শরতের নীল আকাশ, দুর্গাপুজোর রেশ কাটতে না কাটতেই আবার উৎসবের আলোয় সেজে ওঠে তিলোত্তমা। তবে কলকাতার উৎসবের ক্যালেন্ডারে কালীপুজোর রাতের আবেদন একেবারেই আলাদা। আলোর রোশনাই, কালীমন্দিরের বিশেষ পুজো, বিশালাকার প্রতিমা, থিমের মণ্ডপ এবং রাতভর মানুষের ভিড়—সব মিলিয়ে কালীপুজোয় এক অন্য কলকাতাকে আবিষ্কার করা যায়।
বাংলার ঘরে ঘরে এই উৎসব শ্যামাপুজো নামেও পরিচিত। কার্তিক মাসের অমাবস্যা তিথিতে দেবী কালীর আরাধনা করা হয়। অন্যদিকে, দেশের বহু প্রান্তে একই দিন পালিত হয় দীপাবলি। তবে কলকাতা ও বাংলার মানুষের কাছে এই রাতের প্রধান আকর্ষণ মা কালীর আরাধনা।
২০২৬ সালে কালীপুজো পালিত হবে ৮ নভেম্বর, রবিবার। তার আগের দিন, অর্থাৎ ৭ নভেম্বর শনিবার পালিত হবে ভূত চতুর্দশী। চোদ্দ প্রদীপ জ্বালানো, চোদ্দ শাক খাওয়া এবং পূর্বপুরুষদের স্মরণ করার বাঙালি ঐতিহ্যও এই উৎসবের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। Sahaj+1
আপনিও যদি এই কালীপুজোয় কলকাতার বিখ্যাত মণ্ডপ, ঐতিহ্যবাহী কালীমন্দির এবং আলোকসজ্জা ঘুরে দেখতে চান, তাহলে রইল আপনার জন্য একটি সম্পূর্ণ কলকাতা কালীপুজো ২০২৬ গাইড। উত্তর কলকাতা থেকে দক্ষিণ কলকাতা, কোথায় যাবেন, কী দেখবেন এবং কী কী নিয়ম মাথায় রাখবেন, জেনে নিন এক নজরে।
১. উত্তর ও মধ্য কলকাতার বিখ্যাত কালীপুজো: ফটাকেষ্ট থেকে বাগবাজার
কলকাতার কালীপুজোর কথা উঠলে উত্তর ও মধ্য কলকাতার কয়েকটি নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এখানকার পুজোগুলির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দীর্ঘদিনের ইতিহাস, পুরনো পাড়ার ঐতিহ্য এবং মানুষের আবেগ।

ফটাকেষ্টের কালীপুজো: আমহার্স্ট স্ট্রিটের কাছে নব যুবক সংঘের কালীপুজো কলকাতার অন্যতম পরিচিত নাম। ১৯৫৭ সালে শুরু হওয়া এই পুজোকে অনেকেই ফটাকেষ্টের কালীপুজো নামে চেনেন। দীর্ঘদিন ধরে একই ধরনের প্রতিমা ও ঐতিহ্য বজায় রাখার জন্য এই পুজোর বিশেষ পরিচিতি রয়েছে।
বুচিয়া দার কালীপুজো: পটুয়াটুলি লেনের নব রবিন সংঘের কালীপুজোও দর্শনার্থীদের কাছে পরিচিত। ফটাকেষ্টের পুজোর কাছাকাছি হওয়ায় একই সফরে দুটি পুজো দেখে নেওয়া যায়।
পাথুরিয়াঘাটার বড় কালী: উত্তর কলকাতার ঐতিহ্যবাহী পুজোগুলির মধ্যে পাথুরিয়াঘাটা ব্যায়াম সমিতির বড় কালী বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বিশালাকার প্রতিমা এবং দীর্ঘদিনের পুজো-পরম্পরা এই আয়োজনের অন্যতম আকর্ষণ।
বাগবাজার ও হাটিবাগান: নেতাজি তরুণ সংঘ এবং নলিন সরকার স্ট্রিটের কালীপুজোও ঘুরে দেখতে পারেন। পুরনো কলকাতার অলিগলি, আলোকসজ্জা এবং পাড়ার উৎসবের আবহ এই এলাকাগুলিকে বিশেষ আকর্ষণীয় করে তোলে।

এছাড়াও গিরিশ পার্ক ফাইভ স্টার স্পোর্টিং ক্লাব, আমহার্স্ট স্ট্রিট সম্মিলিত কালীপুজো এবং শ্যামবাজার সংলগ্ন বিভিন্ন পুজো উত্তর কলকাতার কালীপুজো পরিক্রমায় রাখতে পারেন।
২. দক্ষিণ কলকাতার কালীপুজো: কেওড়াতলা থেকে বেহালা
উত্তর কলকাতার মতো দক্ষিণ কলকাতার কালীপুজোরও নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে। কোথাও কয়েকশো বছরের শ্মশানকালীর ঐতিহ্য, কোথাও আবার আধুনিক আলোকসজ্জা ও বড় প্রতিমার আকর্ষণ। কালীপুজোর রাতে দক্ষিণ কলকাতার বেশ কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখতে পারেন।

