বাংলা সিনেমার অন্যতম আলোচিত ফ্র্যাঞ্চাইজি ‘বহুরূপী’ ফিরছে নতুন অধ্যায় নিয়ে। Windows Production প্রকাশ করেছে বহু প্রতীক্ষিত ‘Bohurupi – The Golden Daku’-র অফিসিয়াল টিজার। ২০২৪ সালের সফল ‘বহুরূপী’-র পর এবার গল্পের পরিসর আরও বড়, সংঘাত আরও তীব্র এবং অ্যাকশন আরও বিস্তৃত হতে চলেছে—টিজারের প্রতিটি ঝলকেই যার স্পষ্ট ইঙ্গিত।
সবচেয়ে বড় আকর্ষণ অবশ্যই বিক্রম প্রামাণিক। শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের অভিনয়ে এই চরিত্রটি আবারও ফিরে আসছে, তবে আগের তুলনায় আরও ধারালো, আরও আক্রমণাত্মক এক অবতারে। টিজার খুব বেশি গল্প ফাঁস না করেও বুঝিয়ে দিয়েছে, বিক্রমের জীবনে এবার এমন এক সংঘাত আসছে যা ব্যক্তিগত, বিস্ফোরক এবং আগের গল্পের তুলনায় অনেক বড়।
আর সেই সংঘাতের অপর প্রান্তে রয়েছেন যিশু সেনগুপ্ত। তাঁর চরিত্রকে ঘিরে রহস্য বজায় রেখেই টিজার তৈরি করেছে এক শক্তিশালী মুখোমুখির আবহ। দুই চরিত্রের সংঘাত যে ছবির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হতে চলেছে, তা ইতিমধ্যেই স্পষ্ট।
২০২৬-এর দুর্গাপুজোয় বড় পর্দায় মুক্তি পাওয়ার লক্ষ্যে এগোচ্ছে ছবিটি। নির্মাতাদের ঘোষণা অনুযায়ী ১৫ অক্টোবর ২০২৬ প্রেক্ষাগৃহে আসতে চলেছে ‘বহুরূপী – দ্য গোল্ডেন ডাকু’। ফলে এবারের পুজোর বাংলা সিনেমার লড়াইয়ে এই ছবি যে অন্যতম বড় নাম, তা বলাই যায়।
‘বহুরূপী – দ্য গোল্ডেন ডাকু’: টিজারে কী দেখা গেল?
টিজারের শুরু থেকেই নির্মাতারা ছবির আবহকে রহস্যময় এবং তীব্র করে তুলেছেন। ‘বহুরূপী’-র পরিচিত জগতকে এবার আরও বড় পরিসরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা স্পষ্ট। গ্রামীণ বাংলার মাটি, চরিত্রগুলির ব্যক্তিগত জীবন, সংঘাতের মুহূর্ত এবং অ্যাকশনের একাধিক ঝলক মিলিয়ে টিজার তৈরি করেছে একটি ভারী সিনেম্যাটিক পরিবেশ।
সবচেয়ে নজর কাড়ে বিক্রম প্রামাণিকের উপস্থিতি। প্রথম ছবির চরিত্রটির সঙ্গে দর্শকদের যে আবেগ তৈরি হয়েছিল, সেই পরিচিতিকে কাজে লাগিয়েই এবার তাকে আরও একবার সামনে আনা হয়েছে। তবে এবার বিক্রম শুধু অতীতের একটি চরিত্রের প্রত্যাবর্তন নয়—নতুন গল্পের কেন্দ্রে থাকা এক শক্তিশালী উপস্থিতি।
অন্যদিকে যিশু সেনগুপ্তের চরিত্রকে ঘিরে তৈরি হয়েছে আলাদা কৌতূহল। তাঁর উপস্থিতি ছবির সংঘাতকে অন্য মাত্রা দিতে চলেছে। নির্মাতাদের বক্তব্য অনুযায়ী, বিক্রম এবং যিশুর চরিত্রের মুখোমুখি অবস্থান ছবির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক।
টিজারের বড় শক্তি হল, এটি দর্শককে পুরো গল্প জানিয়ে দেয় না। বরং প্রশ্ন তৈরি করে। কে কাকে তাড়া করছে? বিক্রমের সামনে নতুন প্রতিপক্ষ কেন? ‘গোল্ডেন ডাকু’ আসলে কে? আর এই সংঘাতের সঙ্গে বাংলার লোকসংস্কৃতির যোগ কোথায়?
এই প্রশ্নগুলিই ছবির প্রতি আগ্রহ আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
৯৬ লোকেশন, ২,৫০০ শিল্পী—আগের চেয়ে কতটা বড় ‘বহুরূপী’?
