ভারতের লোকসংস্কৃতি, বিশ্বাস এবং ধর্মীয় আচারকে ঘিরে নির্মিত চলচ্চিত্র সবসময়ই দর্শকদের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে। ঠিক সেই রকমই এক নতুন আলোড়ন তৈরি করেছে আসন্ন চলচ্চিত্র “Charak: Fair of Faith”। ৬ মার্চ ২০২৬-এ সারা দেশে মুক্তির আগে ছবির প্রচারে কলকাতায় পৌঁছেছিল পুরো টিম, আর সেই সফর ঘিরেই শহরে তৈরি হয়েছে উচ্ছ্বাসের পাশাপাশি বিতর্কও।
কলকাতা সফরের সময় পরিচালক ও প্রযোজক দলের সদস্যরা স্থানীয় মিডিয়া, চলচ্চিত্রপ্রেমী এবং ডিজিটাল ইনফ্লুয়েন্সারদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। ছবির গল্প, গবেষণা এবং লোককথার উপাদান নিয়ে তারা বিস্তারিত আলোচনা করেন। পূর্ব ভারতের আঞ্চলিক সংস্কৃতির সঙ্গে ছবিটির গভীর সংযোগ থাকায় কলকাতাকে প্রচারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে বেছে নেওয়া হয়।
এই ছবির প্রযোজক সুদীপ্ত সেন ইতিমধ্যেই আলোচিত চলচ্চিত্র “The Kerala Story”-এর জন্য পরিচিত। তাঁর প্রযোজনায় তৈরি এই নতুন লোককাহিনি-ভিত্তিক থ্রিলার মুক্তির আগেই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে ট্রেলার প্রকাশের পর থেকেই দর্শকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে প্রবল কৌতূহল।
তবে প্রচারের মাঝেই কলকাতার রাস্তায় ঘটে যায় অপ্রত্যাশিত ঘটনা। কিছু প্রতিবাদকারী ছবির পোস্টারে কালো রং মেখে বিক্ষোভ দেখান। তাদের অভিযোগ, ছবিতে চারক উৎসবের কিছু নেতিবাচক দিক তুলে ধরা হয়েছে, যা তাদের মতে ঐতিহ্যবাহী উৎসবের ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ণ করছে। ফলে মুক্তির আগেই ছবিটি ঘিরে বিতর্ক আরও তীব্র হয়ে উঠেছে।
কলকাতায় ‘চারক’ ছবির প্রচার: উচ্ছ্বাসে দর্শক ও মিডিয়া

কলকাতায় অনুষ্ঠিত প্রেস কনফারেন্সে উপস্থিত ছিলেন প্রযোজক সুদীপ্ত সেন, অভিনেতা সুব্রত দত্ত এবং সংগীত পরিচালক বিশাখ জ্যোতি। তারা ছবির বিষয়বস্তু, নির্মাণ প্রক্রিয়া এবং গবেষণার বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
সুদীপ্ত সেন জানান, ছবিটি তৈরির আগে নির্মাতারা চারক উৎসবের ইতিহাস, লোকবিশ্বাস এবং সামাজিক প্রেক্ষাপট নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করেছেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল কেবলমাত্র একটি ভৌতিক বা থ্রিলার ছবি তৈরি করা নয়, বরং বিশ্বাস এবং অন্ধবিশ্বাসের মধ্যকার সূক্ষ্ম পার্থক্য তুলে ধরা।
অভিনেতা সুব্রত দত্ত বলেন, “এই ছবির চরিত্রগুলো বাস্তব সমাজের নানা দিককে প্রতিফলিত করে। বিশ্বাস কখনও মানুষকে শক্তি দেয়, আবার কখনও অন্ধ বিশ্বাস বিপজ্জনক দিকেও নিয়ে যেতে পারে—এই দ্বন্দ্বই ছবির মূল গল্প।”
কলকাতার দর্শকদের প্রতিক্রিয়াও ছিল অত্যন্ত উৎসাহজনক। অনেক চলচ্চিত্রপ্রেমী ট্রেলার দেখে ছবিটি নিয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে বাংলা লোকসংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে নির্মিত গল্প হওয়ায় এই অঞ্চলের দর্শকদের মধ্যে কৌতূহল আরও বেশি।
চারক উৎসবের চিত্রায়ন ঘিরে বিতর্ক ও বিক্ষোভ

