কলকাতা রাজনীতিতে ফের উত্তাপ। আই-প্যাক (I-PAC) অফিসে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের (ইডি) অভিযানের বিরুদ্ধে তৃণমূল কংগ্রেস যে আবেদন করেছিল, তা খারিজ করে দিল Calcutta High Court। আদালতের এই সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
তৃণমূলের অভিযোগ ছিল, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আই-প্যাক অফিসে অভিযান চালানো হয়েছে এবং এতে দলের সাংগঠনিক কাজ ব্যাহত হচ্ছে। কিন্তু আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে, তদন্তকারী সংস্থার কাজের ক্ষেত্রে এই মুহূর্তে হস্তক্ষেপ করার মতো কোনও যুক্তি বা প্রমাণ তারা দেখছে না।
এই রায় এমন এক সময়ে এল, যখন রাজ্যে কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক এবং কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক তুঙ্গে। একদিকে তৃণমূল কংগ্রেস কেন্দ্রের বিরুদ্ধে ‘প্রতিহিংসার রাজনীতি’র অভিযোগ তুলছে, অন্যদিকে কেন্দ্র বলছে—আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়।
আইনগত লড়াইয়ের এই পর্ব শুধু রাজনৈতিক বক্তব্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রভাব পড়ছে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং আসন্ন রাজনৈতিক সমীকরণেও। ফলে কলকাতা হাই কোর্টের এই রায় নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলস্টোন।
আই-প্যাক অফিসে ইডি অভিযান ও মামলার প্রেক্ষাপট

আই-প্যাক বা ইন্ডিয়ান পলিটিক্যাল অ্যাকশন কমিটি একটি সুপরিচিত রাজনৈতিক কনসালটেন্সি সংস্থা, যারা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের জন্য কৌশলগত পরামর্শ দিয়ে থাকে। পশ্চিমবঙ্গে এই সংস্থার অফিসে ইডি হানা দেওয়ার পর থেকেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করে—এই অভিযান কি নিছক তদন্ত, নাকি রাজনৈতিক চাপ তৈরির কৌশল?
তৃণমূল কংগ্রেসের তরফে দাবি করা হয়, আই-প্যাকের সঙ্গে দলের পেশাদার সম্পর্ক রয়েছে এবং সেখানে অভিযান মানে পরোক্ষভাবে দলের কাজকর্মে বাধা সৃষ্টি করা। সেই যুক্তিতেই তারা আদালতের দ্বারস্থ হয়, অভিযানের বৈধতা এবং উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
ইডির বক্তব্য ছিল, আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত একটি চলমান তদন্তের অংশ হিসেবেই এই অভিযান চালানো হয়েছে। কোনও রাজনৈতিক দলের প্রতি পক্ষপাতিত্ব বা প্রতিহিংসা এখানে নেই বলেই সংস্থা দাবি করে। আদালতে ইডির আইনজীবীরা স্পষ্ট করেন, তদন্তের স্বার্থে কিছু নথি ও ডিজিটাল তথ্য সংগ্রহ করা জরুরি ছিল।
এই টানাপোড়েনের মধ্যেই মামলাটি কলকাতা হাই কোর্টে ওঠে এবং সেখানেই রাজনৈতিক বিতর্ক আইনি রূপ পায়।
কলকাতা হাই কোর্টের পর্যবেক্ষণ ও আইনি ব্যাখ্যা

শুনানির সময় আদালত পরিষ্কারভাবে জানায়, তদন্তকারী সংস্থার কাজের ক্ষেত্রে আদালত সাধারণত হস্তক্ষেপ করে না, যদি না স্পষ্টভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার প্রমাণিত হয়। বিচারপতির মন্তব্য, “আইনের অধীনে থেকে যদি তদন্ত চলে, তাহলে রাজনৈতিক পরিচয় বিচার্য বিষয় হতে পারে না।”
আদালত আরও বলে, অভিযানের ফলে কোনও মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে—এমন প্রাথমিক প্রমাণ আবেদনকারী পক্ষ দেখাতে পারেনি। ফলে এই পর্যায়ে ইডির অভিযান স্থগিত বা বাতিল করার প্রশ্নই ওঠে না।
এই পর্যবেক্ষণ কার্যত তৃণমূলের যুক্তিকে দুর্বল করে দেয়। আদালতের মতে, তদন্তের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে হলে কেবল রাজনৈতিক আশঙ্কা নয়, শক্ত আইনি ভিত্তি দরকার।
আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, এই রায় ভবিষ্যতে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া অনুরূপ মামলায় দৃষ্টান্ত হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। বিশেষ করে যখন রাজনৈতিক দলগুলি তদন্তকে ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’ বলে চিহ্নিত করে।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও বৃহত্তর প্রভাব

রায় ঘোষণার পরই তৃণমূল কংগ্রেসের তরফে তীব্র প্রতিক্রিয়া আসে। দলের নেতারা অভিযোগ করেন, কেন্দ্র রাজনৈতিক বিরোধীদের দমনে ইডি ও অন্যান্য সংস্থাকে ব্যবহার করছে। যদিও আদালতের রায়কে তারা প্রকাশ্যে সমালোচনা করলেও, আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে দল।
অন্যদিকে বিরোধী শিবিরের বক্তব্য, আদালতের এই সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে যে তৃণমূলের অভিযোগ ভিত্তিহীন। তাদের মতে, আইন নিজের পথে চলছে এবং রাজনৈতিক দলগুলি অহেতুক চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে।
এই ঘটনার প্রভাব রাজ্য রাজনীতির বাইরেও পড়তে পারে। প্রশাসনিক স্তরে তদন্তকারী সংস্থাগুলির স্বাধীনতা, রাজনৈতিক পরামর্শদাতা সংস্থার ভূমিকা এবং দলগুলির সঙ্গে তাদের সম্পর্ক—সবকিছুই নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আসন্ন নির্বাচনী আবহে এই ধরনের মামলার সংখ্যা বাড়তে পারে। ফলে আদালতের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে, যাতে তদন্ত ও রাজনীতির সীমারেখা স্পষ্ট থাকে।
কলকাতা হাই কোর্টের এই রায় স্পষ্ট বার্তা দেয়—আইনি প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখতে হবে। তৃণমূল কংগ্রেসের আবেদন খারিজ হওয়া শুধু একটি মামলার নিষ্পত্তি নয়, বরং তদন্তকারী সংস্থার স্বাধীনতা এবং আদালতের নিরপেক্ষতার প্রতিফলন।
যদিও রাজনৈতিক তরজা চলতেই থাকবে, তবু এই রায় মনে করিয়ে দেয় যে শেষ কথা বলার অধিকার আদালতেরই। আগামী দিনে এই সিদ্ধান্ত কীভাবে রাজ্য ও জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাব ফেলবে, সেদিকেই এখন নজর।






