পশ্চিমবঙ্গের বেকারত্বের হার জাতীয় গড়ের নিচে—এই তথ্য সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক আলোচনায় নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। দেশের সামগ্রিক কর্মসংস্থান পরিস্থিতি যখন নানা চ্যালেঞ্জের মুখে, তখন বাংলার পরিসংখ্যান তুলনামূলক স্বস্তির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু সংখ্যাই নয়, কর্মসংস্থানের প্রকৃতি, গ্রামীণ-শহুরে বিভাজন, নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ—সব মিলিয়ে রাজ্যের শ্রমবাজারের চরিত্র আলাদা করে বিশ্লেষণের দাবি রাখে।
রাজ্য সরকারের একাধিক সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে জোর, গ্রামীণ অর্থনীতির সক্রিয়তা এবং পরিষেবা খাতের বিস্তার—এই সবকিছুর সম্মিলিত প্রভাবই কি এই ফল? নাকি জাতীয় গড়ের সঙ্গে তুলনার পদ্ধতিতেই রয়েছে কিছু বিশেষ কারণ?
এই প্রতিবেদনে আমরা বিশদে খতিয়ে দেখব বাংলার বেকারত্বের হার, জাতীয় প্রেক্ষাপট, সম্ভাব্য কারণ, চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের দিশা।
জাতীয় প্রেক্ষাপটে বাংলার অবস্থান

সাম্প্রতিক শ্রমবাজারের সমীক্ষা অনুযায়ী, দেশের গড় বেকারত্বের হার যেখানে একটি নির্দিষ্ট স্তরে রয়েছে, সেখানে পশ্চিমবঙ্গের হার তুলনামূলকভাবে কম। এই তথ্য অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি রাজ্যের উৎপাদন ও পরিষেবা খাতের সক্রিয়তার ইঙ্গিত দেয়।
জাতীয় স্তরে বেকারত্বের সমস্যা বহুস্তরীয়। কোভিড-পরবর্তী পুনরুদ্ধার, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কা, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এবং অটোমেশন—সব মিলিয়ে শ্রমবাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলার পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল বলে মনে হলেও, বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন—শুধু হার কম হলেই সমস্যার সমাধান হয়ে যায় না। কর্মসংস্থানের গুণগত মান, স্থায়িত্ব, মজুরি কাঠামো এবং সামাজিক নিরাপত্তা—এসব বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে শহরাঞ্চলে পরিষেবা খাত যেমন খুচরো ব্যবসা, আইটি-সংশ্লিষ্ট পরিষেবা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিষেবা—এগুলির বিস্তার কর্মসংস্থান তৈরি করেছে। একই সঙ্গে গ্রামীণ অঞ্চলে কৃষি ও সংশ্লিষ্ট খাতে মৌসুমি কাজের সুযোগ বেকারত্বের হার কম রাখতে সাহায্য করেছে।
কর্মসংস্থানের চালিকাশক্তি: গ্রাম থেকে শহর

বাংলার শ্রমবাজারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল গ্রামীণ অর্থনীতির শক্ত অবস্থান। কৃষি ও কৃষি-সংলগ্ন খাত এখনও বিপুল মানুষের জীবিকার উৎস। ধান, আলু, সবজি, মৎস্যচাষ—এসব ক্ষেত্র মৌসুমি হলেও কর্মসংস্থানের ধারাবাহিকতা বজায় রাখে।
এছাড়া স্বনির্ভর গোষ্ঠী (Self Help Group) ভিত্তিক কর্মকাণ্ড বিশেষ করে নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ বাড়িয়েছে। ক্ষুদ্র ঋণ, গৃহভিত্তিক উৎপাদন, হস্তশিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ—এই সব ক্ষেত্র বহু পরিবারকে বিকল্প আয়ের পথ দেখিয়েছে।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (MSME) বাংলার অর্থনীতির মেরুদণ্ড। হাওড়া, হুগলি, উত্তর ২৪ পরগনা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা—বিভিন্ন জেলায় ছোট কারখানা ও উৎপাদন ইউনিটে কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে।
শহরাঞ্চলে পরিষেবা খাতের সম্প্রসারণও গুরুত্বপূর্ণ। ই-কমার্স ডেলিভারি, রাইড-শেয়ারিং, স্টার্টআপ উদ্যোগ, শিক্ষা-প্রযুক্তি সংস্থা—এই সব ক্ষেত্র তরুণ প্রজন্মকে বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ দিয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই কাজগুলির বড় অংশই অনানুষ্ঠানিক (informal)। ফলে সামাজিক সুরক্ষা, পেনশন বা স্বাস্থ্য বিমার মতো সুবিধা সব ক্ষেত্রে নেই। তাই সংখ্যার পাশাপাশি কর্মসংস্থানের মান নিয়েও ভাবতে হবে।
চ্যালেঞ্জ, সমালোচনা ও ভবিষ্যতের দিশা

বাংলার বেকারত্বের হার জাতীয় গড়ের নিচে হলেও চ্যালেঞ্জ একেবারেই নেই—এমন দাবি করা যাবে না। উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যে কর্মসংস্থানের ঘাটতি, শিল্পায়নের ধীর গতি এবং বিনিয়োগ আকর্ষণে প্রতিযোগিতা—এই সব বিষয় সামনে রয়েছে।
আইটি ও প্রযুক্তি খাতে সুযোগ বাড়লেও বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদ বা পুনের মতো কেন্দ্রগুলির সঙ্গে প্রতিযোগিতা কঠিন। ফলে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি ও অবকাঠামো উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি।
স্কিল ডেভেলপমেন্ট বা দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি এখানে বড় ভূমিকা নিতে পারে। শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী প্রশিক্ষণ, অ্যাপ্রেন্টিসশিপ ও স্টার্টআপ সহায়তা কর্মসংস্থানের গুণগত মান বাড়াতে সাহায্য করবে।
একই সঙ্গে নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ আরও বাড়ানো গেলে সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হতে পারে। কর্মসংস্থানে লিঙ্গ বৈষম্য কমানোও একটি বড় লক্ষ্য হওয়া উচিত।
অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে টেকসই কর্মসংস্থান তৈরির জন্য প্রয়োজন শিল্পায়ন, প্রযুক্তি বিনিয়োগ এবং রপ্তানি খাতের সম্প্রসারণ। শুধুমাত্র সরকারি প্রকল্প নয়, বেসরকারি বিনিয়োগও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
পশ্চিমবঙ্গের বেকারত্বের হার জাতীয় গড়ের নিচে থাকা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক বার্তা। এটি রাজ্যের শ্রমবাজারের একটি স্থিতিশীল চিত্র তুলে ধরে।
তবে শুধুমাত্র পরিসংখ্যান দিয়ে বাস্তব পরিস্থিতি পুরোপুরি বোঝা যায় না। কর্মসংস্থানের মান, মজুরি, সামাজিক সুরক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদি শিল্পায়ন—এসব ক্ষেত্রেও সমান নজর দিতে হবে।
বাংলার সামনে সুযোগ রয়েছে—গ্রামীণ শক্তি, ক্ষুদ্র শিল্প, পরিষেবা খাত এবং প্রযুক্তি—সব মিলিয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক মডেল গড়ে তোলার। সঠিক পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ হলে আগামী দিনে কর্মসংস্থানের মানচিত্রে বাংলা আরও শক্ত অবস্থান নিতে পারে।