ছবির প্রচার চলাকালীনই কলকাতার একাধিক জায়গায় প্রতিবাদ শুরু হয়। বিক্ষোভকারীরা দাবি করেন, ছবিতে চারক উৎসবের কিছু কঠোর বা নেতিবাচক দিক তুলে ধরা হয়েছে যা তাদের মতে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ভুলভাবে উপস্থাপন করছে।
চারক উৎসব মূলত পশ্চিমবঙ্গ এবং পূর্ব ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে পালিত একটি প্রাচীন ধর্মীয় উৎসব। এই উৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে আছে শিবভক্তদের নানা আচার-অনুষ্ঠান, লোকসংস্কৃতি এবং সামাজিক ঐতিহ্য।
প্রতিবাদকারীদের মতে, এই উৎসবের মূল ভাবনা হল ভক্তি, বিশ্বাস এবং আধ্যাত্মিকতা। কিন্তু ছবিতে যদি কেবলমাত্র চরম আচার বা অন্ধবিশ্বাসের দিকগুলোকে তুলে ধরা হয়, তবে তা সাধারণ মানুষের কাছে উৎসবের ভুল ধারণা তৈরি করতে পারে।
তবে ছবির নির্মাতারা জানিয়েছেন, তাদের উদ্দেশ্য কোনও সংস্কৃতিকে আঘাত করা নয়। বরং লোককথা ও সামাজিক বাস্তবতার একটি অন্ধকার দিককে গল্পের মাধ্যমে তুলে ধরা। এই বিতর্কের ফলে ছবিটি নিয়ে জনমনে আগ্রহ আরও বেড়েছে বলেই মনে করছেন চলচ্চিত্র বিশ্লেষকরা।
লোককথা, অন্ধবিশ্বাস ও থ্রিলারের মিশেলে ‘চারক’

“Charak: Fair of Faith” ছবির গল্প মূলত পূর্ব ভারতের লোককথা ও গ্রামীণ বিশ্বাসকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। পরিচালক শীলাদিত্য মৌলিক এই ছবিতে তুলে ধরেছেন বিশ্বাস, ভয় এবং সামাজিক বাস্তবতার জটিল সম্পর্ক।
ছবিতে অভিনয় করেছেন অঞ্জলি পাতিল, সাহিদুর রহমান, সুব্রত দত্ত, শশী ভূষণ, নলনীশ নীল, শঙ্খদীপ এবং শৌনক শ্যামল। প্রত্যেকেই তাদের চরিত্রের মাধ্যমে গল্পে গভীরতা ও তীব্রতা যোগ করেছেন।
এই ছবির সংগীত পরিচালনা করেছেন বিশাখ জ্যোতি। ছবির আবহসংগীত ও লোকসংগীতের মিশ্রণ দর্শকদের মধ্যে এক ভৌতিক ও রহস্যময় পরিবেশ তৈরি করতে সাহায্য করবে বলে মনে করছেন নির্মাতারা।
ছবিটি প্রযোজনা করেছে ধবল জয়ন্তিলাল গাদা এবং সিপিং টি সিনেমাস, সুদীপ্ত সেন প্রোডাকশনের সহযোগিতায়। এটি উপস্থাপন করছে PEN Studios, যার নেতৃত্বে রয়েছেন ড. জয়ন্তিলাল গাদা।
চলচ্চিত্র সমালোচকদের মতে, লোকসংস্কৃতি ও মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলারের এই মিশ্রণ ভারতীয় সিনেমায় একটি ভিন্ন স্বাদ এনে দিতে পারে। বিশেষ করে আঞ্চলিক লোককাহিনি ভিত্তিক গল্প আন্তর্জাতিক দর্শকদের কাছেও আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।
মুক্তির আগেই “Charak: Fair of Faith” ছবিটি দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কলকাতায় প্রচারের সময় একদিকে যেমন উৎসাহ দেখা গেছে, অন্যদিকে তেমনি তৈরি হয়েছে বিতর্কও।
তবে চলচ্চিত্র বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের বিতর্ক অনেক সময় একটি ছবির প্রতি মানুষের আগ্রহ আরও বাড়িয়ে দেয়। কারণ দর্শকরা নিজেরাই দেখতে চান ছবিটি আসলে কী দেখাতে চেয়েছে।
লোককথা, আধ্যাত্মিক বিশ্বাস এবং অন্ধবিশ্বাসের জটিল সম্পর্ককে কেন্দ্র করে তৈরি এই থ্রিলার ৬ মার্চ সারা দেশে মুক্তি পাচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, মুক্তির পর দর্শকদের প্রতিক্রিয়া কেমন হয় এবং ছবিটি বক্স অফিসে কতটা সাফল্য পায়।






