ভারতের ব্যঙ্গ–ব্যঞ্জনার ইতিহাসে আর কে লক্ষ্মণ একটি অনন্য নাম। তাঁর ‘কমন ম্যান’ চরিত্রের চোখ দিয়ে আমরা বারবার সমাজের দৈনন্দিন অসংগতি, রাজনৈতিক বিদ্রূপ এবং মানবিক সংকটকে দেখেছি এক ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে। ঠিক সেই পথেই, বলিউড তারকা আমির খান—যিনি ২৩ নভেম্বর ২০২৫–এ পুনেতে প্রথমবারের মতো আর কে লক্ষ্মণ পুরস্কার অর্জন করতে চলেছেন—প্রতিবার তাঁর সিনেমার মাধ্যমে সমাজকে নতুন প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছেন।
হাস্যরস, বিদ্রূপ, আবেগ ও বাস্তবতার সমন্বয়ে আমিরের চলচ্চিত্রগুলো বারবার প্রমাণ করেছে যে বিনোদনের আড়ালে লুকানো আছে এক তীক্ষ্ণ সামাজিক বার্তা। নিচে এমন পাঁচটি চলচ্চিত্রের কথা তুলে ধরা হলো, যেখানে আর কে লক্ষ্মণের ব্যঙ্গ–চেতনা স্পষ্টভাবে প্রতিধ্বনিত হয়েছে।
১. 3 Idiots – শিক্ষা ব্যবস্থার ‘ফ্যাক্টরি মডেল’কে প্রশ্নবিদ্ধ
ভারতের শিক্ষাব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই মুখস্থবিদ্যা, নম্বরের দৌড় এবং মানসিক চাপের কারণে সমালোচিত। 3 Idiots সেই সমস্যাগুলোকেই ব্যঙ্গাত্মকভাবে তুলে ধরেছে। র্যাঞ্চোর বিদ্রোহী মনোভাব এবং সৃজনশীলতার প্রতি তার আকর্ষণ আমাদের মনে করিয়ে দেয় লক্ষ্মণের ‘কমন ম্যান’-এর নীরব প্রতিবাদকে।
এই চলচ্চিত্রটি মূলত প্রশ্ন তোলে—
- আমরা কি সত্যিই শিখছি?
- নাকি শুধু পরীক্ষার জন্য পড়ছি?
সিনেমাটি দেখায় কীভাবে সমাজ সৃজনশীলতা নয়, বরং যান্ত্রিক সাফল্যকেই বেশি গুরুত্ব দেয়। ঠিক আর কে লক্ষ্মণের কার্টুনের মতো, এখানে ব্যঙ্গ কখনো মজার, কখনো কষ্টদায়ক, কিন্তু সবসময়ই বাস্তব।
২. Taare Zameen Par – ভুল বোঝা প্রতিভার আর্তনাদ
আমির খানের প্রথম পরিচালিত চলচ্চিত্র Taare Zameen Par শুধুই একটি সিনেমা নয়, বরং এক সামাজিক আন্দোলন। ডিসলেক্সিয়ায় আক্রান্ত ইশানের গল্প আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখায় কীভাবে সমাজ প্রতিটি শিশুকে একই মানদণ্ডে বিচার করে।
এখানে ব্যঙ্গ খুব সূক্ষ্ম, কিন্তু হৃদয়ে সরাসরি আঘাত করে—
স্কুল, পরিবার, সমাজ—সবাই যেন সৃজনশীল শিশুকে ‘অযোগ্য’ ঠাহর করতে ব্যস্ত।
লক্ষ্মণের কার্টুনে যেমন সাধারণ মানুষের নিঃশব্দ কষ্ট ফুটে ওঠে, ইশানের চরিত্রও সেই নিঃশব্দ আর্তনাদের প্রতিনিধি।
৩. Lagaan – সাধারণ মানুষের অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই
Lagaan একটি ঐতিহাসিক নাটক হলেও এর ভিতরকার বার্তা নিখাদ ব্যঙ্গ ও প্রতিবাদের। গ্রামের সাধারণ মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ব্রিটিশ শাসকদের চ্যালেঞ্জ জানায়—একটি ক্রিকেট ম্যাচে।
লক্ষ্মণের ‘কমন ম্যান’ যেমন ক্ষমতাবানদের হাস্যরসাত্মকভাবে কটাক্ষ করতেন, Lagaan–এও দেখা যায় সেই একই প্রতিচ্ছবি:
- ক্ষমতা বনাম সাধারণ মানুষ
- ভয় বনাম সাহস
- দমন বনাম আত্মবিশ্বাস
এটি একদিকে বিনোদনমূলক, অন্যদিকে গভীর রাজনৈতিক প্রতীকি।
৪. Rang De Basanti – উদাসীনতার ঘুম ভাঙানোর বিদ্রোহ
Rang De Basanti যেন লক্ষ্মণের রাজনৈতিক কার্টুনগুলোর চলচ্চিত্র রূপ। শুরুতে মজা, দুষ্টুমি, বন্ধুত্ব—সব মিলিয়ে গড়ে ওঠা গল্প হঠাৎই রাজনৈতিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদে রূপ নেয়।
এই সিনেমাটি দেখায়—
যুবসমাজ সবসময় উদাসীন নয়; পরিস্থিতি চরম হলে তারা পরিবর্তনের আগ্রহ দেখাতে পারে।
ব্যঙ্গ, বিদ্রূপ, যৌক্তিক প্রশ্ন—সব মিলিয়ে এটি সামাজিক জাগরণের এক শক্তিশালী প্রতিচ্ছবি।
৫. Peepli Live – কৃষক আত্মহত্যা, মিডিয়ার ভণ্ডামি ও রাজনৈতিক দ্বিচারিতা
আমির প্রযোজিত Peepli Live হলো ভারতীয় ব্যঙ্গ চলচ্চিত্রের এক অসাধারণ উদাহরণ।
এতে দেখানো হয়েছে—
- কৃষকের দুঃসহ জীবন
- মিডিয়ার ‘টিআরপি’ খিদে
- রাজনৈতিক নেতাদের দায়সারা মন্তব্য
চরিত্রগুলো যেন আর কে লক্ষ্মণের কার্টুন থেকে উঠে এসেছে—
হতবিহ্বল, নিরুপায়, তবু জীবনের কঠিন সত্যের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা।
আমির খানের সিনেমা শুধু বিনোদন নয়—এগুলো সমাজের অন্ধকার দিকগুলোকে তুলে ধরে, আমাদের ভাবতে বাধ্য করে। আর কে লক্ষ্মণের ব্যঙ্গাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি যেমন যুগের পর যুগ প্রাসঙ্গিক, আমিরের চলচ্চিত্রও তেমনই সময়ের সীমানা পেরিয়ে যায়।
তাই আমির খানের হাতে আর কে লক্ষ্মণ পুরস্কার তুলে দেওয়া নিঃসন্দেহে এক যথার্থ সম্মান—দুই ভিন্ন শিল্পমাধ্যমের দুই চিন্তাশীল মানবিক কণ্ঠের মিলন।






