কলকাতার মুকুটে আরও এক নতুন পালক! শহরের গর্ব Garden Reach Shipbuilders & Engineers (GRSE)-এর তৈরি অত্যাধুনিক যুদ্ধজাহাজ ‘Amini’ এবার ভারতীয় নৌসেনার হাতে। দেশের সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে তৈরি এই যুদ্ধজাহাজটি বিশেষভাবে সক্ষম সমুদ্রের অগভীর জলে শত্রুপক্ষের সাবমেরিন শনাক্ত করতে।
বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬, তামিলনাড়ুর কাট্টুপল্লিতে ভারতীয় নৌসেনার হাতে হস্তান্তর করা হয় ‘Amini’। এটি GRSE-র তৈরি অ্যান্টি-সাবমেরিন ওয়ারফেয়ার শ্যালো ওয়াটার ক্রাফট (ASW-SWC) সিরিজের পঞ্চম যুদ্ধজাহাজ। মোট আটটি এমন যুদ্ধজাহাজ তৈরির দায়িত্ব পেয়েছে কলকাতার এই প্রতিরক্ষা সংস্থা। PTIFeed+2
এই হস্তান্তরের মাধ্যমে GRSE-র তৈরি যুদ্ধজাহাজের সংখ্যা পৌঁছল ১১৯-এ। পাশাপাশি, ভারতীয় নৌসেনার হাতে সরাসরি তুলে দেওয়া GRSE-র যুদ্ধজাহাজের সংখ্যা দাঁড়াল ৮১। দেশীয় প্রযুক্তিতে যুদ্ধজাহাজ নির্মাণের ক্ষেত্রে এটি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত সেন্সর এবং অ্যান্টি-সাবমেরিন অস্ত্রে সজ্জিত ‘Amini’ ভারতের উপকূলীয় জলসীমায় নজরদারি ও সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করে তুলতে সাহায্য করবে।
১. কী বিশেষত্ব রয়েছে GRSE-র তৈরি যুদ্ধজাহাজ ‘Amini’-র?

‘Amini’ সাধারণ কোনও যুদ্ধজাহাজ নয়। বিশেষভাবে তৈরি এই রণতরীর প্রধান দায়িত্ব হল সমুদ্রের তলদেশে লুকিয়ে থাকা শত্রুপক্ষের সাবমেরিনের গতিবিধি শনাক্ত করা, সেগুলিকে অনুসরণ করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া।
প্রায় ৭৭.৬ মিটার দীর্ঘ এই যুদ্ধজাহাজের ড্রাফট বা জলের নিচে নিমজ্জিত অংশের গভীরতা প্রায় ২.৭ মিটার। ফলে সমুদ্রের অগভীর উপকূলীয় অঞ্চল এবং অপেক্ষাকৃত সীমিত জলপথেও এটি সহজে চলাচল করতে পারে।
জাহাজটিতে রয়েছে অত্যাধুনিক Combat Management System, Lightweight Torpedoes এবং Anti-Submarine Warfare Rockets। এই প্রযুক্তিগুলির সাহায্যে জলের নিচে থাকা সম্ভাব্য শত্রু সাবমেরিন শনাক্ত করা, তার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা এবং প্রয়োজন হলে আক্রমণ চালানো সম্ভব।
এছাড়াও রয়েছে GRSE-র তৈরি দেশীয় ৩০ মিমি নৌ-সারফেস গান। ফলে শুধু জলের নিচের বিপদ নয়, সমুদ্রপৃষ্ঠে থাকা সম্ভাব্য শত্রু লক্ষ্যবস্তুর মোকাবিলাতেও সক্ষম এই যুদ্ধজাহাজ।
২. অগভীর সমুদ্রে সাবমেরিন শিকারে কতটা কার্যকর ‘Amini’?