কেওড়াতলা মহাশ্মশান কালীপুজো: দক্ষিণ কলকাতার অন্যতম ঐতিহ্যবাহী আকর্ষণ কেওড়াতলা মহাশ্মশানের কালীপুজো। শ্মশানকালী আরাধনার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে শাক্ত সাধনা ও বাংলার ধর্মীয় সংস্কৃতির দীর্ঘ ইতিহাস। প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, এখানে প্রায় দেড়শো বছরেরও বেশি সময় ধরে কালীপুজোর আয়োজন হয়ে আসছে। সাধারণ মণ্ডপের তুলনায় এই পুজোর পরিবেশ অনেকটাই আলাদা।
কালিঘাট নতুন সংঘ: কালিঘাট অঞ্চলে মন্দির দর্শনের পাশাপাশি নতুন সংঘের কালীপুজোও দেখতে পারেন। ধর্মীয় আবহ এবং পাড়ার উৎসবের মেলবন্ধন এই এলাকার বিশেষ আকর্ষণ।
বেহালা শান্তি সংঘ: দক্ষিণ-পশ্চিম কলকাতার কালীপুজো পরিক্রমায় বেহালা শান্তি সংঘের পুজো রাখতে পারেন। এখানকার প্রতিমা, মণ্ডপসজ্জা ও স্থানীয় মানুষের উৎসবের উচ্ছ্বাস দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করে।
যাদবপুরের শ্যামাপল্লি শ্যামা সংঘ: যাদবপুর অঞ্চলে কালীপুজোর অন্যতম পরিচিত আয়োজন। পাড়ার ঐতিহ্য ও উৎসবের পরিবেশ উপভোগ করতে চাইলে এই পুজোও তালিকায় রাখুন।
এছাড়াও ওয়াটগঞ্জের ভেনাস ক্লাব, শ্রী কলোনির মৈনাক ক্লাব এবং দক্ষিণ কলকাতার বিভিন্ন পাড়ার কালীপুজো ঘুরে দেখতে পারেন।
৩. কলকাতার ঐতিহাসিক কালীমন্দির: এক রাতে ঘুরে দেখুন দেবী কালীর বিভিন্ন রূপ
কালীপুজো মানেই শুধু থিমের মণ্ডপ বা আলোকসজ্জা নয়। কলকাতার প্রাচীন কালীমন্দিরগুলির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ইতিহাস, সাধক-সাধিকা, লোকবিশ্বাস এবং বহু প্রজন্মের ভক্তির স্মৃতি। মণ্ডপ পরিক্রমার পাশাপাশি এই মন্দিরগুলিতে দর্শন করাও হতে পারে আপনার কালীপুজোর বিশেষ অভিজ্ঞতা।
কালিঘাট মন্দির: কলকাতার অন্যতম প্রধান শক্তিপীঠ হিসেবে পরিচিত কালিঘাট মন্দির। দেবী কালীর আরাধনাকে কেন্দ্র করে এই মন্দিরের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বহু শতাব্দীর ধর্মীয় ঐতিহ্য। কালীপুজোর সময় এখানে ভক্তদের বিশেষ ভিড় দেখা যায়।
দক্ষিণেশ্বর ভবতারিণী মন্দির: রানী রাসমণির প্রতিষ্ঠিত দক্ষিণেশ্বরের ভবতারিণী মন্দির বাংলার ধর্মীয় ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের সাধনক্ষেত্র হিসেবেও এই মন্দিরের পরিচিতি রয়েছে। কালীপুজোর সময় বিশেষ পুজো ও দর্শনের জন্য বহু মানুষ এখানে আসেন।
ঠনঠনিয়া কালীবাড়ি: মধ্য কলকাতার বিধান সরণিতে অবস্থিত ঠনঠনিয়া কালীবাড়ি শহরের প্রাচীন কালীমন্দিরগুলির মধ্যে অন্যতম। ১৭০৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই মন্দিরের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দীর্ঘদিনের ভক্তি ও সাধনার ইতিহাস।
ফিরিঙ্গি কালীবাড়ি: বউবাজার অঞ্চলের এই মন্দির কলকাতার ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের একটি পরিচিত নিদর্শন। কবিয়াল অ্যান্টনি ফিরিঙ্গির নামের সঙ্গে এই মন্দিরের পরিচিতি বিশেষভাবে জড়িয়ে রয়েছে।
এছাড়াও সাদার্ন অ্যাভিনিউয়ের লেক কালীবাড়ি, ট্যাংরার চাইনিজ কালীবাড়ি এবং ত্রিকোণ পার্কের ডাকাত কালীবাড়ি ঘুরে দেখতে পারেন। প্রতিটি মন্দিরের নিজস্ব ইতিহাস ও আরাধনার রীতি রয়েছে। KolkataKhoj
