কলকাতা মানেই শুধু দুর্গাপুজো, আলো আর উৎসবের শহর নয়। এই শহরের অলিগলি, ঘাট, মন্দির এবং মানুষের বিশ্বাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছেন মা কালী। তাই কলকাতাকে অনেকেই শ্যামাপীঠের শহর বলেও অভিহিত করেন।
কালীপুজোর রাতে যখন শহরজুড়ে প্রদীপ জ্বলে, আকাশে আতশবাজির আলো ছড়িয়ে পড়ে, তখন কলকাতার বিভিন্ন প্রান্তের কালীমন্দিরগুলিতে শুরু হয় বিশেষ পুজো, আরাধনা এবং ভক্তসমাগম। কোনও মন্দিরের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কয়েকশো বছরের ইতিহাস, কোনওটির সঙ্গে লোককথা, আবার কোনওটির পরিচিতি সাধক ও আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্বদের স্মৃতিতে।
কলকাতা ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা এই কালীমন্দিরগুলি কেবল ধর্মীয় উপাসনাস্থল নয়, এগুলি বাংলার ইতিহাস, শাক্তধর্ম, লোকবিশ্বাস এবং সামাজিক সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী।
কালীঘাটের আদিগঙ্গার তীর থেকে দক্ষিণেশ্বরের গঙ্গাপাড়, আবার ঠনঠনিয়ার ব্যস্ত রাস্তা থেকে ভবানীপুরের প্রাচীন মন্দির—প্রতিটি জায়গার রয়েছে নিজস্ব পরিচয় ও ইতিহাস। চলুন, জেনে নেওয়া যাক কলকাতার কয়েকটি বিখ্যাত কালীমন্দিরের ইতিহাস ও বিশেষত্ব।
১. কালীঘাটের মা কালী: ৫১ সতীপীঠের অন্যতম, কলকাতার প্রাচীন শাক্ত ঐতিহ্য

কলকাতার কালীমন্দিরের ইতিহাস বলতে প্রথমেই উঠে আসে কালীঘাটের নাম। আদিগঙ্গার তীরে অবস্থিত এই মন্দিরকে হিন্দু ধর্মবিশ্বাসে ৫১ সতীপীঠের অন্যতম বলে মনে করা হয়। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, এখানে দেবী সতীর ডান পায়ের আঙুল পড়েছিল। সেই থেকেই স্থানটি বিশেষ পবিত্রতার মর্যাদা লাভ করে।
কালীঘাটের ইতিহাস বহু প্রাচীন হলেও বর্তমানে যে মন্দিরের স্থাপত্য দেখা যায়, সেটি মূলত ঊনবিংশ শতকের গোড়ার দিকের। কলকাতা পুরসভার ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, বরিশার সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের সন্তোষ রায়চৌধুরী ১৮০৯ সালে বর্তমান মন্দির নির্মাণ করেন।
মন্দিরের অধিষ্ঠাত্রী দেবী দক্ষিণাকালী। এখানকার বিগ্রহের রয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। তিনটি চোখ, চারটি হাত এবং সোনার দীর্ঘ জিহ্বা—দেবীর এই রূপ বাংলার প্রচলিত কালীমূর্তির থেকে কিছুটা আলাদা।
মন্দিরের ভিতরে রয়েছে নাটমন্দির এবং সংলগ্ন অন্যান্য দেবদেবীর উপাসনাস্থল। কালীপুজো, স্নানযাত্রা এবং বিভিন্ন বিশেষ তিথিতে এখানে দেশ-বিদেশের অসংখ্য ভক্তের সমাগম হয়।
কালীঘাটকে ঘিরেই একসময় গড়ে উঠেছিল বিখ্যাত পটচিত্রের শিল্পধারা। কালীঘাট পটচিত্র বাংলার লোকশিল্পের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। অর্থাৎ, এই মন্দিরের প্রভাব শুধু ধর্মীয় ক্ষেত্রেই নয়, কলকাতার শিল্প-সংস্কৃতিতেও গভীর ছাপ ফেলেছে।
২. দক্ষিণেশ্বরের ভবতারিণী: রানি রাসমণি ও শ্রীরামকৃষ্ণের স্মৃতিবিজড়িত মন্দির

কলকাতার বিখ্যাত কালীমন্দিরের তালিকায় দক্ষিণেশ্বরের ভবতারিণী মন্দিরের স্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গঙ্গার পূর্ব তীরে অবস্থিত এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন জনবাজারের জমিদার ও সমাজসেবী রানি রাসমণি।
মন্দিরের প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে জড়িয়ে রয়েছে একটি বহুল প্রচলিত স্বপ্নকাহিনি। কথিত আছে, ১৮৪৭ সালে কাশীযাত্রার আগে রানি রাসমণি স্বপ্নে মা কালীর দর্শন পান। দেবী তাঁকে গঙ্গার তীরে মন্দির নির্মাণ করে নিজের পুজোর ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেন। এরপরই মন্দির নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
