দুর্গাপুজোর ঢাকে কাঠি পড়তে এখনও সময় রয়েছে। কিন্তু কলকাতার রাস্তায় পুজোর ভিড় সামলানোর প্রস্তুতি ইতিমধ্যেই শুরু করে দিয়েছে কলকাতা পুলিশ। শহরের বড় ও গুরুত্বপূর্ণ পুজোগুলিকে চিহ্নিত করে ভিড় নিয়ন্ত্রণ, যান চলাচল, প্রবেশ ও বেরোনোর পথ এবং জরুরি পরিষেবার জন্য আগাম পরিকল্পনা তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কলকাতা পুলিশ কমিশনার অজয় কুমার নন্দ সমস্ত থানাকে নিজেদের এলাকার গুরুত্বপূর্ণ পুজোগুলির বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করতে বলেছেন। বড় মণ্ডপগুলির ক্ষেত্রে সম্ভাব্য ভিড়ের গতিপথ বা crowd circulation plan প্রস্তুত রাখার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। চলতি সপ্তাহেই পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের ভার্চুয়াল বৈঠক হওয়ার কথা।
শুধু দর্শনার্থীদের নিরাপত্তাই নয়, পুজোর সময় যানজট যাতে বড় আকার না নেয়, সেই বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। শহরের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পুজো-কেন্দ্রকে ইতিমধ্যেই বাড়তি নজরদারির আওতায় রাখা হয়েছে। এর মধ্যে দেশপ্রিয় পার্ক, কসবা, গড়িয়াহাট, কুমোরটুলি, বেহালা, বি কে পাল অ্যাভিনিউ এবং বাগবাজারের মতো এলাকা রয়েছে।
পুলিশের এই আগাম তৎপরতার পিছনে রয়েছে কলকাতার পুজোর বিপুল জনসমাগম। পুজোর দিনগুলিতে দর্শনার্থীদের ঢল নামার পাশাপাশি স্থানীয় যানবাহন, গণপরিবহণ, জরুরি পরিষেবা এবং পথচারীদের চলাচল—সবকিছুকেই একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। তাই শেষ মুহূর্তের ব্যবস্থা নয়, এবার শুরু থেকেই মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহে জোর দিচ্ছে লালবাজার।
বড় মণ্ডপে ভিড় নিয়ন্ত্রণে আগাম পরিকল্পনা
পুজোর সময় বড় মণ্ডপগুলিতে ভিড়ের চাপ কোথায় তৈরি হতে পারে, দর্শনার্থীরা কোন পথে প্রবেশ করবেন এবং কোন পথ দিয়ে বেরিয়ে যাবেন—এই বিষয়গুলিকে কেন্দ্র করেই তৈরি হবে বিস্তারিত পরিকল্পনা। বিশেষ করে জনপ্রিয় পুজোগুলিতে একসঙ্গে বিপুল সংখ্যক মানুষ জমায়েত হওয়ায় সামান্য ভুল পরিকল্পনাও বড় সমস্যার কারণ হতে পারে।
কলকাতা পুলিশের নির্দেশ অনুযায়ী, থানাগুলিকে নিজেদের এলাকার পুজোগুলির একটি বিস্তারিত তালিকা প্রস্তুত করতে হচ্ছে। কোন পুজোয় কতটা ভিড় হওয়ার সম্ভাবনা, কোথায় পথচারীদের চাপ বেশি তৈরি হতে পারে এবং কীভাবে সেই ভিড়কে অন্য পথে ঘুরিয়ে দেওয়া সম্ভব—এসব বিষয় মাঠপর্যায়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বড় মণ্ডপগুলির ক্ষেত্রে প্রবেশ ও বহির্গমন ব্যবস্থার উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ট্রাফিক পুলিশের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, প্রবেশ ও বেরোনোর গেটের ধারণক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হবে। একইসঙ্গে বড় পুজো-কেন্দ্রে উঁচু র্যাম্প বা এমন কোনও কাঠামো যাতে ভিড়ের চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে, তা নিয়েও সতর্ক করা হয়েছে।
মণ্ডপের বাইরে মানুষের চলাচলও সমান গুরুত্বপূর্ণ। দর্শনার্থীদের লাইন যাতে মূল রাস্তা দখল না করে এবং স্থানীয় যানবাহনের চলাচল যাতে পুরোপুরি থমকে না যায়, তার জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যারিকেড, pedestrian corridor এবং নির্দিষ্ট প্রবেশপথ ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হতে পারে।
ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় বাড়তি নজর, পরিদর্শনে পুলিশ আধিকারিকরা
এবার পুজোর প্রস্তুতিতে শুধু থানার পর্যায়ের তথ্য নয়, সরাসরি মাঠে নেমে পরিস্থিতি পরিদর্শনের উপরও জোর দেওয়া হচ্ছে। ট্রাফিক পুলিশের আধিকারিক ও সার্জেন্টদের পুজো মণ্ডপগুলিতে গিয়ে আয়োজকদের সঙ্গে কথা বলে বাস্তব পরিস্থিতি যাচাই করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মণ্ডপের গেটের মাপ, ব্যারিকেডের অবস্থান, জরুরি গাড়ি চলাচলের রাস্তা এবং দর্শনার্থীদের সম্ভাব্য ভিড়—সবকিছু খতিয়ে দেখার কথা বলা হয়েছে। কোনও দুর্ঘটনা বা অসুস্থতার মতো জরুরি পরিস্থিতিতে অ্যাম্বুল্যান্স বা অন্যান্য পরিষেবার গাড়ি যাতে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছতে পারে, সেই বিষয়টিও পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আরেকটি বড় বিষয় পার্কিং। বড় পুজো মণ্ডপের সামনে বা বেরোনোর গেটের কাছে গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাখলে দর্শনার্থীদের চলাচল বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তাই সম্ভাব্য পার্কিং স্পট চিহ্নিত করার কাজও করছে ট্রাফিক পুলিশ।
