কলকাতার বেহালা এলাকার একটি আবাসিক ফ্ল্যাটে দুঃসাহসিক চুরির ঘটনায় চাঞ্চল্য ছড়াল শহরজুড়ে। গভীর রাতে বা বাড়ির মালিকের অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে দুষ্কৃতীরা ফ্ল্যাটে ঢুকে প্রায় দেড় কোটি টাকার সোনা ও নগদ অর্থ নিয়ে চম্পট দেয় বলে অভিযোগ। এই ঘটনায় আবারও শহরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চুরির ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসে যখন ফ্ল্যাটের বাসিন্দারা দীর্ঘ সময় পর বাড়িতে ফিরে তালা ভাঙা অবস্থায় দেখতে পান। আলমারি ও লকার ভাঙা, ঘরের আসবাব এলোমেলো—সব মিলিয়ে স্পষ্ট যে পরিকল্পিতভাবেই এই চুরি চালানো হয়েছে।
এই ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই এলাকায় আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়। প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক সময়ে বেহালা ও আশপাশের এলাকায় ছোটখাটো চুরির ঘটনা বেড়েছে, তবে এত বড় অঙ্কের চুরি এই প্রথম। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে।
চুরির ঘটনার পরই বেহালা থানায় অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। পুলিশ সূত্রে জানা যাচ্ছে, বাড়িতে কোনও সিসিটিভি ক্যামেরা ছিল কি না, প্রবেশপথে জোর করে ঢোকার চিহ্ন রয়েছে কি না—সবদিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বেহালার ফ্ল্যাটে কীভাবে ঘটল দুঃসাহসিক চুরি?

প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ জানতে পেরেছে, ফ্ল্যাটের মালিক কয়েকদিনের জন্য শহরের বাইরে ছিলেন। সেই সুযোগেই দুষ্কৃতীরা পরিকল্পনা করে ফ্ল্যাটে হানা দেয়। দরজার লক ভেঙে ভিতরে প্রবেশ করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে অনুমান করা হচ্ছে।
ফ্ল্যাটের ভিতরে থাকা লকার ও আলমারি থেকে বিপুল পরিমাণ সোনার গয়না এবং নগদ অর্থ নিয়ে যাওয়া হয়েছে। পরিবারের দাবি অনুযায়ী, প্রায় ১.৫ কোটি টাকার সম্পত্তি খোয়া গেছে। এর মধ্যে পারিবারিক উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সোনার গয়নাও ছিল।
পুলিশ মনে করছে, এই চুরির পেছনে পেশাদার চোরচক্রের হাত থাকতে পারে। কারণ, কোনও শব্দ না করে এবং খুব অল্প সময়ের মধ্যেই পুরো কাজটি সেরে ফেলা হয়েছে। প্রতিবেশীদের কেউই সন্দেহজনক কিছু টের পাননি, যা তদন্তকে আরও জটিল করে তুলছে।
পুলিশি তদন্ত, সিসিটিভি ফুটেজ ও চোরচক্রের সন্দেহ

চুরির খবর পাওয়ার পরই বেহালা থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। ফরেনসিক দলকে ডেকে আনা হয়, যাতে আঙুলের ছাপ বা অন্য কোনও গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ সংগ্রহ করা যায়। আশপাশের বাড়ি ও রাস্তায় লাগানো সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, কয়েকটি ক্যামেরায় সন্দেহজনক গতিবিধি ধরা পড়েছে। সেই ফুটেজ বিশ্লেষণ করে চোরদের পরিচয় ও গতিপথ চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে। প্রয়োজনে শহরের অন্যান্য থানার সঙ্গে সমন্বয় করে তল্লাশি অভিযান চালানো হবে।
তদন্তকারীদের মতে, এটি একক কোনও চোরের কাজ নয়। সংগঠিত চোরচক্র দীর্ঘদিন ধরে রেইকি করে এই চুরি চালিয়েছে বলেই অনুমান। বাড়ির ভিতরের লকার কোথায় রয়েছে, কোন ঘরে কী রাখা—এই সব তথ্য তাদের আগে থেকেই জানা ছিল বলে মনে করা হচ্ছে।
শহরে বাড়তে থাকা চুরি ও বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ

বেহালার এই চুরির ঘটনা শহরের অন্যান্য আবাসিক এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যেও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, ফ্ল্যাট সংস্কৃতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নতি না হলে এই ধরনের অপরাধ আরও বাড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু তালা বা গেটের উপর নির্ভর করলে চলবে না। আধুনিক সিসিটিভি, প্রশিক্ষিত নিরাপত্তারক্ষী এবং প্রতিবেশীদের মধ্যে সমন্বয়—সবকিছু মিলেই নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি, দীর্ঘদিন বাড়ি ফাঁকা থাকলে থানায় আগাম জানানোও কার্যকর হতে পারে।
এই ঘটনার পর বেহালার একাধিক আবাসনে নিরাপত্তা বৈঠক ডাকার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাসিন্দারা চাইছেন, পুলিশি টহল বাড়ুক এবং সন্দেহজনক ব্যক্তিদের ওপর নজরদারি জোরদার করা হোক।
বেহালার ফ্ল্যাটে প্রায় ১.৫ কোটি টাকার সোনা ও নগদ চুরির ঘটনা শুধু একটি পরিবারের ক্ষতির গল্প নয়, বরং শহরের সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি বড় সতর্কবার্তা। পুলিশি তদন্ত এগোচ্ছে দ্রুত গতিতে, তবে এই ধরনের ঘটনা ভবিষ্যতে ঠেকাতে নাগরিক সচেতনতা ও আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিকল্প নেই। চোরদের দ্রুত গ্রেপ্তারই এখন এলাকাবাসীর একমাত্র প্রত্যাশা।