‘Amini’-র অন্যতম বড় শক্তি হল এর বিশেষ অ্যান্টি-সাবমেরিন প্রযুক্তি। সমুদ্রের গভীরতা ও পরিস্থিতি অনুযায়ী শত্রু সাবমেরিনের অবস্থান নির্ণয় করা সামুদ্রিক প্রতিরক্ষার অন্যতম কঠিন কাজ। এই কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে যুদ্ধজাহাজটির উন্নত SONAR ব্যবস্থা।
GRSE-র ASW-SWC প্রকল্পে Low Frequency Variable Depth Sonar এবং Hull Mounted Sonar-এর মতো প্রযুক্তি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর মাধ্যমে জলের নিচে থাকা সম্ভাব্য বিপদের অবস্থান সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব।
এই যুদ্ধজাহাজের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল এর জলজেট-ভিত্তিক Propulsion System। তিনটি Marine Diesel Engine-এর সঙ্গে তিনটি Waterjet যুক্ত রয়েছে। এর ফলে অগভীর জলে দ্রুত দিক পরিবর্তন এবং তুলনামূলকভাবে সহজে চলাচল করা যায়।
জাহাজটির সর্বোচ্চ গতি প্রায় ২৫ নট। পাশাপাশি, নৌসেনার অন্যান্য যুদ্ধজাহাজ এবং সামুদ্রিক বিমানের সঙ্গে সমন্বয় করে অ্যান্টি-সাবমেরিন অভিযান চালানোর ক্ষমতাও রয়েছে।
অর্থাৎ, শুধু এককভাবে নজরদারি নয়, প্রয়োজন অনুযায়ী বৃহত্তর নৌ-অভিযানের অংশ হিসেবেও কাজ করতে পারবে ‘Amini’। ভারতের দীর্ঘ উপকূলরেখা এবং গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক অঞ্চলের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এই সক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৩. আত্মনির্ভর ভারতের প্রতিরক্ষা শিল্পে GRSE-র বড় সাফল্য
‘Amini’-র হস্তান্তর শুধু ভারতীয় নৌসেনার জন্য নয়, কলকাতার প্রতিরক্ষা শিল্পের জন্যও উল্লেখযোগ্য ঘটনা। কারণ, দেশের সামরিক পরিকাঠামো শক্তিশালী করার পাশাপাশি দেশীয় প্রযুক্তিতে যুদ্ধজাহাজ তৈরির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে GRSE।
ভারত সরকারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের অধীনস্থ Navratna Defence Public Sector Undertaking হিসেবে পরিচিত এই সংস্থাটি দীর্ঘদিন ধরে ভারতীয় নৌসেনার জন্য বিভিন্ন ধরনের যুদ্ধজাহাজ, টহলদারি জাহাজ এবং বিশেষায়িত সামুদ্রিক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে আসছে।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়, এই ASW-SWC সিরিজের যুদ্ধজাহাজগুলিতে প্রায় ৮৮ শতাংশ দেশীয় উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ, যুদ্ধজাহাজ নির্মাণের ক্ষেত্রে ভারতীয় প্রযুক্তি, দেশীয় সরঞ্জাম এবং স্থানীয় প্রতিরক্ষা উৎপাদন ব্যবস্থার উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে GRSE আরও ১৩টি গুরুত্বপূর্ণ নৌ-প্রতিরক্ষা প্ল্যাটফর্ম নির্মাণের কাজ করছে। এর মধ্যে রয়েছে একটি Project 17A Advanced Stealth Frigate, তিনটি ASW-SWC, চারটি Next Generation Offshore Patrol Vessel এবং পাঁচটি Next Generation Corvette।
এর পাশাপাশি বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ক্ষেত্রেও ৩৬টি জাহাজ নির্মাণের কাজ চলছে, যার মধ্যে ১৩টি রপ্তানির জন্য নির্ধারিত। ফলে দেশীয় প্রতিরক্ষা উৎপাদনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক জাহাজ নির্মাণের বাজারেও নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করছে কলকাতার এই সংস্থা।
আরও একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, চলতি বছরের ৩০ মার্চ GRSE একই দিনে ভারতীয় নৌসেনার হাতে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ নৌ-প্ল্যাটফর্ম—Dunagiri, Sanshodhak এবং Agray—হস্তান্তর করে নজির তৈরি করেছিল। সেই সাফল্যের ধারাবাহিকতায় এবার ‘Amini’-র সংযোজন।
কলকাতার GRSE-র তৈরি ‘Amini’ শুধু একটি অত্যাধুনিক যুদ্ধজাহাজ নয়, বরং ভারতের ক্রমবর্ধমান দেশীয় প্রতিরক্ষা উৎপাদন ক্ষমতারও প্রতীক। ১১৯তম যুদ্ধজাহাজ নির্মাণের মাইলফলক এবং ভারতীয় নৌসেনার হাতে ৮১তম যুদ্ধজাহাজ হস্তান্তরের সাফল্য GRSE-র গুরুত্ব আরও বাড়াল।
উন্নত SONAR, টর্পেডো, রকেট এবং আধুনিক যুদ্ধ পরিচালন ব্যবস্থায় সজ্জিত এই রণতরী ভারতের উপকূলীয় নিরাপত্তা ও সাবমেরিন-বিরোধী অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। আর এই সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছে কলকাতার মাটি, প্রযুক্তি এবং দক্ষ কর্মীদের অবদান।
এভাবেই দেশের সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানের যুদ্ধজাহাজ নির্মাণে নিজেদের দক্ষতার পরিচয় দিয়ে চলেছে কলকাতা।






