কলকাতার উৎসবের মানচিত্রে এবার যুক্ত হতে চলেছে এক নতুন ঠিকানা। বড়দিনের আলো, ক্রিসমাস ফেস্টিভ্যাল এবং উৎসবের আবহের জন্য পরিচিত পার্ক স্ট্রিটের অ্যালেন পার্কে এ বছর প্রথমবারের মতো আয়োজিত হতে চলেছে দুর্গাপুজো। কলকাতা সনাতনী সঙ্ঘের উদ্যোগে এই পুজোকে ঘিরে ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে প্রস্তুতি।
এতদিন অ্যালেন পার্ক মানেই ছিল কলকাতার বড়দিনের অন্যতম পরিচিত কেন্দ্র। ২০০৭ সালে এখানে পার্ক স্ট্রিট কার্নিভালের সূচনা হয়। ২০১১ সালের পর সেই উৎসব পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অধীনে গিয়ে কলকাতা ক্রিসমাস ফেস্টিভ্যাল হিসেবে আরও বড় পরিসরে পরিচিতি পায়। এবার সেই একই জায়গায় দুর্গাপুজোর আয়োজন পার্ক স্ট্রিটের উৎসব-পরিচয়ে নতুন মাত্রা যোগ করতে চলেছে।
আয়োজকদের দাবি, এই পুজো হবে বাংলার সংস্কৃতি ও সনাতনী আচার-অনুষ্ঠানকে সামনে রেখে। পুজোর সঙ্গে যুক্ত করা হবে বাউল গান এবং পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, উত্তরবঙ্গ-সহ বাংলার বিভিন্ন এলাকার লোকসংস্কৃতি। চতুর্থী থেকে দশমী পর্যন্ত প্রতিদিন সন্ধ্যায় বিশেষ আরতিরও পরিকল্পনা রয়েছে।
প্যান্ডেল তৈরির কাজ ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। আয়োজকরা জানিয়েছেন, প্রচলিত ‘খুঁটি পুজো’র পরিবর্তে সনাতনী রীতি মেনে করা হবে ‘ভূমি পুজো’। মহালয়া থেকেই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শুরু করার পরিকল্পনাও বিবেচনায় রয়েছে, যদিও মূল পুজোর আচার শুরু হবে চতুর্থী থেকে।
অ্যালেন পার্কে নতুন উৎসবের অধ্যায়

পার্ক স্ট্রিট কলকাতার অন্যতম পরিচিত উৎসবকেন্দ্র। বিশেষ করে বড়দিনে আলো, খাবার, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং মানুষের ভিড়ে এই এলাকা অন্য রূপ নেয়। অ্যালেন পার্কও সেই উৎসবের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এবার দুর্গাপুজোর আয়োজন সেই পরিচিত ছবিতে সম্পূর্ণ নতুন একটি অধ্যায় যোগ করছে।
আয়োজকদের বক্তব্য, পার্ক স্ট্রিট ঐতিহ্যগতভাবে দুর্গাপুজোর কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত না হলেও এই এলাকায় বহু বছর আগে ছোট পরিসরে পুজো হওয়ার কথা জানা যায়। তবে তা নিয়মিতভাবে চলেনি। সেই কারণে অ্যালেন পার্কের এবারের আয়োজনকে ঐতিহাসিক সূচনা হিসেবে দেখছেন উদ্যোক্তারা।
পুজো কমিটিতে বিজেপির একাধিক নেতা রয়েছেন। নবীন মিশ্র সম্পাদক এবং শঙ্কুদেব পাণ্ডা সভাপতি হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন। একই সঙ্গে এলাকার বিশিষ্ট নাগরিক, ব্যবসায়ী, শিক্ষাবিদ এবং অবসরপ্রাপ্ত পেশাজীবীদের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন আয়োজকরা।
সন্ধ্যার আরতি থেকে বাংলার লোকসংস্কৃতি, থাকছে একাধিক আকর্ষণ

অ্যালেন পার্কের নতুন দুর্গাপুজোর অন্যতম আকর্ষণ হতে পারে সন্ধ্যার বিশেষ আরতি। আয়োজকদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, চতুর্থী থেকে দশমী পর্যন্ত প্রতিদিন সন্ধ্যায় বড় আকারের আরতির আয়োজন করা হবে। বারাণসীর গঙ্গা আরতির আদলে এই অনুষ্ঠানকে দর্শনার্থীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে তুলে ধরতে চাইছেন উদ্যোক্তারা।
শুধু ধর্মীয় আচার নয়, বাংলার সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যও হবে এই পুজোর অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। বাউল সংগীতের পাশাপাশি পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, উত্তরবঙ্গ এবং বাংলার অন্যান্য অঞ্চলের লোকঐতিহ্য তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে। পুজোর প্রধান দিনগুলিতে দর্শনার্থীদের প্রসাদ বিতরণের ব্যবস্থাও থাকবে।
আয়োজকদের বক্তব্য, এই পুজো কোনওভাবেই পার্ক স্ট্রিটের বড়দিনের উৎসবের বিকল্প নয়। বরং বিভিন্ন উৎসবের নিজস্ব ঐতিহ্য বজায় রেখেই পার্ক স্ট্রিটের সাংস্কৃতিক পরিসর আরও সমৃদ্ধ করার লক্ষ্য তাঁদের। সাধারণ মানুষের যাতে কোনও অসুবিধা না হয়, সেদিকেও নজর রাখা হবে বলে জানানো হয়েছে।
পার্ক স্ট্রিটের উৎসব-পরিচয়ে নতুন সংযোজন
দুর্গাপুজো কলকাতার সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অন্যতম প্রধান অংশ। সেই উৎসব যখন শহরের এমন একটি জায়গায় প্রথমবার প্রবেশ করছে, যে জায়গাটি মূলত ক্রিসমাস উদযাপনের জন্য বিখ্যাত, তখন স্বাভাবিকভাবেই তা নজর কাড়ছে। অ্যালেন পার্কের এই নতুন পুজো তাই শুধু একটি নতুন মণ্ডপের সূচনা নয়, পার্ক স্ট্রিটের উৎসব-পরিচয়েরও পরিবর্তনের ইঙ্গিত।
এবার দেখার, নতুন এই দুর্গাপুজো কলকাতার পুজোপ্রেমীদের কতটা আকর্ষণ করতে পারে এবং অ্যালেন পার্ক আগামী দিনে দুর্গাপুজোর মানচিত্রে কতটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গা তৈরি করে নেয়।






