ভারতীয় বিনোদন জগতে কনটেন্টের ধরন দ্রুত বদলাচ্ছে। দর্শক এখন শুধু বিনোদন নয়, বাস্তব সমাজের জটিল প্রশ্ন নিয়ে তৈরি সাহসী গল্পও দেখতে চান। সেই প্রেক্ষাপটে এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিল কলকাতা-ভিত্তিক প্রযোজনা সংস্থা SVF Entertainment। প্রথমবারের মতো হিন্দি লং-ফরম্যাট ডিজিটাল স্পেসে প্রবেশ করছে তারা, আর সেই পথচলার সূচনা হচ্ছে নতুন ওয়েব সিরিজ “Chiraiya” দিয়ে।
সামাজিক ড্রামা ঘরানার এই সিরিজটি ২০ মার্চ ২০২৬ থেকে স্ট্রিমিং হবে JioHotstar-এ। সিরিজটির কেন্দ্রে রয়েছেন জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত অভিনেত্রী দিব্যা দত্ত। বিবাহ, সম্মতি এবং সমাজের নীরবতার মতো সংবেদনশীল বিষয়কে সামনে এনে তৈরি এই সিরিজ ইতিমধ্যেই দর্শকদের মধ্যে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
আজ প্রকাশিত হয়েছে সিরিজটির অফিসিয়াল ট্রেলার, যা দেখার পর অনেকেই বলছেন—এটি শুধু একটি ওয়েব সিরিজ নয়, বরং সমাজের সামনে ধরা এক আয়না। গল্পটি এমন এক বাস্তবতাকে তুলে ধরে, যা বহু পরিবারে নীরবে ঘটে চললেও তা নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা খুব কমই হয়।
‘Chiraiya’ মূলত তুলে ধরেছে সেই অস্বস্তিকর প্রশ্ন—বিয়ে কি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্মতির সমার্থক? এবং যদি না হয়, তবে কেন সমাজ এখনো এই বিষয়ে নীরব?
SVF-এর নতুন অধ্যায়: হিন্দি ডিজিটাল স্পেসে বড় পদক্ষেপ

ভারতের অন্যতম সফল প্রযোজনা সংস্থা হিসেবে SVF Entertainment বহু বছর ধরে বাংলা চলচ্চিত্র ও সিরিজের জগতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তারা ইতিমধ্যেই হিন্দি টেলিভিশন, দক্ষিণ ভারতীয় ভাষার ওয়েব সিরিজ, এবং গুজরাটি ও পাঞ্জাবি চলচ্চিত্র নির্মাণেও সাফল্য অর্জন করেছে।
এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতার পর এবার তারা সরাসরি প্রবেশ করছে হিন্দি লং-ফরম্যাট ডিজিটাল কনটেন্টে। ‘Chiraiya’ সেই যাত্রার প্রথম পদক্ষেপ।
SVF-এর বিজনেস হেড অভিষেক দাগা জানিয়েছেন, এই সিরিজের মাধ্যমে তারা এমন একটি গল্প বলতে চেয়েছেন যা দর্শকদের শুধু আকৃষ্টই করবে না, বরং ভাবতেও বাধ্য করবে।
তার কথায়, গল্পটি এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায় যা অনেক সময় সমাজে অস্বস্তিকর বলে এড়িয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু সম্মতি, মর্যাদা এবং পারিবারিক সম্পর্কের জটিলতা—এই বিষয়গুলোকে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সাহসী সামাজিক গল্প বলার প্রবণতা এখন দ্রুত বাড়ছে। ‘Chiraiya’ সেই ধারাতেই তৈরি একটি সিরিজ, যেখানে বিনোদনের পাশাপাশি রয়েছে শক্তিশালী সামাজিক বার্তা।
গল্পের কেন্দ্রে নীরবতার বিরুদ্ধে এক নারীর লড়াই

‘Chiraiya’-র গল্প আবর্তিত হয়েছে কমলেশ নামের এক নারীকে কেন্দ্র করে, যিনি একটি ঐতিহ্যবাহী ও ঘনিষ্ঠ পরিবারের আদর্শ পুত্রবধূ।
