ইথিওপিয়ার সক্রিয় আগ্নেয়গিরি এর্টা আল-এ আকস্মিক অগ্ন্যুৎপাতের জেরে আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্য হয়ে চলা একাধিক আন্তর্জাতিক রুটে বড়সড় ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়েছে। বিস্ফোরণের ফলে আকাশে ছড়িয়ে পড়া ঘন আগ্নেয়ছাই পূর্ব আফ্রিকার একাধিক আকাশপথে বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করেছে। এর প্রভাব এসে পড়েছে ভারতীয় বিমান পরিষেবা—এয়ার ইন্ডিয়া ও আকাসা এয়ার সহ কয়েকটি আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনে।
আগ্নেয়ছাই আকাশে ছড়িয়ে পড়লে ইঞ্জিন ব্লক হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়; দৃশ্যমানতা নেমে আসে নাটকীয়ভাবে। ফলে আফ্রিকার গুরুত্বপূর্ণ রুট, বিশেষ করে অ্যাডিস আবাবা-সংলগ্ন আকাশপথে বিমান চলাচল সাময়িকভাবে সীমিত করা হয়েছে। ভারত থেকে পূর্ব আফ্রিকা ও যুক্তরাজ্যের কিছু গন্তব্যে চলা উড়ানও প্রভাবিত হয়েছে।
এয়ার ইন্ডিয়া জানিয়েছে, যাত্রীদের নিরাপত্তাকে মাথায় রেখে কয়েকটি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। একই সিদ্ধান্ত নিয়েছে আকাসা এয়ারও, যারা সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক রুট বাড়ানোর পরিকল্পনায় ছিল। আগ্নেয়ছাইয়ের ঘন স্তর আকাশপথে দীর্ঘসময় স্থায়ী হলে আগামী কয়েকদিন আরও রুট প্রভাবিত হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
এদিকে, আফ্রিকার স্থানীয় প্রশাসন ও ভূতাত্ত্বিক সংস্থাগুলি সতর্কতা জারি করেছে। ভূ-কম্পন এবং নতুন লাভা নির্গমনের সম্ভাবনাও থাকায় আগ্নেয়গিরির আশেপাশের এলাকায় অবরোধ জারি রয়েছে। আন্তর্জাতিক এভিয়েশন সেক্টরও পরিস্থিতিকে ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
এভিয়েশন সেক্টরে বড়সড় বিঘ্ন

আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ফলে ইথিওপিয়ার আকাশপথে দেখা দিয়েছে ব্যাপক আগ্নেয়ছাইয়ের মেঘ, যা বিমান চলাচলের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধক। আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (ICAO) জানিয়েছে, ছাইয়ের ঘনত্ব ইঞ্জিনে প্রবেশ করলে টারবাইন অকেজো হয়ে যেতে পারে—যা মাঝআকাশে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটাতে পারে।
ফলে ভারত-ইউরোপ-পূর্ব আফ্রিকা রুটে চলা ফ্লাইটগুলিকে বিকল্প পথ নিতে হচ্ছে, যার ফলে সময় বেড়ে যাচ্ছে ১–৪ ঘণ্টা পর্যন্ত। কিছু ক্ষেত্রে এই ডিটুর এতটাই দীর্ঘ যে এয়ারলাইনগুলি উড়ান বাতিল করাকেই নিরাপদ ও ব্যবহারিক সিদ্ধান্ত হিসেবে বেছে নিচ্ছে।
এয়ার ইন্ডিয়ার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যাত্রীরা যাতে অসুবিধায় না পড়েন, তার জন্য টিকিট রিবুকিং ও রিফান্ড সুবিধা সরলীকৃত করা হয়েছে। অ্যাডিস আবাবা হয়ে লন্ডন, নাইরোবি, দুবাই রুটেও দেরি ও পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে।
এয়ার ইন্ডিয়া ও আকাসা এয়ারের সিদ্ধান্ত: যাত্রীদের নিরাপত্তা সর্বাগ্রে

