বারাসতের যুবক অমিত দাসের মৃত্যুকে ঘিরে রহস্য আরও গভীর হচ্ছে। প্রথমে পরিবারের দাবি ছিল—চোখ ইঁদুরে খুবলেছে। পরে উঠে আসে অন্য প্রশ্ন—চোখ আদৌ ইঁদুরে খুবলেছে, নাকি কেউ খুলে নিয়েছে? এই বিতর্কের মাঝেই দেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হল বারাসতে।
ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্ট কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিশা দিয়েছে, যদিও তদন্ত এখনও চলমান। এর মধ্যেই মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে অমিতের মা আজ সরকারি চাকরির নিয়োগপত্র হাতে পেলেন। নিছক সান্ত্বনা নয়—এক ধরনের ন্যায়বিচারের আশ্বাস বলেই মনে করছেন বহু মানুষ।
অমিত দাসের এই মৃত্যু শুধু একটি পরিবারকেই ভেঙে দেয়নি; পুরো উত্তর ২৪ পরগনার মানুষের মনেও ঝড় তুলেছে। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া তথ্য, দেহের অবস্থা এবং স্থানীয়দের বয়ান—সব মিলিয়ে রহস্য আরও ঘনীভূত। ঠিক কী হয়েছিল সেই দিন? কারা দায়ী? প্রশাসন কি দ্রুত সত্য সামনে আনতে পারবে?
এইসব প্রশ্ন এখন বারাসতের প্রতিটি গলিতে ঘুরছে।
অন্যদিকে, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘটনার গুরুত্ব অনুধাবন করেই পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তার জন্য তৎপর হন। তাঁর নির্দেশে অমিতের মা-কে সরকারি চাকরির নিয়োগ দেওয়া হয়। পরিবারের মতে, এটি সম্মান ও নিরাপত্তা—দুটোরই প্রতীক।
ঘটনার দিন কী হয়েছিল?—নতুন প্রশ্নে ভরে যাচ্ছে বারাসত

অমিত দাসকে শেষবার দেখা গিয়েছিল এক বন্ধুদের সঙ্গে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁর নিথর দেহ উদ্ধার হয় রেললাইন সংলগ্ন এলাকায়। প্রথম মুহূর্তে পুলিশ দুর্ঘটনার সম্ভাবনার দিকেই ঝুঁকেছিল। কিন্তু পরিবারের দাবি ছিল ভিন্ন—তারা জানায়, দেহের চোখ খুবলে নেওয়া অবস্থায় পাওয়া গেছে, যা দুর্ঘটনার সঙ্গে মেলে না।
এরপর থেকেই নতুন প্রশ্ন ওঠে—এটা কি ইঁদুরে খুবলেছে, নাকি কেউ চোখ খুলে নিয়েছে? যদি খুলে নিয়ে থাকে, তাহলে উদ্দেশ্য কী? কোনও অপরাধী চক্র এর সঙ্গে যুক্ত?
স্থানীয়দের কথায় জানা যায়, সেই এলাকায় রাতের বেলা অসামাজিক কার্যকলাপ চলে। ফলে তদন্তকারীরা হত্যার সম্ভাবনাটিও এড়িয়ে যাচ্ছেন না।
ময়নাতদন্তে চোখের ক্ষত চিহ্ন নিয়ে ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা বিস্তারিত মত দিতে শুরু করেছেন। তাঁরাই পরবর্তী তদন্তের মূল চাবিকাঠি।
ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্ট—রহস্য আরও গাঢ়

ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্টে জানা গেছে, অমিতের চোখে ক্ষত ছিল ঠিকই, তবে সেই ক্ষত কেমন ধরনের তা নিশ্চিতভাবে জানানো হয়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন—এমন ক্ষত হয় ইঁদুর ও শিয়ালের মতো প্রাণীর কামড়ে, আবার অস্ত্র দিয়েও এমন ক্ষত সৃষ্টি করা যায়।
তাই চূড়ান্ত রিপোর্ট ছাড়া নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না, চোখ খুবলেছে প্রাণী, নাকি মানুষের হাত।
দেহে অন্যান্য আঘাতের চিহ্নও রয়েছে। এগুলো কি মারধরের? নাকি দুর্ঘটনার কারণ?
যদিও পুলিশের একটি অংশ দুর্ঘটনার তত্ত্ব তুলে ধরে বলছে—রেললাইন সংলগ্ন এলাকায় এমন ঘটনার নজির আছে।
কিন্তু পরিবারের বক্তব্য স্পষ্ট—“এটা কোনও দুর্ঘটনা নয়। আমাদের ছেলেকে খুন করা হয়েছে।”
এখন তদন্তে সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল কল রেকর্ড, বন্ধুবান্ধবের বয়ান—সব খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে চাকরি—ছেলে হারানোর ব্যথায় সামান্য সান্ত্বনা

অমিতের মৃত্যুর পর থেকেই পরিবারের আর্থিক অবস্থা নাজুক হয়ে পড়ে। এই অবস্থায় মুখ্যমন্ত্রী দ্রুত সিদ্ধান্ত নেন—অমিতের মাকে সরকারি চাকরি দেওয়া হবে। বারাসত মহকুমা শাসকের কার্যালয়ে আজ তাঁর হাতে নিয়োগপত্র তুলে দেওয়া হয়।
পরিবারের চোখে আজ অশ্রু ছিল—শুধু ব্যথার নয়, স্বস্তিরও।
মুখ্যমন্ত্রীর এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাঁদের মতে, প্রশাসন অন্তত পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছে।
তবে তাঁরা আরও বলছেন—শুধু চাকরিই নয়, মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত অপরাধী শনাক্ত করা এবং কঠোর শাস্তি দেওয়া।
প্রশাসনের দাবি—তদন্ত দ্রুত এগোচ্ছে। অপরাধী ধরা না পড়া পর্যন্ত তারা থামবে না।
তবে অনেকেরই মত, এই ঘটনার প্রকৃত সত্য উদঘাটনে ফরেনসিক রিপোর্টই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে।
অমিত দাসের রহস্যমৃত্যু এখন বারাসতের মানুষের আবেগ, ক্ষোভ এবং প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দু। চোখ খুবলে নেওয়া হয়েছিল কি না, অথবা চোখ চুরি হয়েছে কি না—এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর দেবে ফরেনসিকের চূড়ান্ত রিপোর্ট।
তবে এর মধ্যেই তাঁর মা যে সরকারি চাকরি পেলেন, তা একদিকে মানবিকতার উদাহরণ, অন্যদিকে ভবিষ্যতের নিরাপত্তার ভিত্তি।
এখন সবার নজর তদন্ত দলের দিকে—কবে সত্য সামনে আসে, এবং অমিতের জন্য ন্যায় মিলবে কি না, সেটাই সময় বলবে।






