ভারত যখন ২০৩৬ সালের অলিম্পিক্স আয়োজনের উচ্চাকাঙ্ক্ষী স্বপ্নকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরতে ব্যস্ত, ঠিক সেই সময়েই নতুন বিতর্কে জড়াল দেশের ক্রীড়া অবকাঠামো ও টুর্নামেন্ট ব্যবস্থাপনা। আন্তর্জাতিক ব্যাডমিন্টন মহলে আলোচনার কেন্দ্রে এখন ইন্ডিয়া ওপেন।
ডেনমার্কের এক শীর্ষস্থানীয় ব্যাডমিন্টন খেলোয়াড় প্রকাশ্যে অভিযোগ করেছেন, দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ইন্ডিয়া ওপেন চলাকালীন কোর্ট, আলো, শাটল এবং সামগ্রিক পরিবেশ আন্তর্জাতিক মানের থেকে অনেকটাই পিছিয়ে ছিল। তাঁর মন্তব্য ইতিমধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল।
এই অভিযোগ শুধুই একটি টুর্নামেন্টের সীমাবদ্ধতা নয়, বরং ভারতের বৈশ্বিক ক্রীড়া ভাবমূর্তির উপর সরাসরি আঘাত বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে এমন এক সময়ে, যখন ভারত আইওসি-র সামনে অলিম্পিক্স ২০৩৬ আয়োজনের জন্য নিজেদের প্রস্তুত বলে দাবি করছে।
ফলে প্রশ্ন উঠছে—ভারত কি সত্যিই বিশ্বের বৃহত্তম ক্রীড়া আসর আয়োজনের জন্য প্রস্তুত? নাকি এই ধরনের বিতর্ক ভবিষ্যতের স্বপ্নে বড় ধাক্কা দিতে পারে?
ইন্ডিয়া ওপেন নিয়ে ডেনিশ খেলোয়াড়ের বিস্ফোরক অভিযোগ

ডেনমার্কের এই অভিজ্ঞ খেলোয়াড় তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট করে জানান, কোর্টের আলো এতটাই অসামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল যে শাটল চোখে পড়তে সমস্যা হচ্ছিল। দ্রুতগতির র্যালির সময় এটি খেলোয়াড়দের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে।
তিনি আরও বলেন, “আমরা আন্তর্জাতিক সার্কিটে বহু টুর্নামেন্ট খেলেছি, কিন্তু এখানে ন্যূনতম মান রক্ষা করা হয়নি।” তাঁর মতে, শাটলের গুণমান ও কোর্টের পৃষ্ঠও প্রত্যাশার তুলনায় দুর্বল ছিল।
এই মন্তব্যের পরই প্রশ্ন উঠেছে, ব্যাডমিন্টন ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন (BWF)-এর অনুমোদন থাকা সত্ত্বেও কীভাবে এমন পরিস্থিতি তৈরি হলো। অনেকেই মনে করছেন, ভারতের আয়োজক সংস্থার প্রস্তুতির ঘাটতি এবার প্রকাশ্যে চলে এসেছে।
ভারতীয় খেলোয়াড়রা প্রকাশ্যে খুব বেশি প্রতিক্রিয়া না দিলেও, পর্দার আড়ালে অনেকেই এই অভিযোগের সঙ্গে সহমত পোষণ করছেন বলে সূত্রের খবর।
অলিম্পিক্স ২০৩৬ স্বপ্নের পথে ভারতের ভাবমূর্তি সংকটে?

ভারত ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির সামনে নিজেদের আগ্রহ প্রকাশ করেছে ২০৩৬ সালের অলিম্পিক্স আয়োজনের জন্য। প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে ক্রীড়া মন্ত্রক—সবার বক্তব্যেই উঠে এসেছে “বিশ্বমানের আয়োজন”-এর প্রতিশ্রুতি।
কিন্তু ইন্ডিয়া ওপেন বিতর্ক সেই দাবিকে নতুন করে যাচাইয়ের মুখে ফেলেছে। অলিম্পিক্স মানে শুধুমাত্র বড় স্টেডিয়াম নয়—বরং নিখুঁত ব্যবস্থাপনা, খেলোয়াড়বান্ধব পরিবেশ এবং আন্তর্জাতিক মানের লজিস্টিক সাপোর্ট।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি সুপার ৭৫০ ব্যাডমিন্টন টুর্নামেন্টে যদি এমন অভিযোগ ওঠে, তাহলে বহু খেলায় একসঙ্গে লক্ষাধিক অ্যাথলিট সামলানো কতটা চ্যালেঞ্জিং হবে, তা সহজেই অনুমেয়।
এই কারণেই আন্তর্জাতিক ক্রীড়া মহলের একাংশ মনে করছে, ভারতের উচিত আগে ছোট ও মাঝারি টুর্নামেন্টগুলোর মান নিখুঁত করা, তারপর অলিম্পিক্সের মতো মেগা ইভেন্টের স্বপ্ন দেখা।
আগেও কি উঠেছে এমন অভিযোগ? ভারতের ক্রীড়া আয়োজনের পুরনো ক্ষত

এটাই প্রথম নয়। অতীতেও ভারতের আয়োজিত আন্তর্জাতিক ক্রীড়া ইভেন্ট ঘিরে বিতর্ক হয়েছে। কমনওয়েলথ গেমস থেকে শুরু করে বিভিন্ন ওয়ার্ল্ড ট্যুর ইভেন্ট—বারবার পরিকাঠামো ও ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন উঠেছে।
যদিও প্রতিবারই আয়োজকরা উন্নতির প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, কিন্তু ধারাবাহিক অভিযোগ সেই অগ্রগতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। বিশেষ করে বিদেশি অ্যাথলিটদের নিরাপত্তা, আবাসন ও প্রশিক্ষণ সুবিধা নিয়ে অসন্তোষ নতুন নয়।
তবে এটাও সত্যি, ভারতের ক্রীড়া বাজার ও দর্শকসংখ্যা বিশাল। সেই সম্ভাবনাই আন্তর্জাতিক ফেডারেশনগুলিকে বারবার ভারতমুখী করেছে। কিন্তু সম্ভাবনা আর বাস্তবতার মাঝের ফাঁক যদি না কমে, তাহলে ভবিষ্যতে বড় ইভেন্ট হাতছাড়া হওয়ার ঝুঁকি থাকছে।
এই প্রেক্ষাপটে ইন্ডিয়া ওপেন বিতর্ক শুধুমাত্র একটি মন্তব্য নয়, বরং একটি সতর্কবার্তা।
ডেনমার্কের ব্যাডমিন্টন খেলোয়াড়ের অভিযোগ ভারতের ক্রীড়া জগতে অস্বস্তিকর হলেও তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। অলিম্পিক্স ২০৩৬ আয়োজনের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে হলে, আন্তর্জাতিক মানের প্রতিটি খুঁটিনাটি নিশ্চিত করা জরুরি।
ইন্ডিয়া ওপেন বিতর্ক প্রমাণ করে, অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি মানসিকতা ও ব্যবস্থাপনাতেও বদল দরকার। নইলে বড় স্বপ্ন বারবার ছোট ভুলেই ধাক্কা খাবে।