ছবিটির স্কেল সম্পর্কে সবচেয়ে বড় তথ্য দিয়েছেন স্বয়ং শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ৯৬টি লোকেশনে শুটিং হয়েছে এবং প্রধান ও সহ-শিল্পী মিলিয়ে প্রায় ২,৫০০ জন শিল্পী এই বিশাল প্রযোজনার অংশ হয়েছেন।
হাসনাবাদ, টাকি, বারাসত, বর্ধমান, বোলপুর, বিষ্ণুপুর, মালদা-সহ বাংলার একাধিক জায়গায় হয়েছে শুটিং। অর্থাৎ ‘বহুরূপী – দ্য গোল্ডেন ডাকু’ শুধু গল্পের পরিসরে নয়, দৃশ্যপটের ক্ষেত্রেও আগের ছবির তুলনায় অনেক বড় ক্যানভাস তৈরি করতে চাইছে।
এখানেই ছবিটির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য সামনে আসে। বড় বাজেটের অ্যাকশন সিনেমা মানেই যে বাংলার মাটি থেকে বিচ্ছিন্ন একটি কৃত্রিম জগত তৈরি করতে হবে, নির্মাতারা সেই পথে হাঁটেননি। বরং বাংলার ভূপ্রকৃতি, জনজীবন, লোকসংস্কৃতি এবং আঞ্চলিক বৈচিত্র্যকেই গল্পের অংশ করা হয়েছে।
শিবপ্রসাদের কথায়, বিক্রম এবং যিশুর চরিত্রের মুখোমুখি সংঘাতকে এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে তার মধ্যে স্কেল এবং ইনটেনসিটি দুটোই থাকে। অর্থাৎ শুধু অ্যাকশন দৃশ্য নয়, দুই চরিত্রের ব্যক্তিগত সংঘাতও গল্পকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
প্রথম ‘বহুরূপী’ বাস্তব ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত ক্রাইম-অ্যাকশন ঘরানার গল্পের মাধ্যমে দর্শকদের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করেছিল। এবার সেই পরিচিত জগতকে আরও বড় করে তোলাই নির্মাতাদের অন্যতম লক্ষ্য। ফলে অ্যাকশন, চেজ, থ্রিল এবং চরিত্রের আবেগ—সবকিছুর মিশ্রণেই তৈরি হতে পারে ছবির মূল নাটকীয়তা।
আর ৯৬টি লোকেশনে শুটিংয়ের তথ্য থেকেই বোঝা যায়, ছবিটির ভিজ্যুয়াল জগত কতটা বিস্তৃত হতে চলেছে।
গম্ভীরা থেকে বহুরূপী—বাংলার লোকসংস্কৃতিই ছবির আত্মা
‘বহুরূপী’ নামটির সঙ্গেই বাংলার লোকশিল্পের একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। প্রথম ছবিতে বহুরূপী শিল্পীদের উপস্থিতি যেমন গল্পের জগতকে বাস্তবতার কাছাকাছি নিয়ে গিয়েছিল, সিক্যুয়েলেও সেই সাংস্কৃতিক সূত্র অক্ষুণ্ণ রাখা হয়েছে।
এবার সেই পরিসরে যোগ হয়েছে মালদার গম্ভীরা লোকশিল্পী। গম্ভীরা বাংলার অন্যতম পরিচিত লোকসংস্কৃতির ধারা, যার গান, মুখোশ, অভিনয় এবং সামাজিক বক্তব্য দীর্ঘদিন ধরে বাংলার সাংস্কৃতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ছবিতে গম্ভীরা শিল্পীদের উপস্থিতি শুধুমাত্র দৃশ্যের সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য নয়। নির্মাতারা এই লোকশিল্পকে গল্পের ভেতরের একটি জীবন্ত উপাদান হিসেবে ব্যবহার করেছেন। ফলে ছবির অ্যাকশন ও ক্রাইম-থ্রিলারের সঙ্গে বাংলার লোকজ সংস্কৃতির একটি স্বাভাবিক সংযোগ তৈরি হচ্ছে।
এই দিকটি ‘বহুরূপী – দ্য গোল্ডেন ডাকু’-কে অন্য অনেক অ্যাকশন ছবির থেকে আলাদা করে তুলতে পারে। কারণ ছবিটি যতই বড় স্কেলে তৈরি হোক, তার শিকড় রয়ে যাচ্ছে বাংলার মাটিতে।
