচয় দিতে না পারায় বহু কর্মসংস্থানের সুযোগ হারান।

সরকার ও প্রশাসনের ভূমিকা: কোথায় আটকে যাচ্ছে সমাধান?
কয়েকটি সরকারি উদ্যোগ নিয়মিত পরিদর্শন করে ধাপা ঢিপিতে বসবাসকারী মানুষের তালিকা তৈরি করতে চেয়েছে। তবে জমির মালিকানার বিতর্ক ও বসতির ‘অস্থায়ী’ পরিচয়—এই কাজকে জটিল করে তুলেছে।
প্রশাসনের মনে সন্দেহ—বাসিন্দারা এখানে নতুন আসা অভিবাসী বা অবৈধ দখলদার। অন্যদিকে, মানুষের দাবি—তারা বহু বছর ধরে এখানে থাকেন এবং ন্যূনতম মানবাধিকার পাওয়ার যোগ্য।
এই দ্বন্দ্বের মাঝেই আটকে আছে তাদের জীবন।
ধাপা ঢিপির পরিচয় সংকট মূলত মানবাধিকারের প্রশ্ন। ঠিকানা বা জমির মালিকানা নেই বলেই একজন মানুষ রাষ্ট্রীয় পরিচয় হারাবে—এটি একটি অসম সমাজের প্রতিচ্ছবি।
সমাধান সম্ভব:
- মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে জরিপ পরিচালনা
- অস্থায়ী ঠিকানাকে বৈধ স্বীকৃতি দেওয়া
- শিশু ও নারীদের বিশেষ সুবিধা প্রদান
- দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন পরিকল্পনা
এই মানুষগুলো শুধু নথির জন্য নয়—স্বাভাবিক জীবনের জন্য লড়ছে। তাদের গল্প আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হওয়া প্রয়োজন।
👉 এই প্রতিবেদনটি শেয়ার করুন এবং ধাপা ঢিপির বাসিন্দাদের সংগ্রাম সম্পর্কে আরও মানুষকে জানাতে সাহায্য করুন।
👉 মন্তব্যে আপনার মতামত জানান—সরকারের কী করা উচিত বলে মনে করেন?






