মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের পরবর্তী নীতি ঘোষণা ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে আবারও বাড়ছে আশাবাদ। সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক সূচক থেকে ইঙ্গিত মিলেছে—মার্কিন মুদ্রাস্ফীতি ধীরে ধীরে স্বস্তির দিকে যাচ্ছে, যা সম্ভাব্য সুদের হার হ্রাসের পথকে আরও প্রশস্ত করছে। ঠিক এই প্রেক্ষাপটেই এশিয়ার শেয়ারবাজার সপ্তাহের শুরুতে ধীর গতিতে হলেও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখাতে শুরু করেছে।
বিনিয়োগকারীদের মনোভাবও সহনীয়ভাবে বদলাচ্ছে। দীর্ঘদিনের অস্থিরতা, ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং ডলার শক্তিশালী হওয়ার কারণে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের শেয়ারবাজার চাপে ছিল। কিন্তু মার্কিন আর্থিক নীতির সম্ভাব্য পরিবর্তন বাজারকে কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে। বিশেষ করে বন্ড ইয়িল্ড নিম্নমুখী হওয়ায় ইকুইটি মার্কেট ঝুঁকি নিতে আগ্রহী হয়ে উঠছে।
সপ্তাহের শুরুতে জাপান থেকে দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর থেকে হংকং—বিভিন্ন বাজারে সূচকের উপর চাপ থাকলেও ধীরে ধীরে ক্রেতার সংখ্যা বাড়ছে। মূলত মার্কিন সুদের হার কমলে ডলার দুর্বল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, যা এশীয় মুদ্রাকে শক্তিশালী করে এবং বিদেশি বিনিয়োগকে আকর্ষণীয় করে তোলে। সেই প্রত্যাশাই এখন বাজারকে নয়া গতিপথ দিচ্ছে।
এশীয় বাজারের এই নীরব কিন্তু নিশ্চিত উত্থান বিনিয়োগকারীদের মনে একটি প্রশ্নও জাগাচ্ছে—পরবর্তী ত্রৈমাসিকে কি আন্তর্জাতিক অর্থনীতি সত্যিই শক্ত ভিত্তিতে দাঁড়াতে পারবে? নাকি সুদের হার কমানোর প্রত্যাশায় তৈরি হওয়া এই গতি সাময়িক? এই প্রশ্নের উত্তর মিলবে সময়ের সঙ্গে, কিন্তু বর্তমান বাজার প্রবণতা ইতিবাচকতার দিকেই ইঙ্গিত করছে।
এশিয়ার সূচকে ধীরগতির পুনরুদ্ধার

মঙ্গলবার সকালে টোকিওর নিক্কেই সূচক সামান্য শক্ত অবস্থান তৈরি করে, যদিও ইয়েনের অনিশ্চয়তা বাজারে কিছুটা চাপ বজায় রেখেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার কসপি সূচকও সীমিত পরিসরে অগ্রগতির ইঙ্গিত দিয়েছে। তবে বিনিয়োগকারীরা এখনো সতর্ক, কারণ ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার কমানোর ঘোষণা এখনো নিশ্চিত নয়।
চীনের বাজার কিছুটা ব্যতিক্রম। অর্থনীতি পুনরুদ্ধার হলেও ক্রমাগত সম্পত্তি–বাজার সংকট এবং উৎপাদন খাতে মন্থরতা বিনিয়োগকারীদের চাপে রাখছে। তবুও শেনজেন ও সাংহাই সূচকে মৃদু গতিবৃদ্ধি দেখা গেছে, যা মূলত বৈদেশিক বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশার সঙ্গেই মিলিত।
ভারতের বাজার তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল। নিফটি ও সেনসেক্স উভয়ই সীমিত পরিসরে লেনদেন করলেও বৈশ্বিক প্রবাহের প্রভাবে এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতা স্পষ্ট। বিদেশি প্রবাহ বাড়লে ভারতীয় ইকুইটি আরও শক্তিশালী ভিত্তি পাবে—এটাই বিশেষজ্ঞদের মত।
