বাংলা সিনেমায় গল্প, অভিনয় কিংবা সঙ্গীত নিয়ে আলোচনা নতুন নয়। কিন্তু এমন কিছু ছবি রয়েছে, যেখানে ভিজ্যুয়াল ভাষাই গল্প বলার অন্যতম প্রধান মাধ্যম হয়ে ওঠে। সংলাপ শুরু হওয়ার আগেই রং, আলো, ছায়া এবং ফ্রেম দর্শকের মনে আবেগের বীজ বপন করে। সেই আবেগই সিনেমা শেষ হওয়ার পরও দীর্ঘদিন দর্শকের মনে থেকে যায়।
আগামী ৩ জুলাই প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেতে চলা পরিচালক চৈতি ঘোষাল-এর নতুন ছবি ‘নেভারমাইন্ড’ (Nevermind) ইতিমধ্যেই সেই কারণেই বিশেষভাবে আলোচনায় উঠে এসেছে। টিজার, ট্রেলার এবং প্রথম গান ‘ভায়োলেট বাড়ি’ (Violet Bari) প্রকাশের পর দর্শকদের মধ্যে ছবির রহস্যময় গল্পের পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি প্রশংসা কুড়িয়েছে এর অসাধারণ ভিজ্যুয়াল উপস্থাপনা।
ছবির প্রতিটি ফ্রেমে রয়েছে এক অনন্য আবহ। কোথাও অতিরঞ্জিত চাকচিক্য নেই, নেই অপ্রয়োজনীয় রঙের ব্যবহার। বরং নীরবতা, সংযম এবং আবেগের সূক্ষ্ম প্রকাশই ‘নেভারমাইন্ড’-এর ভিজ্যুয়াল পরিচয়কে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে। এই কারণেই ছবিটি মুক্তির আগেই বাংলা চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কৌতূহলের কেন্দ্রে উঠে এসেছে।
চৈতি ঘোষাল, সিনেমাটোগ্রাফার গোপী ভগত এবং কালারিস্ট দেবজ্যোতি ঘোষ-এর সম্মিলিত শিল্পভাবনায় তৈরি হয়েছে এমন এক সিনেম্যাটিক বিশ্ব, যা একই সঙ্গে আধুনিক, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন এবং গভীরভাবে বাঙালিয়ানার আবহ বহন করে।
চৈতি ঘোষালের ভাবনায় নির্মিত এক স্বতন্ত্র ভিজ্যুয়াল ভাষা

যে কোনও বড় চলচ্চিত্রের ভিজ্যুয়াল পরিচয়ের সূচনা হয় পরিচালকের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। কোন দৃশ্যে কী ধরনের আলো থাকবে, কোন রঙ কী আবেগ প্রকাশ করবে কিংবা দর্শককে কীভাবে গল্পের ভেতরে টেনে নেওয়া হবে—সবকিছুর কেন্দ্রে থাকেন পরিচালক।
‘নেভারমাইন্ড’-এ চৈতি ঘোষাল সেই আত্মবিশ্বাসই দেখিয়েছেন। মূলধারার বাংলা বাণিজ্যিক ছবিতে যেখানে উজ্জ্বল রঙ, অতিরিক্ত গ্ল্যামার এবং চোখধাঁধানো ফ্রেমের ব্যবহার বেশি দেখা যায়, সেখানে তিনি বেছে নিয়েছেন সংযত এবং আবহময় ভিজ্যুয়াল নির্মাণ।
এই ছবিতে পরিবেশই যেন গল্পের অংশ। আলো-ছায়া, ফাঁকা জায়গা, নীরবতা এবং ক্যামেরার ধীর গতির ব্যবহার দর্শককে ধীরে ধীরে ছবির মানসিক জগতে প্রবেশ করায়।
এই সংযমই ছবিটিকে আন্তর্জাতিক সিনেমার সঙ্গে তুলনীয় করে তোলে। কারণ এটি কোনও বিদেশি ধারা অনুকরণ করে না; বরং এমন এক সর্বজনীন চলচ্চিত্রভাষা ব্যবহার করে, যা ভাষা ও সংস্কৃতির সীমা অতিক্রম করে আবেগকে পৌঁছে দেয় দর্শকের কাছে।
গোপী ভগতের ক্যামেরা ও দেবজ্যোতি ঘোষের কালার গ্রেডিংয়ে তৈরি রহস্যময় রাতের পৃথিবী

