বলিউডের দুই বর্ষীয়ান অভিনেতা—নাসিরুদ্দিন শাহ এবং অনুপম খের। দু’জনই নিজের অভিনয়শৈলী, মতাদর্শ এবং শিল্পজগতের অবদানের জন্য দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনার কেন্দ্রে। তবুও তাঁদের সম্পর্ক বহু বছর ধরেই এক সূক্ষ্ম টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে গিয়েছিল। সেই উত্তেজনার এক বড় অধ্যায় তৈরি হয়েছিল পাঁচ বছর আগে, যখন শাহ অনুপম খেরকে নিয়ে এক বিতর্কিত মন্তব্য করেছিলেন।
সেই মন্তব্যের পর দুই অভিনেতার মধ্যে দূরত্ব আরও বেড়েছিল। বলিউডের অভ্যন্তরে অনেকেই তখন বলেছিলেন, ‘‘এ সম্পর্ক হয়তো আর কখনও স্বাভাবিক হবে না।’’
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সব আবেগই নরম হয়। সম্প্রতি নাসিরুদ্দিন শাহ নিজের একটি সাক্ষাৎকারে প্রকাশ্যে জানালেন—তিনি অনুপম খেরের বিষয়ে যেটুকু বলেছেন, সেটা তাঁর বলা উচিত হয়নি। বর্ষীয়ান অভিনেতার এই ক্ষমাপ্রার্থনা বলিউড মহলে নতুন আলোচনা শুরু করেছে।
এই ক্ষমা কেবল দুই শিল্পীর সম্পর্ক পুনর্গঠনের ইঙ্গিতই নয়, বরং বর্তমান সামাজিক পরিবেশে ‘বয়স ও অভিজ্ঞতার শিক্ষা’ও মনে করিয়ে দিচ্ছে। অনুপম খেরও অত্যন্ত সংযত প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছেন—“মানুষের মত বদলাতে পারে, আমি তার সম্মান করি।”
পাঁচ বছর আগে ঠিক কী বলেছিলেন নাসিরুদ্দিন শাহ?

২০১৯ সালে এক সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নাসিরুদ্দিন শাহ বলেছিলেন—বলিউডে কিছু মানুষ অযথাই ‘বক্তব্যবাজি’ করেন এবং জনমতের সামনে নিজেকে অত্যন্ত বড় করে তুলে ধরতে চান। সেই প্রসঙ্গেই তিনি অনুপম খেরকে উদ্দেশ করে তীব্র আক্রমণ করেন। শাহ বলেছিলেন, “খের মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য বাড়তি নাটক করেন।”
এই মন্তব্যের পর বলিউডে রীতিমতো ঝড় ওঠে। অনেকেই মনে করেছিলেন, শাহ হয়তো অনুপম খেরের রাজনৈতিক অবস্থানকেই টার্গেট করে কথা বলেছেন। তবে শাহ সে সময় কোনও ব্যাখ্যা দেননি। অনুপম খেরও পাল্টা জবাব দিয়েছিলেন—“ওঁর কথায় ভাবার কিছু নেই, ওঁর নিজের জীবনে অনেক অশান্তি আছে বলে মনে হয়।”
একটি শিল্পসমাজে দুই প্রবীণ অভিনেতার এই প্রকাশ্য বিরোধ বহুদিন ধরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। সোশ্যাল মিডিয়াতেও ব্যাপক তর্ক-বিতর্ক চলেছিল, যা দুই অভিনেতার ভাবমূর্তিকে কম-বেশি আক্রান্ত করে।
হঠাৎ ক্ষমা চাওয়ার কারণ কী?

সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে নাসিরুদ্দিন শাহের কণ্ঠে স্পষ্ট অনুতাপ শোনা যায়। তিনি বলেন—
“আমি যা বলেছিলাম, সেটা বলা উচিত ছিল না। প্রত্যেকের নিজের মত প্রকাশের স্বাধীনতা আছে, এবং অনুপম খের তার মতো করেই জীবন দেখে। আমি যদি তাকে আঘাত করে থাকি, তবে দুঃখিত।”
শাহ আরও বলেন, পাঁচ বছর আগে যে সামাজিক-রাজনৈতিক পরিবেশ ছিল, তা তাঁকে আবেগপ্রবণ করেছিল। বয়স এবং অভিজ্ঞতা তাঁকে এখন বিষয়টা ভিন্নভাবে ভাবতে শিখিয়েছে। তাঁর এই ক্ষমাপ্রার্থনা কেবল বিতর্ক শেষ করার এক প্রচেষ্টাই নয়, বরং দুই অভিনেতার দীর্ঘ কর্মজীবনের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের প্রচেষ্টা।
বলিউডের অনেকেই শাহের এই মনোভাবকে পরিণত ও ইতিবাচক হিসাবে দেখছেন। বয়স বাড়লেও অহম ও অভিমান কখনও কমে না—এই ধারণা ভেঙে নাসিরুদ্দিন শাহ দেখালেন, ভুল স্বীকার করাও এক ধরনের শক্তি।
অনুপম খের কী প্রতিক্রিয়া দিলেন? সম্পর্ক কি স্বাভাবিক হবে?

নাসিরুদ্দিন শাহের ক্ষমা চাওয়ার পর অনুপম খের অত্যন্ত শান্ত ও সংযত প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। অভিনেতা বলেন—
“আমরা দু’জনেই বহু দশক ধরে সিনেমা করছি। মতবিরোধ হওয়া অস্বাভাবিক নয়। ওঁর বক্তব্যের জন্য আমি খুশি, এবং আমিও সম্পর্কের স্বাভাবিকতা চাই।”
খেরের এই প্রতিক্রিয়া বলিউডে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে তাঁর ভক্তরা লিখেছেন—“দু’জনই ভারতীয় সিনেমার সম্পদ। তাঁদের সম্পর্ক মেরামত হোক।”
তবে বাস্তবিক অর্থে সম্পর্ক সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হবে কি না, তা সময়ই বলবে। শিল্পীজগতের সম্পর্ক ব্যক্তিগত মতাদর্শ, রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং পেশাদার প্রতিযোগিতার মতো বহু স্তরেই গঠিত হয়। তবুও শাহের এই ক্ষমাপ্রার্থনা সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রথম বড় ধাপ বলেই মনে করছেন অনেকে।
বলিউডের ইতিহাসে দুই প্রবীণ অভিনেতা—নাসিরুদ্দিন শাহ এবং অনুপম খেরের দ্বন্দ্ব ও পুনর্মিলন এক বড় অধ্যায় হয়ে থাকবে। পাঁচ বছর আগের তিক্ততা ভুলে শাহের ক্ষমা চাওয়া কেবল ব্যক্তিগত সম্পর্কেরই নতুন দিক খুলে দিল না, শিল্পসমাজকে দেখিয়ে দিল—বয়স, অভিজ্ঞতা এবং পরিণতি মানুষকে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়।
এই ঘটনার মধ্য দিয়ে একটি বার্তা স্পষ্ট—বিতর্ক থাকলেও সম্মান বজায় রাখা উচিত, এবং সময় এলে ভুল স্বীকার করাও পরিণত চরিত্রের পরিচয়। বলিউডের দুই কিংবদন্তি অভিনেতার এই নতুন অধ্যায় তাই অনেকের মনেই আশা জাগাচ্ছে—সম্ভবত একদিন আবার তাঁদের একসঙ্গে পর্দা ভাগ করে নিতে দেখা যাবে।