ভারতীয় বাণিজ্যিক বিমান পরিষেবাগুলির মধ্যে প্রথমে প্রতিক্রিয়া জানায় এয়ার ইন্ডিয়া। তাদের বিবৃতি অনুযায়ী, “পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত যাত্রীদের জীবন নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই প্রধান অগ্রাধিকার।” প্রতিষ্ঠানটি অ্যাডিস আবাবা, জোহানেসবার্গ, নাইরোবি হয়ে চলা ট্রানজিট ফ্লাইটগুলির ওপর নজরদারি আরও বাড়িয়েছে।
আকাসা এয়ার সম্প্রতি আন্তর্জাতিক রুটে নিজেদের উপস্থিতি বাড়ানোর ঘোষণা করেছিল। কিন্তু এই প্রাকৃতিক বিপর্যয় তাদের সূচিতে আপাতত ছেদ ফেলেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে—আগামী ২৪–৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পরিস্থিতি পুনর্বিবেচনা করে রুট চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
যাত্রীদের বড় অংশ সোশ্যাল মিডিয়ায় সময়মতো আপডেট না পাওয়ার অভিযোগ তুললেও এয়ারলাইন দু’টি আশ্বাস দিয়েছে যে SMS ও ইমেলের মাধ্যমে নিয়মিত নোটিফিকেশন পাঠানো হচ্ছে। যাঁরা বিদেশে আটকে পড়েছেন, তাঁদের বিকল্প ট্রানজিট রুট দেওয়া হচ্ছে, যদিও অনেক ক্ষেত্রেই তা সময়সাপেক্ষ।
আফ্রিকায় অগ্ন্যুৎপাত: বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকি


এর্টা আল পৃথিবীর অন্যতম সক্রিয় ‘শিল্ড ভলক্যানো’। পূর্ব আফ্রিকার রিফট ভ্যালিতে অবস্থিত হওয়ায় ভূ-প্লেটগুলির সরে যাওয়ার সাথে সাথে এখানে মাঝেমধ্যেই অগ্ন্যুৎপাত ঘটে। সাম্প্রতিক বিস্ফোরণের পরে আগ্নেয়ছাই বায়ুর ওপরের স্তরে ছড়িয়ে পড়ায় এটি ট্রপোস্ফিয়ার-স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার পর্যন্ত প্রবেশ করেছে বলে ধারণা বিজ্ঞানীদের।
এই ছাই স্তর বাতাসের গতিপথে ভেসে এক দেশ থেকে আরেক দেশে পৌঁছে যেতে পারে, ফলে ইথিওপিয়া ছাড়াও সুদানের দক্ষিণাংশ, কেনিয়া, সোমালিয়া এবং এমনকি আরব উপসাগর পর্যন্ত এর প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আন্তর্জাতিক আবহাওয়া সংস্থা সতর্ক করেছে—পরবর্তী কয়েকদিন পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে, কারণ বিস্ফোরণ এখনও থেমে যায়নি।
এই ধরনের আগ্নেয়উৎপাত কেবল বিমান চলাচল নয়, আবহাওয়ার স্বচ্ছতাও কমিয়ে ফেলে। কখনও কখনও সূর্যালোকের পরিমাণ কমে গিয়ে সাময়িক ঠান্ডা আবহাওয়াও তৈরি হয়, যা ওই অঞ্চলের কৃষি উৎপাদনেও প্রভাব ফেলতে পারে। তবে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রি, যার ওপর আন্তর্জাতিক যাতায়াত ও বাণিজ্য বহুলাংশে নির্ভরশীল।
ইথিওপিয়ার এর্টা আল আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত আঞ্চলিক সীমানার অনেক বাইরে গিয়ে বিশ্বব্যাপী বিমান চলাচলে প্রভাব ফেলেছে। ভারতীয় এয়ারলাইনগুলো দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে যাত্রী নিরাপত্তার দিকে গুরুত্ব দিয়েছে—যা এই পরিস্থিতিতে যথাযথ। তবে বিস্ফোরণ অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েকদিন দেরি, বাতিল এবং রুট পরিবর্তন আরও বাড়তে পারে।
যাত্রীদের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি—ফ্লাইট স্ট্যাটাস নিয়মিত চেক করা, অফিসিয়াল অ্যাপ/ওয়েবসাইট অনুসরণ করা, এবং প্রয়োজনে যাত্রার তারিখ পরিবর্তনের প্রস্তুতি রাখা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে আন্তর্জাতিক রুট দ্রুত স্বাভাবিক হবে বলে আশা করা যায়।






