দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে ঘিরে ফের বড়সড় বিতর্ক। ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ৫৪ লক্ষ নাম বাদ পড়া নিয়ে সরব হলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর অভিযোগ, এই বিপুল সংখ্যক ভোটারকে ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে এবং এর পেছনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার করা হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রীর দাবি অনুযায়ী, এই ঘটনা শুধু প্রশাসনিক ত্রুটি নয়—এটি সরাসরি বেআইনি ও অনৈতিক। নির্বাচন আসন্ন থাকতেই ভোটার তালিকা থেকে এত মানুষের নাম বাদ পড়া গণতন্ত্রের মূল ভিত্তিকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
নবান্নে এক সাংবাদিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে সাধারণ মানুষের সাংবিধানিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। প্রযুক্তির আড়ালে একটি গভীর ষড়যন্ত্র চলছে।” তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, বিষয়টি শুধুমাত্র রাজ্যের নয়, গোটা দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িত।
এই অভিযোগ ঘিরে রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে তীব্র প্রতিক্রিয়া। বিরোধী দলগুলিও বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে, যদিও কেন্দ্রীয় প্রশাসনের তরফে এখনও কোনও স্পষ্ট ব্যাখ্যা আসেনি।
৫৪ লক্ষ ভোটার বাদ যাওয়ার অভিযোগ: কী বললেন মুখ্যমন্ত্রী?

মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে নির্বাচন কমিশনের আওতায় যে ভোটার তালিকা সংশোধন হয়েছে, তাতে অস্বাভাবিকভাবে বিপুল সংখ্যক নাম বাদ পড়েছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, কীভাবে এত অল্প সময়ে এত বিশাল ডেটা পরিবর্তন সম্ভব?
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিযোগ, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে ভোটারদের নাম ‘ফিল্টার’ করা হয়েছে। এতে বহু প্রকৃত ভোটারের নাম বাদ পড়েছে, যাদের কোনওভাবেই অযোগ্য বলা যায় না। তাঁর কথায়, “এই কাজ যদি মানুষের হাতে হতো, তাহলে এত বড় ভুল ধরা পড়ত। এআই ব্যবহার করেই এই ছাঁটাই করা হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত করা হচ্ছে। বহু মানুষ জানতেই পারছেন না যে তাঁদের নাম তালিকায় নেই, ফলে নির্বাচনের দিন তাঁরা ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন না।
রাজ্য সরকার এই বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য চেয়ে নির্বাচন কমিশনের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী। পাশাপাশি তিনি আশ্বাস দেন, রাজ্য প্রশাসন আইনি পথেই এই লড়াই লড়বে।
এআই ও প্রযুক্তির অপব্যবহার: গণতন্ত্রের জন্য কতটা বিপজ্জনক?

এআই প্রযুক্তি আধুনিক প্রশাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও, এর অস্বচ্ছ ব্যবহার ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি ভোটার তালিকার মতো সংবেদনশীল ডেটায় স্বয়ংক্রিয় অ্যালগরিদম প্রয়োগ করা হয় এবং তার উপর যথাযথ মানব নজরদারি না থাকে, তবে গণতান্ত্রিক অধিকার গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
মুখ্যমন্ত্রী এই প্রসঙ্গে বলেন, প্রযুক্তি মানুষের সুবিধার জন্য, মানুষকে বঞ্চিত করার জন্য নয়। তাঁর অভিযোগ, একটি নির্দিষ্ট শ্রেণিকে ভোটাধিকার থেকে দূরে সরিয়ে রাখতেই এই ডিজিটাল ছাঁটাই করা হয়েছে।
এই ইস্যুতে প্রশ্ন উঠছে ডেটা সুরক্ষা ও স্বচ্ছতা নিয়েও। ভোটারদের ব্যক্তিগত তথ্য কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, কোন মানদণ্ডে নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে—এই সব প্রশ্নের কোনও স্পষ্ট উত্তর এখনও সামনে আসেনি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এআই-এর মতো শক্তিশালী প্রযুক্তি যদি রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার হয়, তবে ভবিষ্যতে নির্বাচন ব্যবস্থার উপর মানুষের আস্থা ভেঙে পড়তে পারে।
নির্বাচন কমিশন ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া


মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগের পর নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যদিও কমিশনের তরফে এখনও আনুষ্ঠানিক বিবৃতি আসেনি, রাজনৈতিক মহলে বিষয়টি ঘিরে চাপ বাড়ছে।
বিরোধী দলগুলির একাংশ এই অভিযোগকে ‘রাজনৈতিক চাপ তৈরির কৌশল’ বলে উড়িয়ে দিলেও, অন্যদিকে বহু নাগরিক সংগঠন নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি তুলেছে। তাঁদের মতে, ভোটার তালিকা গণতন্ত্রের মেরুদণ্ড, সেখানে কোনও রকম গোপনীয়তা বা অস্পষ্টতা গ্রহণযোগ্য নয়।
রাজ্য সরকার ইতিমধ্যেই ব্লক ও জেলা স্তরে বিশেষ ক্যাম্প চালানোর পরিকল্পনা করেছে, যাতে বাদ পড়া ভোটাররা দ্রুত নিজেদের নাম পুনরায় নথিভুক্ত করতে পারেন। তবে মুখ্যমন্ত্রীর স্পষ্ট বক্তব্য, সমস্যার মূল কারণ চিহ্নিত না হলে এই সমাধান স্থায়ী হবে না।
৫৪ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ যাওয়ার অভিযোগ শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক বিতর্ক নয়, এটি ভারতের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন তুলছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য বিষয়টিকে জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে এনে দিয়েছে।
এআই ও ডিজিটাল প্রযুক্তির যুগে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, মানবিক নজরদারি এবং জবাবদিহি আরও জরুরি হয়ে উঠেছে। ভোটাধিকার রক্ষা করা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়, এটি গণতন্ত্রের প্রতি সম্মিলিত দায়বদ্ধতার প্রতিফলন। এই বিতর্কের নিষ্পত্তি কীভাবে হয়, তার দিকেই এখন তাকিয়ে দেশ।