৪. কালীপুজোর রাতে কলকাতা ঘোরার পরিকল্পনা: রুট, যানবাহন ও নিরাপত্তা
কালীপুজোর রাতে কলকাতার বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরতে হলে আগে থেকেই পরিকল্পনা করে নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে উত্তর ও দক্ষিণ কলকাতার পুজোগুলি একসঙ্গে দেখতে গেলে যাতায়াতের সময় এবং ভিড়ের বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে।
উত্তর কলকাতা পরিক্রমা: কলেজ স্ট্রিট বা এমজি রোড মেট্রো স্টেশনকে কেন্দ্র করে ফটাকেষ্টের কালীপুজো, নব রবিন সংঘ, আমহার্স্ট স্ট্রিট এবং ঠনঠনিয়া কালীবাড়ি ঘুরে দেখতে পারেন। এরপর বাগবাজার ও পাথুরিয়াঘাটার দিকে যাওয়ার পরিকল্পনা করতে পারেন।
দক্ষিণ কলকাতা পরিক্রমা: কালিঘাট মেট্রো স্টেশন থেকে কালিঘাট মন্দির ও আশপাশের পুজো দেখে কেওড়াতলা, যাদবপুর অথবা বেহালার দিকে যেতে পারেন। তবে এক রাতেই সব এলাকা ঘোরার চেষ্টা না করে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চল বেছে নেওয়া সুবিধাজনক।
যানবাহন: কলকাতা মেট্রো, বাস, অ্যাপ ক্যাব এবং অন্যান্য গণপরিবহণ ব্যবহার করতে পারেন। তবে কালীপুজোর রাতে ভিড় ও যান নিয়ন্ত্রণের কারণে যাত্রায় অতিরিক্ত সময় হাতে রাখা ভালো। বিশেষ করে গভীর রাতে ফেরার জন্য আগে থেকেই পরিবহণের বিকল্প ঠিক করে রাখুন।
ট্রাফিক বিধিনিষেধ: কলকাতা পুলিশের ঘোষিত নির্দেশিকা অনুযায়ী, ৮ নভেম্বর থেকে ১১ নভেম্বর পর্যন্ত শহরের বিভিন্ন রাস্তায় যান চলাচল, পার্কিং এবং যাত্রী ওঠানো-নামানোর ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ থাকবে। ৮ নভেম্বর সকাল ৬টা থেকে পরদিন ভোর ৪টা পর্যন্ত প্রতিমা বহনকারী গাড়ি ছাড়া অন্য পণ্যবাহী যান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। তাই গাড়ি নিয়ে বেরোনোর আগে ট্রাফিকের সর্বশেষ নির্দেশিকা দেখে নিন। Kolkata
বাজি পোড়ানোর নিয়ম: উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি পরিবেশ ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালের নির্দেশিকা অনুযায়ী, কালীপুজোর রাতে শুধুমাত্র অনুমোদিত সবুজ বাজি সন্ধ্যা ৮টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত পোড়ানো যাবে। হাসপাতাল, নার্সিংহোম, বৃদ্ধাশ্রম এবং অন্যান্য নির্দিষ্ট নীরব এলাকার ১০০ মিটারের মধ্যে বাজি পোড়ানো নিষিদ্ধ।
এছাড়া মণ্ডপে ডিজে বাজানোর অনুমতি নেই। লাউডস্পিকার ও সাউন্ড বক্স ব্যবহারের জন্য সকাল ৭টা থেকে ১১টা এবং সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। বিসর্জনের শোভাযাত্রায় শব্দবাজি ব্যবহারও নিষিদ্ধ।
কলকাতার কালীপুজো শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি শহরের ইতিহাস, সংস্কৃতি, লোকবিশ্বাস এবং বাঙালির আবেগের এক অনন্য প্রকাশ। ফটাকেষ্টের ঐতিহ্যবাহী পুজো, কেওড়াতলার শ্মশানকালীর আরাধনা, কালিঘাট ও দক্ষিণেশ্বরের মন্দির কিংবা নতুন প্রজন্মের থিমের মণ্ডপ—প্রতিটি আয়োজনেই রয়েছে আলাদা আকর্ষণ।
২০২৬ সালের ৮ নভেম্বর কালীপুজোর রাতে আপনিও বেরিয়ে পড়তে পারেন তিলোত্তমার এই বিশেষ উৎসব পরিক্রমায়। তবে উৎসবের আনন্দ যেন অন্যের অসুবিধার কারণ না হয়। পরিবেশবান্ধব উৎসব, নিরাপদ যাতায়াত এবং প্রশাসনের নির্দেশিকা মেনেই উপভোগ করুন কলকাতার আলোর রাত।