১৮৪৭ সালে কেনা জমিতে প্রায় আট বছরের নির্মাণকাজের পর ১৮৫৫ সালের ৩১ মে, স্নানযাত্রার পুণ্যতিথিতে মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়। দেবী এখানে ভবতারিণী নামে পূজিতা হন। ভবতারিণী অর্থাৎ যিনি সংসারের দুঃখ ও বিপদ থেকে ভক্তকে উদ্ধার করেন।
নবরত্ন স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত মূল মন্দিরের পাশাপাশি রয়েছে বারোটি শিবমন্দির এবং রাধাকান্তের মন্দির। গঙ্গার পাড়ে বিস্তৃত এই মন্দির চত্বর বাংলার ঐতিহ্যবাহী মন্দির স্থাপত্যের অন্যতম নিদর্শন।
তবে দক্ষিণেশ্বরের ইতিহাস শুধু মন্দির প্রতিষ্ঠার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এই মন্দিরের সঙ্গেই জড়িয়ে রয়েছে শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের সাধনজীবন। তিনি দীর্ঘদিন এখানে মা ভবতারিণীর পুজো ও সাধনায় নিমগ্ন ছিলেন। তাঁর আধ্যাত্মিক জীবন এবং সারদা দেবী ও স্বামী বিবেকানন্দের সঙ্গে সম্পর্ক দক্ষিণেশ্বরকে আন্তর্জাতিক পরিচিতি দিয়েছে।
৩. ঠনঠনিয়া কালীবাড়ি: উত্তর কলকাতার প্রাচীন শ্যামাপীঠ

উত্তর কলকাতার ব্যস্ত বিধান সরণির পাশে অবস্থিত ঠনঠনিয়া কালীবাড়ি শহরের অন্যতম পরিচিত প্রাচীন কালীমন্দির। আধুনিক কলকাতার নাগরিক জীবনের মাঝেও এই মন্দির ধরে রেখেছে পুরনো কলকাতার ধর্মীয় ও সামাজিক ঐতিহ্য।
এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠাকাল নিয়ে কিছু মতভেদ রয়েছে। কলকাতা পুরসভার ঐতিহাসিক বিবরণে ১৭০৩ এবং ১৮০৩—দুই ধরনের সাল উল্লেখ করা হয়েছে। মন্দিরের দেওয়ালে থাকা ১১১০ বঙ্গাব্দের শিলালিপির ভিত্তিতে ১৭০৩ সালকে প্রতিষ্ঠার সম্ভাব্য সময় হিসেবে ধরা হয়।
এখানে দেবী কালী ভক্তদের কাছে বিশেষভাবে পূজিতা। মন্দিরের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে সাধক ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের স্মৃতি। বিশেষত রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের এই মন্দিরে আগমন ও সাধনাসংক্রান্ত লোকপ্রচলিত কাহিনি এর পরিচিতিকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
কালীপুজো ও অমাবস্যার তিথিতে এখানে ভক্তদের ভিড় দেখা যায়। উত্তর কলকাতার পুরনো বনেদি পাড়া, সরু রাস্তা এবং ঐতিহ্যবাহী বাড়ির পরিবেশের মধ্যে ঠনঠনিয়া কালীবাড়ি আজও এক বিশেষ ধর্মীয় আকর্ষণ।
৪. ফিরিঙ্গি কালীবাড়ি: অ্যান্টনি ফিরিঙ্গির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ব্যতিক্রমী ইতিহাস

কলকাতার বৌবাজার অঞ্চলের ফিরিঙ্গি কালীবাড়ি ইতিহাসের দিক থেকে বেশ ব্যতিক্রমী। এই মন্দিরের নামের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত কবিয়াল অ্যান্টনি ফিরিঙ্গির স্মৃতি। তাঁর আসল নাম ছিল হেনসম অ্যান্টনি। বাংলার কবিগানের জগতে তিনি অ্যান্টনি কবিয়াল নামেও পরিচিত।
মন্দিরের অধিষ্ঠাত্রী দেবী সিদ্ধেশ্বরী কালী। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি মা কালীর একনিষ্ঠ ভক্ত ছিলেন এবং এই মন্দিরের সঙ্গে তাঁর বিশেষ সম্পর্ক ছিল। তবে মন্দিরটির প্রতিষ্ঠাতা যে তিনিই, এমন দাবির পক্ষে নিশ্চিত ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই।
মন্দিরের ফলকে ৯০৫ বঙ্গাব্দে প্রতিষ্ঠার উল্লেখ রয়েছে। যদিও এই প্রাচীনত্ব নিয়েও ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। অন্যদিকে, কলকাতা হাইকোর্টের ১৯৭৩ সালের একটি মামলার নথিতে মন্দিরের জমিতে শিবমন্দির এবং পরবর্তী সময়ে শ্রীমন্ত পণ্ডিতের মাধ্যমে কালীসহ অন্যান্য দেবদেবীর বিগ্রহ প্রতিষ্ঠার বিবরণ পাওয়া যায়।
