হিমালয়ের নির্জন পাহাড়ি গ্রাম থেকে কলকাতার প্রেক্ষাগৃহ—ভালোবাসা, বার্ধক্য ও নিঃসঙ্গতার গল্পে আবেগতাড়িত দর্শক
কলকাতা, ৩১ অক্টোবর ২০২৬: আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের মঞ্চে একের পর এক সম্মান অর্জনের পর এবার কলকাতার দর্শকদের সামনে হাজির হল ভারতীয় ছবি ‘PYRE’ (চিতা)। লেখক ও পরিচালক বিনোদ কাপরির এই ছবি ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক স্তরে ১৮টি পুরস্কার জিতে নজর কেড়েছে। যার মধ্যে রয়েছে ১৫টি সেরা ছবির সম্মান। ৩১ অক্টোবর কলকাতায় ছবিটির বিশেষ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়।
উত্তরাখণ্ডের মনোরম হিমালয় পার্বত্য অঞ্চলের পটভূমিতে তৈরি হয়েছে ‘PYRE’-এর কাহিনি। পাহাড়ের এক প্রায় জনশূন্য গ্রামে বসবাসকারী এক বৃদ্ধ দম্পতির জীবনকে কেন্দ্র করে এগিয়েছে ছবির গল্প। বয়সের ভার, একাকিত্ব, জীবনের কঠিন বাস্তবতা এবং একে অপরের প্রতি অটুট ভালোবাসার মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে এক গভীর মানবিক অনুভূতি।
শুধু বার্ধক্যের গল্প নয়, ‘PYRE’ আসলে সম্পর্কের স্থায়িত্ব, সহযাত্রা এবং জীবনের শেষ অধ্যায়েও ভালোবাসার প্রয়োজনীয়তার এক সংবেদনশীল দলিল। আন্তর্জাতিক দর্শকদের মন জয় করার পর কলকাতার দর্শকদের কাছেও ছবিটি বিশেষ আবেগ তৈরি করেছে।
হিমালয়ের পাহাড়ি জীবনের গল্পে ভালোবাসার অনন্য আখ্যান
‘PYRE’-এর অন্যতম বড় আকর্ষণ ছবির দুই মুখ্য অভিনেতা। ৮০ বছর বয়সি পদম সিং এবং ৭০ বছর বয়সি হীরা দেবী—দু’জনেই উত্তরাখণ্ডের স্থানীয় বাসিন্দা। তাঁদের কারওই পেশাদার অভিনয়ের পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই।

তবুও তাঁদের স্বাভাবিক অভিনয় ছবির কাহিনিকে করে তুলেছে অত্যন্ত বাস্তব ও হৃদয়স্পর্শী। পর্দায় তাঁদের সম্পর্কের টানাপোড়েন, পারস্পরিক নির্ভরতা এবং নিঃশব্দ ভালোবাসা দর্শকদের মনে গভীর ছাপ ফেলে।
পাহাড়ি গ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, নির্জন পরিবেশ এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ছবির গল্পকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছে। কৃত্রিমতার বাইরে গিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনের অসাধারণ মুহূর্তগুলিকেই তুলে ধরেছেন পরিচালক।
আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে একের পর এক সম্মান ‘PYRE’-এর ঝুলিতে
আন্তর্জাতিক স্তরে ‘PYRE’-এর যাত্রা শুরু হয় এস্তোনিয়ার মর্যাদাপূর্ণ Tallinn Black Nights Film Festival-এ। সেখানেই ছবিটির প্রথম প্রদর্শনী হয়। দর্শকদের স্ট্যান্ডিং ওভেশন এবং Audience Award জয় ছবিটির আন্তর্জাতিক সাফল্যের পথ প্রশস্ত করে।
এরপর একাধিক আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রশংসিত হয় বিনোদ কাপরির এই ছবি। উল্লেখযোগ্য পুরস্কারগুলির মধ্যে রয়েছে—
- Tallinn Black Nights Film Festival: Audience Award
- London Indian Film Festival: Audience Award
- Indian Film Festival Stuttgart: German Star of India Award for Best Feature Film
- Birmingham Indian Film Festival: Audience Award
- DC South Asian Film Festival: Best Feature Film
এছাড়াও বিশিষ্ট চলচ্চিত্র পরিচালক দীপা মেহতা এবং কিংবদন্তি কবি ও গীতিকার গুলজারের কাছ থেকেও প্রশংসা পেয়েছে ছবিটি।

আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র মহলে এই স্বীকৃতি ভারতীয় স্বাধীন ধারার সিনেমার জন্যও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, স্থানীয় জীবনের একটি সাধারণ গল্প কীভাবে আন্তর্জাতিক দর্শকদের আবেগের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে, ‘PYRE’ তারই উদাহরণ।
সুর ও সংগীতেও আন্তর্জাতিক মানের ছোঁয়া
‘PYRE’-এর আবেগঘন গল্পকে আরও গভীর করে তুলেছে ছবির সংগীত। ছবির সুরারোপ করেছেন অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডজয়ী সংগীত পরিচালক মাইকেল ডানা (Mychael Danna) এবং সার সিংঘল।
গানের কথা লিখেছেন কিংবদন্তি কবি ও গীতিকার গুলজার। অন্যদিকে, ছবিতে কণ্ঠ দিয়েছেন বিশিষ্ট শাস্ত্রীয় সংগীতশিল্পী শ্রুতি সাডোলিকার। সংগীতের এই আন্তর্জাতিক ও ভারতীয় মেলবন্ধন ছবির আবহকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
ছবিটি প্রযোজনা করেছেন বিনোদ কাপরি, অরিন্দ্র রায় চৌধুরী এবং সুরেশ যোশী। গল্পের আবেগ, অভিনয়ের স্বাভাবিকতা এবং সংগীতের মেলবন্ধনে ‘PYRE’ হয়ে উঠেছে এক বিশেষ সিনেম্যাটিক অভিজ্ঞতা।
৩০ অক্টোবর ২০২৬ ভারতে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছে ‘PYRE’। মুক্তির পর কলকাতায় বিশেষ প্রদর্শনীর মাধ্যমে ছবিটি শহরের দর্শকদের কাছেও পৌঁছে গেল।
ব্যস্ত নাগরিক জীবনের বাইরে দাঁড়িয়ে ভালোবাসা, বার্ধক্য, নিঃসঙ্গতা এবং মানুষের পারস্পরিক নির্ভরতার মতো বিষয়গুলিকে নতুন করে ভাবতে শেখায় এই ছবি। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির পাশাপাশি সাধারণ মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়াই ‘PYRE’-এর সবচেয়ে বড় সাফল্য।





