বিশ্ব পর্বতারোহণের ইতিহাসে এমন কিছু নাম রয়েছে, যাঁদের কীর্তি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে অনুপ্রেরণা জোগায়। সেই তালিকার অন্যতম উজ্জ্বল নাম নির্মল ‘নিম্সদাই’ পুরজা। মাত্র ১৪ ঘণ্টারও কম সময়ে মাউন্ট এভারেস্টে আরোহন, বিশ্বের ১৪টি আট হাজারি শৃঙ্গ অবিশ্বাস্য গতিতে জয়, অক্সিজেন ছাড়াই বহু অভিযানের সাফল্য—সব মিলিয়ে তিনি আধুনিক পর্বতারোহণের এক জীবন্ত কিংবদন্তি।
কিন্তু প্রকৃতির কাছে শেষ কথা কখনও মানুষের নয়। যতই অভিজ্ঞতা, প্রযুক্তি বা মানসিক দৃঢ়তা থাকুক, পাহাড়ের নিয়মই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় নিয়ামক। সেই বাস্তবতারই নতুন উদাহরণ হয়ে উঠল পাকিস্তানের কারাকোরাম পর্বতমালায় ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক ঘটনা।
কারাকোরামের দুর্গম অঞ্চলে অভিযান চলাকালীন আচমকা প্রবল তুষারঝড়, প্রতিকূল আবহাওয়া এবং বিপজ্জনক পরিস্থিতির মুখে পড়ে অভিযান স্থগিত করতে বাধ্য হন নিম্সদাই ও তাঁর দল। যে মানুষকে বিশ্বের অন্যতম দুর্ধর্ষ পর্বতারোহী হিসেবে ধরা হয়, তাকেও পিছিয়ে আসতে হয়েছে নিরাপত্তার স্বার্থে।
এই ঘটনাই আবার মনে করিয়ে দিল, পর্বতারোহণ কেবল শারীরিক শক্তির পরীক্ষা নয়; এটি প্রকৃতির সঙ্গে লড়াইয়ের পাশাপাশি সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ারও পরীক্ষা। পাহাড় জয় করা যেমন গৌরবের, তেমনই প্রয়োজনে ফিরে আসাও একজন প্রকৃত পর্বতারোহীর বড় সাফল্য।
কারাকোরামের তুষারঝড় কেন এত ভয়ংকর?
পাকিস্তান, ভারত ও চিনের বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে বিস্তৃত কারাকোরাম পৃথিবীর অন্যতম দুর্গম পর্বতমালা। এখানেই রয়েছে বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ শৃঙ্গ কে-টু-সহ একাধিক আট হাজারি শিখর। আবহাওয়ার দ্রুত পরিবর্তন, তীব্র ঠান্ডা, হিমবাহের ফাটল এবং আকস্মিক তুষারধস এই অঞ্চলের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কারাকোরামে কয়েক মিনিটের মধ্যেই পরিষ্কার আকাশ ঘন মেঘে ঢেকে যেতে পারে। ঘণ্টায় শতাধিক কিলোমিটার বেগে হাওয়া বইতে পারে, দৃশ্যমানতা নেমে আসে কয়েক মিটারে। এমন পরিস্থিতিতে সামনে এগোনো মানেই জীবনকে বড় ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেওয়া।
নিম্সদাইয়ের দলও এমনই এক তুষারঝড়ের মুখোমুখি হয়। প্রবল বাতাস, অবিরাম তুষারপাত এবং ক্রমশ খারাপ হতে থাকা আবহাওয়ার কারণে নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে অভিযান থামানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এই সিদ্ধান্ত অনেকের কাছে হতাশাজনক মনে হলেও অভিজ্ঞ পর্বতারোহীরা এটিকেই সঠিক পদক্ষেপ বলে মনে করেন। কারণ পাহাড়ে সাহস যেমন জরুরি, তেমনি পরিস্থিতি বুঝে পিছিয়ে আসার মানসিকতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
কে এই নিম্সদাই? কেন তাঁকে আধুনিক পর্বতারোহণের বিস্ময় বলা হয়
