বলিউডে সম্পর্ক, সম্মান আর পরস্পরের প্রতি নির্ভরতার বন্ধন বহু পুরনো। সেই ঐতিহ্য আবারও সামনে এলো যখন আমির খান আবেগঘন কণ্ঠে স্মরণ করলেন সদ্যপ্রয়াত বাবা ধর্মেন্দ্রকে। তাঁর কথায় স্পষ্ট—ধর্মেন্দ্র শুধু একটি যুগের আইকন নন, বরং পরবর্তী প্রজন্মের পথপ্রদর্শকও বটে।
সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে ‘লাহোর ১৯৪৭’-এর বিশেষ প্রিভিউ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আমির খান জানালেন, সিনেমাটি প্রথম দেখার সৌভাগ্য করেছিলেন স্বয়ং ধর্মেন্দ্র। এই বিশেষ তথ্য প্রকাশ করার সময় আমিরের কণ্ঠ ভারী হয়ে ওঠে। প্রয়াত অভিনেতার প্রতি তাঁর সম্মানবোধ আরও একবার প্রকাশ্যে আসে।
আমির বলেন, “ধর্ম পাজি সবসময়ই নিঃস্বার্থভাবে পরামর্শ দিতেন। ‘লাহোর ১৯৪৭’ দেখার পর তাঁর চোখে যে উচ্ছ্বাস দেখেছিলাম, আজও তা ভুলতে পারি না।” তিনি আরও জানান, ধর্মেন্দ্র সিনেমাটি দেখে তাঁকে যেমন ভালবাসা দিয়েছেন, তেমনই নির্মাণ নিয়ে কিছু মূল্যবান মতামতও দিয়েছিলেন।
বলিউডের এক প্রজন্ম যে ধর্মেন্দ্রকে শুধু তারকা নয়, পরিবারের মতো দেখত—তার প্রাণবন্ত প্রতিফলন মিলল আমিরের বক্তব্যে। ধীরে ধীরে প্রকাশ পেল, দুই প্রজন্মের দুই আইকনের এই সম্পর্ক কেবল পেশাদার ছিল না, বরং তা ছিল গভীর স্নেহ ও বিশ্বাসে বাঁধা।
ধর্মেন্দ্র দেখেছিলেন ‘লাহোর ১৯৪৭’-এর প্রথম ঝলক

ধর্মেন্দ্রের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্কের কথা তুলে ধরে আমির জানান, তিনি যখনই কোনও নতুন প্রজেক্টের কাজ শুরু করতেন, চেষ্টা করতেন ধর্মেন্দ্রকে দেখানোর বা বলার। কারণ, পাঞ্জাবি চলচ্চিত্র ও গল্প বলার ধরন সম্পর্কে ধর্মেন্দ্রর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অসাধারণ।
‘লাহোর ১৯৪৭’—হিন্দি সিনেমার একটি উচ্চাভিলাষী প্রজেক্ট। দেশভাগের আবহ, মানবিক সম্পর্ক আর তীব্র আবেগের সমন্বয়ে তৈরি এই ছবির প্রাথমিক কাট দেখেই ধর্মেন্দ্র নাকি অত্যন্ত খুশি হয়েছিলেন। তাঁর মতে, সিনেমাটি ভারত-পাকিস্তানের ভাগ-বেদনার গল্পকে নতুনভাবে তুলে ধরবে।
আমির জানান, ধর্মেন্দ্র ছবিটি দেখে তাঁর অভিনয়, গতি, সিকোয়েন্সিং—সবকিছু নিয়ে খোলামেলা পরামর্শ দেন। এই মন্তব্যগুলি শুধু আমিরের কাছে মূল্যবান ছিল না—বরং ‘লাহোর ১৯৪৭’-এর চূড়ান্ত কাটেও সেগুলি প্রভাব ফেলেছে।
এক কথায়, ধর্মেন্দ্র ছিলেন এক ধরনের পর্দার আড়ালের গুরু। তাঁর প্রশংসা যেমন সকলকে উৎসাহিত করত, তেমন তাঁর সমালোচনা ছিল যথেষ্ট সৎ ও প্রাসঙ্গিক।
প্রয়াণের পরও জীবন্ত স্মৃতি — বলিউডের সম্পর্কের নতুন দৃষ্টান্ত