একজন দক্ষ সিনেমাটোগ্রাফার কেবল দৃশ্য ধারণ করেন না, তিনি আবেগও ধারণ করেন। ‘নেভারমাইন্ড’-এ গোপী ভগত সেই কাজটিই করেছেন অত্যন্ত সংযতভাবে।
ক্যামেরা কখনও অযথা নিজেকে প্রাধান্য দেয় না। বরং চরিত্র, পরিবেশ এবং মুহূর্তকে পর্যবেক্ষণ করে। ফলে প্রতিটি দৃশ্য স্বাভাবিক, বাস্তব এবং বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়।
ছবির আলোও কৃত্রিম বলে মনে হয় না। ঘরের বাতি, রাস্তার আলো কিংবা আশপাশের প্রাকৃতিক আলোকসজ্জা থেকেই যেন দৃশ্যের আবহ তৈরি হয়েছে। এর ফলে দর্শক অনুভব করেন, তাঁরা কোনও সাজানো সেট নয়, বাস্তব একটি জগতের ভেতরে প্রবেশ করেছেন।
এই ভিজ্যুয়াল অভিজ্ঞতাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে কালারিস্ট দেবজ্যোতি ঘোষের সূক্ষ্ম কালার গ্রেডিং। ছবির বেশিরভাগ অংশ জুড়ে রয়েছে নীল, টিল, ধূসর এবং নিয়ন্ত্রিত ছায়ার ব্যবহার।
এই ঠান্ডা রঙের প্যালেট রহস্য, নিঃসঙ্গতা এবং মানসিক অনিশ্চয়তার অনুভূতিকে আরও গভীর করে তোলে। একই সঙ্গে দর্শকের আবেগকে নির্দেশ না দিয়ে নিজস্ব ব্যাখ্যা তৈরি করার সুযোগও দেয়।
কেন ‘নেভারমাইন্ড’-এর ভিজ্যুয়াল স্টাইল হতে পারে বাংলা সিনেমার নতুন মানদণ্ড

‘নেভারমাইন্ড’-এর গল্পের বড় অংশই আবর্তিত হয়েছে একটি রাতকে কেন্দ্র করে। সেই সীমিত সময়ের মধ্যেই ছবিটি বাস্তবতা এবং স্মৃতির মাঝামাঝি এক মনস্তাত্ত্বিক জগত নির্মাণ করেছে।
এখানে অন্ধকার শুধুই আলোর অনুপস্থিতি নয়, বরং গল্প বলার অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম। ছায়া যেমন রহস্য তৈরি করে, তেমনই চরিত্রগুলোর মানসিক অবস্থাও প্রতিফলিত করে।
টিজার ও ট্রেলারে যা দেখা গিয়েছে, তাতে স্পষ্ট—এই ছবি দর্শককে কী অনুভব করতে হবে, তা বলে দেয় না। বরং অনুভূতিগুলো আবিষ্কার করার সুযোগ দেয়।
সমসাময়িক সিনেমায় এই ধরনের ভিজ্যুয়াল সংযম বিরল। তাই ‘নেভারমাইন্ড’ শুধু গল্পের জন্য নয়, সিনেমাটিক ভাষার জন্যও বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে।
চলচ্চিত্র ইতিহাসে অনেক ছবিই কোনও সংলাপ বা দৃশ্যের জন্য নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট রঙ, একটি আলোর ব্যবহার কিংবা একটি আবহের জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকে। ‘নেভারমাইন্ড’ সেই তালিকায় নিজের একটি স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করতে পারবে কি না, তার উত্তর মিলবে মুক্তির পর। তবে এখন পর্যন্ত প্রকাশিত সমস্ত প্রচারসামগ্রী সেই সম্ভাবনাকেই আরও জোরালো করেছে।
চৈতি ঘোষালের পরিচালনায় নির্মিত ‘নেভারমাইন্ড’ এমন একটি চলচ্চিত্র, যেখানে ভিজ্যুয়াল নান্দনিকতা শুধুমাত্র সৌন্দর্যের উপকরণ নয়, বরং গল্প বলার অন্যতম প্রধান ভাষা। গোপী ভগতের সংযত সিনেমাটোগ্রাফি এবং দেবজ্যোতি ঘোষের সূক্ষ্ম কালার গ্রেডিং ছবিটিকে দিয়েছে এক অনন্য আবহ, যা বাংলা সিনেমায় নতুন আলোচনার জন্ম দিতে পারে।
আগামী ৩ জুলাই প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির অপেক্ষায় থাকা ‘নেভারমাইন্ড’ দর্শকদের কাছে শুধুমাত্র একটি গল্প নয়, বরং আলো, ছায়া, রঙ এবং অনুভূতির এক পূর্ণাঙ্গ সিনেম্যাটিক অভিজ্ঞতা উপহার দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছে।