বাইরে থেকে সবকিছু স্বাভাবিক এবং সুখী মনে হলেও একদিন কমলেশ জানতে পারেন যে তার ননদ পূজা নিজের বিবাহিত জীবনে যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন।
এই সত্য জানার পর কমলেশের জীবন বদলে যেতে শুরু করে।
একদিকে রয়েছে পরিবারের সম্মান রক্ষা করার চাপ, অন্যদিকে রয়েছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর নৈতিক দায়িত্ব। এই দ্বন্দ্বই সিরিজটির মূল নাটকীয়তা তৈরি করে।
গল্পটি ধীরে ধীরে দেখায় কীভাবে দীর্ঘদিনের সামাজিক বিশ্বাস, পারিবারিক চাপ এবং নীরবতা অনেক সময় অন্যায়ের সহায়ক হয়ে ওঠে।
এখানেই সিরিজটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য—বিয়ে কখনোই সম্মতির স্থায়ী অনুমতি নয়।
কমলেশের যাত্রা কোনো উচ্চকিত বিদ্রোহ নয়, বরং ধীরে ধীরে জেগে ওঠা এক অন্তর্দ্বন্দ্বের গল্প। যেখানে একজন নারী নিজের মূল্যবোধ, পরিবার এবং ন্যায়ের প্রশ্নের মধ্যে দাঁড়িয়ে নতুন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন।
শক্তিশালী অভিনয় ও সংবেদনশীল পরিচালনা
এই ছয় পর্বের সিরিজটি পরিচালনা করেছেন শশান্ত শাহ। তিনি জানিয়েছেন, এই গল্প পরিচালনা করা তার জন্য আবেগপূর্ণ এবং চ্যালেঞ্জিং অভিজ্ঞতা ছিল।
তার মতে, সিরিজটির শক্তি রয়েছে এর বাস্তবতায়। এখানে কোনো অতিরঞ্জিত নাটকীয়তা নেই; বরং সাধারণ জীবনের মধ্যেই লুকিয়ে থাকা অস্বস্তিকর সত্যগুলো ধীরে ধীরে সামনে আসে।
তিনি আরও বলেন, অনেক সময় শুটিংয়ের সময় এমন মুহূর্ত তৈরি হতো যেখানে পুরো ইউনিট নিঃশব্দ হয়ে যেত—কারণ দৃশ্যগুলো বাস্তব জীবনের খুব কাছাকাছি।
অভিনেত্রী দিব্যা দত্ত, যিনি কমলেশ চরিত্রে অভিনয় করেছেন, জানিয়েছেন এই চরিত্র তার হৃদয়ের খুব কাছের।
তার মতে, কমলেশ এমন একজন নারী যিনি পরিবারের মূল্যবোধে বিশ্বাস করেন, কিন্তু অন্যায়ের মুখোমুখি হয়ে সেই বিশ্বাসগুলোকেই প্রশ্ন করতে বাধ্য হন।
অভিনেতা সঞ্জয় মিশ্রও সিরিজটির প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেন, এই গল্পের সবচেয়ে বড় শক্তি এর সততা। এখানে চরিত্রগুলোকে নায়ক বা খলনায়ক হিসেবে দেখানো হয়নি; বরং তারা সমাজ ও বিশ্বাসের প্রভাবেই তৈরি।
সিরিজে আরও অভিনয় করেছেন সিদ্ধার্থ শ’, প্রসন্না বিস্ত, ফৈসল রশিদ, টিন্নু আনন্দ, সরিতা যোশি এবং অঞ্জুম সাক্সেনা।
বর্তমান সময়ে ওটিটি প্ল্যাটফর্মে নানা ধরনের কনটেন্ট আসছে। কিন্তু সব গল্প সমানভাবে সমাজে আলোড়ন তোলে না। ‘Chiraiya’ সেই বিরল সিরিজগুলোর মধ্যে একটি, যা বিনোদনের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক প্রশ্নও সামনে আনে।
বিবাহ, সম্মতি এবং পারিবারিক নীরবতার মতো জটিল বিষয়কে সংবেদনশীলভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে এই সিরিজ।
SVF Entertainment-এর জন্য এটি শুধু একটি নতুন প্রজেক্ট নয়; বরং হিন্দি ডিজিটাল কনটেন্ট জগতে তাদের নতুন অধ্যায়ের সূচনা।
দর্শকদের জন্য এটি হতে পারে এমন একটি গল্প, যা দেখার পর শুধু বিনোদনই নয়—বরং চিন্তার খোরাকও দেবে।
‘Chiraiya’ স্ট্রিমিং শুরু হবে ২০ মার্চ ২০২৬ থেকে, শুধুমাত্র JioHotstar-এ।