ধর্মেন্দ্রর প্রয়াণে গোটা বলিউড শোকাভিভূত। কিন্তু শুধুই কি শোক? না—এটি বড়দের প্রতি শ্রদ্ধা ও তাঁদের অবদানের পুনঃস্বীকৃতি দেওয়ার মুহূর্তও।
আমির খানের কথায় স্পষ্ট যে, ধর্মেন্দ্র শুধু এক প্রজন্মের নায়ক নন, তিনি ছিলেন মানবিকতার প্রতীক। বিনয়ী স্বভাব, আন্তরিকতা আর কর্মনিষ্ঠা তাঁকে বাকিদের থেকে আলাদা করে তুলেছিল। তাঁর মতো প্রজ্ঞাবান সিনিয়রদের কাছ থেকে শেখার সুযোগ পাওয়াটাই ছিল পরবর্তী প্রজন্মের সবচেয়ে বড় পুরস্কার।
ধর্মেন্দ্রর সঙ্গে আমিরের সম্পর্কের মাধুর্য বলিউডে বিরল নয়—বরং পুরনো দিনের তারকাদের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের এই সেতুবন্ধনই শিল্পকে প্রাণবন্ত রাখে। ধর্মেন্দ্র যে আজও মানসপটে জীবন্ত, তার কারণ তাঁর অবদান নয়, তাঁর অমলিন ব্যক্তিত্ব।
আমির বলেন, “ধর্ম পাজি আমাকে যেমন স্নেহ করেছেন, হয়তো নিজের ছেলেদেরও কখনও তেমন ভাবে বলেননি। তাঁর প্রতিটি পরামর্শ আমার কাছে আশীর্বাদ।”
এই উক্তিই প্রমাণ করে, বলিউডের সম্পর্ক কেবল পর্দার অভিনয় নয়, বরং অফ-স্ক্রিন এক অপ্রকাশিত পরিবার।
‘লাহোর ১৯৪৭’ ঘিরে বাড়ছে প্রত্যাশা — আমিরের আবেগে নতুন মাত্রা

ধর্মেন্দ্রর প্রশংসা ও পরামর্শের প্রসঙ্গ প্রকাশ্যে আসতেই ‘লাহোর ১৯৪৭’ ঘিরে দর্শকদের আগ্রহ আরও বেড়ে গেছে। ছবির নির্মাতা রাজকুমার সান্তোশী এবং মুখ্য ভূমিকায় সানি দেওল—এই দুটি নামেই প্রত্যাশার মানদণ্ড বেশ উঁচু।
দেশভাগের ব্যথা, সীমান্ত পারাপারের মানবিক সংকট, এবং দুই সম্প্রদায়ের আবেগ—সবই সিনেমাটিতে ফুটে উঠবে বলে মনে করা হচ্ছে। আমির খানের ‘প্রোডাকশন ইনপুট’ এবং ধর্মেন্দ্রর প্রাথমিক মতামত যে ছবিটিকে আরও শক্তিশালী করে তুলেছে, তা বলাই যায়।
ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে বড়দের আশীর্বাদকে অনেকে গোপন রাখেন, আবার অনেকে তা প্রচারে ব্যবহার করেন। আমির খান সেই দুই ধারার বাইরে। তিনি আন্তরিকভাবে জানালেন, কিংবদন্তির আশীর্বাদ ছাড়া তাঁর প্রজেক্ট কখনই পূর্ণ হতো না।
এই অকপট বক্তব্য শুধু ছবির প্রচার নয়—বরং বলিউডে সম্মান, মানবিকতা আর ‘গুরু-শিষ্য’ সংস্কৃতির পুনরুজ্জীবনও ঘটায়। ধর্মেন্দ্রর প্রতি এই আবেগী স্বীকৃতি ‘লাহোর ১৯৪৭’-কে শুধু একটি সিনেমা নয়, এক যুগের সংযোগ ঘটানোর মতো সাংস্কৃতিক ঘটনার মর্যাদা দিয়েছে।
ধর্মেন্দ্রর স্মৃতি, তাঁর দেওয়া পরামর্শ এবং তাঁর আন্তরিক ভালোবাসা—সবকিছু মিলিয়ে আমির খানের বক্তব্য এক কথায় হৃদয়স্পর্শী। ‘লাহোর ১৯৪৭’ দেখার প্রথম সুযোগ পেয়ে ধর্মেন্দ্র যে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছিলেন, তা আজ ছবির সঙ্গে মানসিকভাবে জড়িয়ে গেছে।
শিল্প জগতের সম্পর্কের সত্যিকারের রূপ সামনে আনে এই ঘটনা। সিনিয়রদের প্রতি শ্রদ্ধা, তাঁদের অবদান স্মরণ করা—এগুলোই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখে। আমির খান সেই দায়িত্ব পালন করলেন পরিপূর্ণভাবে।
বলিউডের অভ্যন্তরীণ আবেগের এই গল্প একদিকে যেমন দর্শককে স্পর্শ করে, অন্যদিকে নতুন প্রজন্মকে শেখায়—মানুষ বড় হয় কাজের মাধ্যমে, কিংবদন্তি হয় আচরণের মাধ্যমে।