পুজোর আগে শহরের রাস্তার পরিকাঠামো নিয়েও পুলিশের উদ্বেগ রয়েছে। কলকাতা ট্রাফিক পুলিশ সম্প্রতি শহরের ২০০-র বেশি রাস্তা ও রাস্তার অংশ দ্রুত মেরামতের জন্য বিভিন্ন নাগরিক সংস্থার কাছে আবেদন জানিয়েছে। রাস্তার পাশাপাশি আলো, আবর্জনা পরিষ্কার এবং গুরুত্বপূর্ণ উড়ালপুল ও সেতুর পরিস্থিতিও নজরে রাখা হচ্ছে।
এর ফলে এবারের পুজোয় crowd management-কে শুধু পুলিশি ব্যারিকেড বা যানবাহন নিয়ন্ত্রণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে একটি বৃহত্তর urban mobility পরিকল্পনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
থিম, কাঠামো ও পুজো কমিটির তথ্যেও নজর লালবাজারের
কলকাতার দুর্গাপুজোয় মণ্ডপের থিম প্রতি বছরই দর্শনার্থীদের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। কিন্তু বড় বা জটিল কাঠামো তৈরি হলে তার সঙ্গে নিরাপত্তার বিষয়টিও জড়িয়ে যায়। তাই গুরুত্বপূর্ণ পুজোগুলির থিম, মণ্ডপের নকশা এবং নির্মাণ পরিকল্পনা সম্পর্কে আগাম তথ্য সংগ্রহের উপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
পুলিশের তরফে পুজো কমিটিগুলিকে থিম ও structural design আগেভাগে জমা দেওয়ার বিষয়ে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। এর উদ্দেশ্য একদিকে সম্ভাব্য বিতর্ক এড়ানো, অন্যদিকে মণ্ডপের নকশা ও দর্শনার্থীদের চলাচলের মধ্যে কোনও নিরাপত্তাজনিত সমস্যা রয়েছে কি না, তা আগে থেকেই বোঝা।
পুজো কমিটির অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিও পুলিশের নজরে রয়েছে। কোনও কমিটিতে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব বা পরিচালনাগত বিরোধ থাকলে তা যাতে উৎসবের সময় আইনশৃঙ্খলার সমস্যায় পরিণত না হয়, সে বিষয়ে স্থানীয় পুলিশকে আগাম যোগাযোগ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এই তথ্যভিত্তিক প্রস্তুতির আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল পুজো কমিটির পরিবর্তনের হিসাব। নতুন কমিটি যুক্ত হচ্ছে কি না, কোনও পুরনো পুজো এবার বন্ধ হচ্ছে কি না অথবা কোনও ছোট পুজো এবার বড় আকারে আয়োজন করছে কি না—এসব তথ্যও সংগ্রহ করা হচ্ছে। কারণ পুজোর আকার ও দর্শনার্থীর সংখ্যা বদলে গেলে নিরাপত্তা ও ট্রাফিক পরিকল্পনাতেও পরিবর্তন আনতে হয়।
সব মিলিয়ে, এবারের কলকাতা পুলিশের প্রস্তুতিতে দেখা যাচ্ছে তিনটি মূল স্তম্ভ—আগাম তথ্য সংগ্রহ, মাঠপর্যায়ে পরিদর্শন এবং ভিড় ও যান চলাচলের জন্য নির্দিষ্ট পরিকল্পনা। পুজোর সময় পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে পারে বলেই এই আগাম প্রস্তুতি গুরুত্বপূর্ণ।
দুর্গাপুজো কলকাতার কাছে শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি শহরের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক জীবনের অন্যতম বড় আয়োজন। কয়েক দিন ধরে লক্ষ লক্ষ মানুষ শহরের বিভিন্ন প্রান্তে প্যান্ডেল হপিংয়ে বেরিয়ে পড়েন। ফলে উৎসবের আনন্দ বজায় রাখতে নিরাপত্তা, যান চলাচল এবং জনসমাগম নিয়ন্ত্রণ একসঙ্গে সামলানো কলকাতা পুলিশের কাছে বড় প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ।
এবার সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অনেক আগেই মাঠে নামছে লালবাজার। বড় পুজোর crowd circulation plan থেকে শুরু করে মণ্ডপের গেট, ব্যারিকেড, জরুরি পথ, পার্কিং এবং রাস্তার পরিকাঠামো—প্রতিটি স্তরে আগাম প্রস্তুতির ইঙ্গিত মিলছে।
পুলিশের এই পরিকল্পনা কতটা কার্যকর হয়, তা অবশ্য নির্ভর করবে মাঠপর্যায়ে পুজো কমিটি, নাগরিক সংস্থা, ট্রাফিক বিভাগ এবং সাধারণ দর্শনার্থীদের সমন্বয়ের উপর। শেষ পর্যন্ত নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন পুজো নিশ্চিত করা শুধু পুলিশের দায়িত্ব নয়; আয়োজক এবং দর্শনার্থীদের সচেতনতাও তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
নোট: প্রতিবেদনটি ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি। পুজোর সময়সূচি, ট্রাফিক বিধিনিষেধ বা নির্দিষ্ট রাস্তা বন্ধের বিষয়ে কলকাতা পুলিশের পরবর্তী নির্দেশই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে।






