কলকাতার রাজপথ আবারও সাক্ষী রইল এক ব্যতিক্রমী প্রতিবাদের। রাজনীতি নয়, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়—এবার গণতন্ত্রের মৌলিক অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুললেন শহরের শিল্পীসমাজ। ‘SIR প্রক্রিয়া’ বা Special Intensive Revision ঘিরে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা ও আশঙ্কা শিল্পীদের নামিয়ে এনেছে রাস্তায়।
নাট্যব্যক্তিত্ব, চিত্রশিল্পী, সংগীতশিল্পী, কবি—বিভিন্ন ধারার সৃষ্টিশীল মানুষের উপস্থিতিতে এই প্রতিবাদ যেন এক নাগরিক মিছিলের রূপ নেয়। ব্যানার, পোস্টার, কবিতা আর গান মিলিয়ে শিল্পীরা স্পষ্ট করে দিলেন—ভোটাধিকার নিয়ে সামান্য সন্দেহও গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক।
শিল্পীদের বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে একটি প্রশ্ন—SIR প্রক্রিয়া কি সত্যিই স্বচ্ছ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক? নাকি এই প্রক্রিয়ার আড়ালে নাগরিক অধিকার খর্ব হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে? কলকাতার এই প্রতিবাদ শুধু একটি শহরের ঘটনা নয়, বরং বৃহত্তর গণতান্ত্রিক পরিসরে এক গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা।
SIR প্রক্রিয়া ঘিরে শিল্পীদের উদ্বেগ


SIR বা Special Intensive Revision মূলত ভোটার তালিকা সংশোধনের একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। তবে শিল্পীদের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ার বাস্তবায়নে স্বচ্ছতার অভাব থাকলে বহু প্রকৃত ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়তে পারে। বিশেষ করে প্রান্তিক মানুষ, পরিযায়ী শ্রমিক ও শহরের বস্তি এলাকার বাসিন্দাদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি।
প্রতিবাদে অংশ নেওয়া শিল্পীরা জানান, গণতন্ত্র শুধু নির্বাচন নয়—নাগরিকের অংশগ্রহণ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাও তার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া মানে কার্যত একজন নাগরিকের কণ্ঠরোধ করা। এই আশঙ্কাই তাঁদের প্রতিবাদের মূল সুর।
অনেক শিল্পীই বলেন, অতীতে বিভিন্ন রাজ্যে ভোটার তালিকা সংশোধনের সময় প্রশাসনিক ত্রুটির কারণে বহু মানুষের ভোটাধিকার খর্ব হয়েছে। কলকাতায় যেন সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি না হয়, সে জন্য আগাম সতর্কতাই এই আন্দোলনের উদ্দেশ্য।
রাজনীতি নয়, নাগরিক অধিকারই মূল ইস্যু

এই প্রতিবাদকে রাজনৈতিক রঙ দেওয়ার চেষ্টা নিয়ে শিল্পীরা স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছেন। তাঁদের দাবি, এটি কোনও দলীয় কর্মসূচি নয়, বরং নাগরিক অধিকারের প্রশ্ন। শিল্পীসমাজ মনে করে, গণতন্ত্রের ভিত্তি যদি দুর্বল হয়, তবে সংস্কৃতি ও শিল্পচর্চাও তার প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে পারে না।
প্রতিবাদ মঞ্চে পাঠ করা কবিতা, গাওয়া গান এবং নাট্যরূপে উপস্থাপিত ছোট ছোট দৃশ্যের মধ্য দিয়ে শিল্পীরা বোঝানোর চেষ্টা করেন—ভোটাধিকার হরণ মানে কেবল একটি নাম বাদ দেওয়া নয়, বরং একটি পরিচয় মুছে ফেলা। এই সৃজনশীল প্রতিবাদ সাধারণ মানুষের মধ্যেও আলোড়ন তোলে।
অনেক সাধারণ নাগরিকও এই মিছিলে যোগ দেন। তাঁদের মতে, শিল্পীদের এই অবস্থান গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করে। কারণ, যখন সৃজনশীল মানুষ প্রশ্ন তোলে, তখন সেই প্রশ্ন সমাজের গভীরে পৌঁছে যায়।
গণতন্ত্র রক্ষায় শিল্পীসমাজের ঐতিহ্য ও বর্তমান প্রেক্ষাপট

বাংলার ইতিহাসে শিল্পী ও বুদ্ধিজীবীদের প্রতিবাদ নতুন কিছু নয়। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে জরুরি অবস্থার সময়—প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে শিল্পীরা পথে নেমেছেন। বর্তমান SIR প্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ সেই ঐতিহ্যেরই ধারাবাহিকতা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যখন প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তখন নাগরিক সমাজের সক্রিয় ভূমিকা অত্যন্ত জরুরি। শিল্পীরা তাঁদের সৃজনশীল শক্তিকে ব্যবহার করে এই জটিল বিষয়কে সাধারণ মানুষের কাছে সহজ ভাষায় তুলে ধরছেন।
এই আন্দোলন হয়তো অবিলম্বে কোনও নীতিগত পরিবর্তন আনবে না, কিন্তু এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ জনআলোচনা তৈরি করেছে। গণতন্ত্রে প্রশ্ন তোলার অধিকারই যে সবচেয়ে বড় শক্তি—কলকাতার এই প্রতিবাদ তা আবারও মনে করিয়ে দিল।
কলকাতায় শিল্পীদের SIR বিরোধী প্রতিবাদ আসলে একটি বৃহত্তর গণতান্ত্রিক চেতনার প্রতিফলন। ভোটাধিকার, স্বচ্ছতা ও নাগরিক অংশগ্রহণ—এই তিনটি স্তম্ভকে রক্ষা করাই তাঁদের মূল লক্ষ্য। রাজপথে শিল্পীদের এই কণ্ঠস্বর প্রমাণ করে, গণতন্ত্র কেবল ব্যালট বাক্সে সীমাবদ্ধ নয়; এটি বেঁচে থাকে নাগরিকের সচেতন প্রশ্নে ও সক্রিয় অংশগ্রহণে।