এই মন্দিরের বিশেষত্ব এখানেই যে, ধর্মীয় পরিচয়ের গণ্ডি ছাড়িয়ে কলকাতার বহুত্ববাদী সংস্কৃতির একটি প্রতীক হয়ে উঠেছে এটি। আজও বৌবাজারের ব্যস্ত এলাকার মধ্যে ছোট্ট এই কালীবাড়িতে নিয়মিত পুজো হয়।
৫. চেতলার ডাকাত কালী: দক্ষিণ কলকাতার রহস্যময় লোককথা
দক্ষিণ কলকাতার চেতলা অঞ্চলের ডাকাত কালীবাড়ি শহরের অন্যতম আলোচিত লোকবিশ্বাসের কেন্দ্র। এই মন্দিরের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ডাকাতদের উপাসনা, আদি গঙ্গার তীরবর্তী জনপদ এবং নানা রহস্যময় কাহিনি।
একসময় চেতলা ও তার আশপাশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল ছিল জলাজমি, জঙ্গল এবং নদীপথে ঘেরা। জনবসতি ছিল তুলনামূলকভাবে কম। লোককথা অনুযায়ী, সেই সময় নদীপথে যাতায়াতকারী ডাকাতদল নিজেদের অভিযান শুরুর আগে মা কালীর আরাধনা করত।
প্রচলিত কাহিনিতে নীলু ও ভুলু নামে দুই ডাকাতের উল্লেখ পাওয়া যায়। তাঁদের সঙ্গে এই মন্দিরের বিশেষ সম্পর্ক ছিল বলে স্থানীয়ভাবে বিশ্বাস করা হয়। ডাকাতদের উপাস্য দেবী হিসেবেই পরিচিতি পায় ডাকাত কালী।
এই মন্দিরের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হল দেবীমূর্তির সঙ্গে যুক্ত লোহার শিকলের কাহিনি। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, মা কালী নাকি একসময় মন্দিরের মধ্যে চলাফেরা করতেন। তাঁকে আটকে রাখতেই লোহার শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছিল। যদিও এই কাহিনির ঐতিহাসিক সত্যতা প্রতিষ্ঠিত নয়, তবুও এটি মন্দিরের জনপ্রিয় লোককথার অংশ।
আজকের চেতলা অনেকটাই বদলে গিয়েছে। পুরনো জলাজঙ্গল জায়গা করে দিয়েছে আধুনিক বসতিকে। কিন্তু ডাকাত কালীর মন্দিরে আজও টিকে রয়েছে অতীতের সেই রহস্যময় স্মৃতি।
৬. কলকাতার কালীমন্দির: ইতিহাস, বিশ্বাস ও সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক
কলকাতার কালীমন্দিরগুলির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রতিটি মন্দিরের জন্ম, বিকাশ এবং পরিচিতির পিছনে রয়েছে আলাদা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট।
কালীঘাটের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সতীপীঠের বিশ্বাস ও বাংলার শাক্ত ঐতিহ্য। দক্ষিণেশ্বরের পরিচয় তৈরি হয়েছে রানি রাসমণি এবং শ্রীরামকৃষ্ণের আধ্যাত্মিক সাধনাকে কেন্দ্র করে। অন্যদিকে, ঠনঠনিয়া কালীবাড়ি পুরনো কলকাতার ধর্মীয় পরিবেশের সাক্ষী।
ফিরিঙ্গি কালীবাড়ি কলকাতার সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের কথা বলে। আবার চেতলার ডাকাত কালী স্থানীয় লোকবিশ্বাস ও অতীতের নদীকেন্দ্রিক জনজীবনের স্মৃতি বহন করে।
এই মন্দিরগুলির ইতিহাসে কোথাও রয়েছে নথিভুক্ত তথ্য, কোথাও ধর্মীয় বিশ্বাস, আবার কোথাও প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা লোককথা। ইতিহাস ও কিংবদন্তিকে আলাদা করে দেখলেও কলকাতার সাংস্কৃতিক পরিচয় বুঝতে এই মন্দিরগুলির গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না।
কলকাতার কালীমন্দিরগুলি শুধুমাত্র পুজো দেওয়ার জায়গা নয়, এগুলি শহরের ইতিহাসের জীবন্ত দলিল। কয়েকশো বছরের ঐতিহ্য, সাধক-সাধিকার স্মৃতি, জমিদারদের অবদান এবং সাধারণ মানুষের বিশ্বাস মিলিয়ে তৈরি হয়েছে কলকাতার শ্যামাপীঠের পরিচয়।
কালীপুজোর আলোয় যখন নতুন করে সেজে ওঠে তিলোত্তমা, তখন এই প্রাচীন মন্দিরগুলির ইতিহাস মনে করিয়ে দেয়—কলকাতার সঙ্গে মা কালীর সম্পর্ক কেবল উৎসবের নয়, তা এই শহরের আত্মপরিচয়েরও এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ।