মার্কিন সুদের হার কমানোর প্রত্যাশা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের আর্থিক নীতিই বিশ্ববাজারের প্রধান ন্যাভিগেশন সিস্টেম। সুদের হার বেশি থাকলে ডলার শক্তিশালী হয়, যা নতুন উদীয়মান অর্থনীতিতে অর্থ প্রবাহ কমিয়ে দেয়। বিপরীতে হার কমলে ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা বাড়ে এবং উদীয়মান বাজারগুলোতে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হয়।
গত মাসে পাওয়া মার্কিন মুদ্রাস্ফীতি–সংক্রান্ত তথ্য থেকে ধারণা মিলেছে—ফেড হয়তো দ্রুত নীতি সহজ করার দিকে যেতে পারে। বন্ড ইয়িল্ডের পতনও এই সম্ভাবনাকে শক্তিশালী করছে। এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে প্রযুক্তি, রপ্তানি–নির্ভর শিল্প এবং ভোক্তা–ব্যয়ের সঙ্গে যুক্ত কোম্পানিগুলোর ওপর।
উদীয়মান বাজার সবসময় সুদের হার পরিবর্তনের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। ডলার দুর্বল হলে এশিয়ার মুদ্রা আরও শক্তিশালী হয়, আমদানি খরচ কমে, এবং বৈদেশিক ঋণের চাপ হ্রাস পায়। ঠিক এই কারণেই মার্কিন নীতির সামান্য ইশারা এশিয়ার বাজারে তাত্ক্ষণিক প্রভাব ফেলে।
বিনিয়োগকারীদের পরবর্তী কৌশল: সতর্কতার সঙ্গে পজিটিভ মোড

বর্তমান পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীরা অযথা ঝুঁকি নিচ্ছেন না। বাজারে আগ্রহ বাড়লেও তা সীমাবদ্ধ পরিসরে। বিশেষত প্রযুক্তি, আর্থিক খাত, এবং রপ্তানি–নির্ভর সেক্টরগুলোতে নতুন বিনিয়োগের পরিকল্পনা সক্রিয়ভাবে তৈরি হচ্ছে।
এছাড়া ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এখনো বড় ঝুঁকি। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, চীন–যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য উত্তেজনা এবং দক্ষিণ চীন সাগরে টানাপোড়েন—সব মিলিয়ে বাজারকে প্রতিনিয়ত একটি অনিশ্চিত পরিবেশে রাখছে। ফলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উচ্চ-ঝুঁকির সেক্টরে বিনিয়োগে এখনো সতর্ক থাকা উচিত।
তবে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীদের জন্য এই সময়কে ‘স্ট্র্যাটেজিক এন্ট্রি পয়েন্ট’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সুদের হার কমলে প্রযুক্তি ছাড়াও টেকসই শক্তি, ভোক্তা পণ্য, এবং অবকাঠামো সংশ্লিষ্ট কোম্পানিতে বড় বিনিয়োগ আসতে পারে। ফলে এশিয়ার বাজার আসন্ন মাসগুলোতে আরও শক্ত অবস্থান নিতে পারে—এমন প্রত্যাশাই বর্তমানে স্পষ্ট।
মার্কিন সুদের হার কমানোর সম্ভাবনা বৈশ্বিক বাজারে এক নতুন গতি এনেছে, যার প্রতিফলন স্পষ্ট এশিয়ার শেয়ারবাজারে। যদিও এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে, কিন্তু বাজারের ভেতরে যে আত্মবিশ্বাস ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে তা ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক সংকেত দেয়। আগামী ত্রৈমাসিকে ফেডের নীতি শিথিল হলে এশিয়া–প্যাসিফিক অঞ্চলের বাজার আরও গতিশীল হয়ে উঠতে পারে। আর তাই বিনিয়োগকারীদের নজর এখন পুরোপুরি যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী নীতি–ঘোষণার দিকে।