নেপালে জন্মগ্রহণকারী নির্মল পুরজা, যিনি সারা বিশ্বে ‘নিম্সদাই’ নামে পরিচিত, ব্রিটিশ সেনাবাহিনী ও স্পেশাল ফোর্সেসে কাজ করার পর পূর্ণসময়ের পর্বতারোহী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।
২০১৯ সালে তাঁর Project Possible বিশ্বজুড়ে আলোড়ন ফেলে দেয়। সাধারণত যে ১৪টি আট হাজারি শৃঙ্গ জয় করতে বহু পর্বতারোহীর কয়েক বছর সময় লাগে, সেই কাজ তিনি মাত্র কয়েক মাসে সম্পন্ন করেন। এই কৃতিত্ব তাঁকে আন্তর্জাতিক খ্যাতির শিখরে পৌঁছে দেয়।
এভারেস্টে অত্যন্ত দ্রুত আরোহনের পাশাপাশি বিপদে পড়া একাধিক পর্বতারোহীকে উদ্ধার করার ঘটনাও তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সাহস, নেতৃত্ব এবং সংকট মোকাবিলার দক্ষতার জন্য তিনি আন্তর্জাতিক মহলে বিশেষ সম্মান অর্জন করেছেন।
তাঁর অভিযাত্রা নিয়ে তৈরি তথ্যচিত্রও বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়তা পায়। ফলে পর্বতারোহণের বাইরেও তিনি আজ এক অনুপ্রেরণার প্রতীক।
তবে এত সাফল্যের পরেও কারাকোরামের তুষারঝড় দেখিয়ে দিল, প্রকৃতির সামনে কোনও রেকর্ডই নিরাপত্তার বিকল্প হতে পারে না।
পাহাড় শেখায় কখন জিততে হয়, কখন ফিরে আসতে হয়
পর্বতারোহণের জগতে একটি বহুল প্রচলিত কথা রয়েছে—“The summit is optional, returning safely is mandatory.” অর্থাৎ শিখরে ওঠা গুরুত্বপূর্ণ হলেও নিরাপদে ফিরে আসাটাই প্রকৃত সাফল্য।
নিম্সদাইয়ের এই সিদ্ধান্ত সেই দর্শনকেই আরও একবার সামনে নিয়ে এসেছে। কারণ পাহাড়ে প্রতিটি মুহূর্তে পরিস্থিতি বদলায়। কখনও বরফের স্তর দুর্বল হয়ে পড়ে, কখনও অক্সিজেনের ঘাটতি বাড়ে, কখনও আবার তুষারধসের ঝুঁকি তৈরি হয়।
আধুনিক প্রযুক্তি, আবহাওয়ার পূর্বাভাস এবং উন্নত সরঞ্জাম থাকা সত্ত্বেও প্রকৃতির সমস্ত আচরণ আগে থেকে অনুমান করা সম্ভব নয়। তাই অভিজ্ঞ পর্বতারোহীরা সবসময় বিকল্প পরিকল্পনা নিয়ে এগোন এবং প্রয়োজনে অভিযান বাতিল করতেও দ্বিধা করেন না।
বিশ্বের বহু নামী অভিযানে দেখা গেছে, নিরাপত্তার স্বার্থে শেষ মুহূর্তে ফিরে আসার সিদ্ধান্তই পরে শতাধিক প্রাণ রক্ষা করেছে। নিম্সদাইয়ের ক্ষেত্রেও সেই বাস্তবতাই সামনে এসেছে।
এই ঘটনায় নতুন প্রজন্মের পর্বতারোহীদের জন্যও একটি বড় শিক্ষা রয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল ছবি বা রেকর্ডের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হল পরিকল্পনা, দলগত সমন্বয়, আবহাওয়া বিশ্লেষণ এবং ঝুঁকি মূল্যায়ন।
নির্মল ‘নিম্সদাই’ পুরজার অসংখ্য সাফল্য তাঁকে বিশ্ব পর্বতারোহণের অন্যতম সেরা নাম হিসেবে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। কিন্তু কারাকোরামের তুষারঝড়ে অভিযান স্থগিত করার ঘটনা দেখিয়ে দিল, প্রকৃতির সামনে কোনও মানুষই অজেয় নন।
বরং একজন প্রকৃত অভিযাত্রীর পরিচয় শুধু শিখরে ওঠায় নয়, সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার মধ্যেও লুকিয়ে থাকে। এই ঘটনাও সেই সত্যকেই নতুন করে প্রতিষ্ঠা করল—পাহাড়কে কখনও জয় করা যায় না, তাকে কেবল সম্মান করা যায়।