বহুরূপী শিল্পীদের পাশাপাশি গম্ভীরার গান, ঐতিহ্যবাহী মুখোশ এবং পরিবেশনা ছবির সাংস্কৃতিক আবহকে আরও শক্তিশালী করবে। এর ফলে গল্পের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চল, সময় এবং মানুষের জীবনযাত্রার অনুভূতি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এখানেই ‘দ্য গোল্ডেন ডাকু’ নামটির গুরুত্বও বাড়ে। নামের মধ্যে যেমন অপরাধ, রহস্য ও অ্যাডভেঞ্চারের ইঙ্গিত রয়েছে, তেমনই ‘বহুরূপী’ শব্দটি পরিচয়, ছদ্মবেশ এবং রূপান্তরের ধারণাকে সামনে আনে। এই দুই উপাদান কীভাবে গল্পের মধ্যে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়, সেটাই ছবির অন্যতম বড় রহস্য।
কাস্ট, নির্মাণ ও পুজোর লড়াইয়ে বড় বাজি
‘বহুরূপী – দ্য গোল্ডেন ডাকু’-তে কেন্দ্রীয় চরিত্রে রয়েছেন শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, যিশু সেনগুপ্ত, কৌশানী মুখোপাধ্যায় এবং সোহিনী সরকার। ফলে আগের ছবির পরিচিত চরিত্র ও নতুন মুখের সংমিশ্রণে তৈরি হয়েছে একটি বড় ensemble cast।
ছবিটি পরিচালনা করছেন নন্দিতা রায় ও শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। Windows Production-এর প্রযোজনায় তৈরি এই ছবি ‘বহুরূপী’ ফ্র্যাঞ্চাইজির পরবর্তী অধ্যায় হিসেবে দর্শকদের প্রত্যাশার চাপও বহন করছে।
২০২৪ সালের ‘বহুরূপী’ বাংলা দর্শকের কাছে একটি শক্তিশালী প্রভাব তৈরি করেছিল। অপরাধ, অ্যাকশন, আবেগ এবং বাংলার সামাজিক বাস্তবতার মিশেলে তৈরি সেই ছবির সাফল্যের পর স্বাভাবিকভাবেই সিক্যুয়েল নিয়ে প্রত্যাশা অনেক বেশি।
এবার চ্যালেঞ্জটা আরও কঠিন। কারণ প্রথম ছবির সাফল্য অনুসরণ করে শুধু একই ফর্মুলা পুনরাবৃত্তি করলে দর্শক সন্তুষ্ট নাও হতে পারেন। ‘দ্য গোল্ডেন ডাকু’-র টিজার অন্তত ইঙ্গিত দিচ্ছে, নির্মাতারা সেই ঝুঁকি নিতে চাননি।
বড় ক্যানভাস, নতুন সংঘাত, নতুন চরিত্র এবং লোকসংস্কৃতির আরও গভীর ব্যবহার—সব মিলিয়ে দ্বিতীয় ছবিকে স্বতন্ত্র করে তোলার চেষ্টা রয়েছে।
আর মুক্তির তারিখও সেই প্রত্যাশাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। ১৫ অক্টোবর ২০২৬, দুর্গাপুজোর মরশুমে প্রেক্ষাগৃহে আসছে ছবিটি। পুজো মানেই বাংলা ছবির জন্য বছরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সময়। ফলে ‘বহুরূপী – দ্য গোল্ডেন ডাকু’ যে বক্স অফিসে বড় লড়াইয়ের মুখোমুখি হবে, তা বলাই যায়।
‘বহুরূপী – দ্য গোল্ডেন ডাকু’-র অফিসিয়াল টিজার মূলত একটি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে—বিক্রম প্রামাণিকের প্রত্যাবর্তন এবার ছোট কোনও গল্পের জন্য নয়। ৯৬টি লোকেশন, প্রায় ২,৫০০ শিল্পীর অংশগ্রহণ, বড় মাপের অ্যাকশন এবং যিশু সেনগুপ্তের সঙ্গে তীব্র মুখোমুখি সংঘাত ছবিটিকে আগের অধ্যায়ের তুলনায় আরও উচ্চাকাঙ্ক্ষী করে তুলেছে।
তবে ছবিটির সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে এর সাংস্কৃতিক শিকড়। বহুরূপী শিল্পী থেকে মালদার গম্ভীরা—বাংলার লোকজ ঐতিহ্যকে গল্পের সঙ্গে জুড়ে দেওয়ার চেষ্টা ‘দ্য গোল্ডেন ডাকু’-কে নিছক একটি অ্যাকশন সিক্যুয়েল না হয়ে আরও বড় সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতায় পরিণত করতে পারে।
এখন অপেক্ষা শুধু ১৫ অক্টোবরের। বিক্রম প্রামাণিক ফিরছে, সামনে নতুন প্রতিপক্ষ, নতুন রহস্য এবং নতুন যুদ্ধ। দুর্গাপুজো ২০২৬-এ ‘বহুরূপী – দ্য গোল্ডেন ডাকু’ সত্যিই কতটা বড় বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে, তার প্রথম ইঙ্গিত অবশ্য ইতিমধ্যেই দিয়ে দিয়েছে টিজার।






