বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে পরিচিত চীন বর্তমানে এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, দেশটির উৎপাদন খাত আরও মন্থর হয়েছে, যা কেবল অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির জন্যই নয়, বিশ্ববাজারের জন্যও উদ্বেগজনক ইঙ্গিত বহন করছে।
উৎপাদন সূচকে ধারাবাহিক পতন প্রমাণ করছে যে, কোভিড-পরবর্তী পুনরুদ্ধার প্রত্যাশার তুলনায় অনেকটাই দুর্বল। শিল্প উৎপাদনের গতি কমার সঙ্গে সঙ্গে রপ্তানি, কর্মসংস্থান ও ভোক্তা আস্থাতেও তার প্রভাব পড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধীরগতি হঠাৎ নয়। দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা কাঠামোগত সমস্যা, বৈশ্বিক মন্দার চাপ এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদার দুর্বলতা—সব মিলিয়ে চীনের অর্থনীতি এখন এক জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে।
এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে—উৎপাদন খাতের এই দুর্বলতা কি সাময়িক, নাকি এটি বৃহত্তর অর্থনৈতিক রূপান্তরের পূর্বাভাস?
উৎপাদন সূচকের পতন: সংখ্যায় ধরা পড়ছে উদ্বেগ
সাম্প্রতিক মাসগুলিতে চীনের ম্যানুফ্যাকচারিং পারচেজিং ম্যানেজার্স ইনডেক্স (PMI) ধারাবাহিকভাবে সংকোচনের ইঙ্গিত দিয়েছে। ৫০-এর নিচে অবস্থান করা এই সূচক স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিচ্ছে যে, উৎপাদন খাত এখনও সম্প্রসারণের পথে ফিরতে পারেনি।
বিশেষ করে ভারী শিল্প, নির্মাণ-সংযুক্ত সামগ্রী এবং রপ্তানিনির্ভর কারখানাগুলি সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে। নতুন অর্ডার কমে যাওয়ায় বহু সংস্থা উৎপাদন কমাতে বাধ্য হচ্ছে।
এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে কর্মসংস্থানে। অস্থায়ী ছাঁটাই, ওভারটাইম কমানো এবং নতুন নিয়োগে স্থবিরতা—এই প্রবণতাগুলি ক্রমেই সাধারণ হয়ে উঠছে। ফলে ভোক্তা ব্যয় আরও সংকুচিত হচ্ছে, যা একটি নেতিবাচক চক্র তৈরি করছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, উৎপাদন খাতের এই দুর্বলতা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে চীনের বার্ষিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়বে।
বৈশ্বিক চাহিদা ও রপ্তানি সংকট: বহুমুখী চাপ

চীনের উৎপাদন খাত ঐতিহাসিকভাবে রপ্তানিনির্ভর। কিন্তু ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় সেই ভিত্তিই এখন নড়বড়ে। উচ্চ সুদের হার, মুদ্রাস্ফীতি এবং ভোক্তা ব্যয়ের সংকোচন—এই তিনের যুগপৎ প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে অর্ডার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
বন্দর ও লজিস্টিক হাবগুলিতে কন্টেনার চলাচল কমে আসা সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন। একসময় যে বন্দরগুলি ২৪ ঘণ্টা কর্মচাঞ্চল্যে মুখর থাকত, সেখানে এখন স্পষ্ট শ্লথতা চোখে পড়ছে।
এই পরিস্থিতি চীনের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উৎপাদনকারী সংস্থাগুলিকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বড় কর্পোরেট সংস্থাগুলি কিছুটা সঞ্চিত মূলধনের জোরে টিকে থাকলেও, ছোট সংস্থাগুলির জন্য পরিস্থিতি ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক চাহিদা দ্রুত না ফিরলে চীনের উৎপাদন পুনরুদ্ধার আরও বিলম্বিত হতে পারে।
অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও নীতিগত চ্যালেঞ্জ: সমাধান কতটা সহজ?

রপ্তানি দুর্বল হলেও অভ্যন্তরীণ চাহিদা শক্তিশালী হলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যেত। কিন্তু বাস্তবে সেটিও হচ্ছে না। আবাসন খাতে দীর্ঘমেয়াদি সংকট, যুব বেকারত্ব এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে ভোক্তারা খরচে সংযমী হয়ে উঠছেন।
সরকার বিভিন্ন প্রণোদনা প্যাকেজ ও নীতিগত সহায়তার ঘোষণা করলেও, তার প্রভাব এখনও সীমিত। অবকাঠামো বিনিয়োগ কিছুটা গতি আনলেও, তা টেকসই চাহিদা তৈরি করতে পারছে না।
নীতিনির্ধারকদের সামনে তাই দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ—একদিকে স্বল্পমেয়াদি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির কাঠামোগত সংস্কার। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আর্থিক প্রণোদনা নয়, আস্থা ফেরানোই এখন সবচেয়ে জরুরি।
এই পরিস্থিতিতে চীনের অর্থনীতি কোন পথে এগোবে, তা অনেকাংশেই নির্ভর করবে আগামী কয়েক ত্রৈমাসিকে গৃহীত নীতিগত সিদ্ধান্তের উপর।
চীনের উৎপাদন খাতে চলমান ধীরগতি নিছক একটি পরিসংখ্যানগত পরিবর্তন নয়; এটি বৃহত্তর অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। বৈশ্বিক চাহিদার দুর্বলতা, অভ্যন্তরীণ আস্থার সংকট এবং কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা—সব মিলিয়ে দেশটির অর্থনীতি এখন স্পষ্ট চাপে।
যদিও চীন অতীতেও নানা সংকট সামলে উঠেছে, তবু বর্তমান পরিস্থিতি আলাদা। এখানে দ্রুত সমাধানের চেয়ে সুপরিকল্পিত ও আস্থাভিত্তিক সংস্কারই দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে পারে। বিশ্ব অর্থনীতির দৃষ্টিতে, চীনের এই যাত্রাপথ তাই গভীর মনোযোগের দাবি রাখে।






