পাহাড়-ডুয়ার্স-সমতল—উত্তরবঙ্গের ভূগোল বরাবরই আলাদা আকর্ষণের। এবার সেই মানচিত্রে যুক্ত হতে চলেছে এক অনন্য ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়। বিশ্বের সর্বোচ্চ মহাকাল মূর্তি ও ‘শিব মহাতীর্থ’ গড়ে তুলে শিলিগুড়িকে আন্তর্জাতিক তীর্থ ও পর্যটন হাবে রূপান্তরের ঘোষণা করলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রাজ্যের উন্নয়ন-দর্শনে এই প্রকল্প শুধু ধর্মীয় আবেগ নয়, অর্থনীতি, পর্যটন ও পরিকাঠামো উন্নয়নের বহুমাত্রিক দিশা দেখাচ্ছে।
মহাকাল—সময় ও শক্তির প্রতীক। উজ্জয়িনীর মহাকালেশ্বর মন্দিরের পর, বাংলায় মহাকালের এমন মহাকায় উপস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই জাতীয় নজর কেড়েছে। রাজ্য সরকারের ভাবনায়, এই ‘মহাতীর্থ’ উত্তর-পূর্ব ভারত, নেপাল, ভুটান ও বাংলাদেশের পুণ্যার্থীদের জন্য এক কেন্দ্রীয় আধ্যাত্মিক গন্তব্য হয়ে উঠতে পারে।
শিলিগুড়ি করিডর বরাবর কৌশলগত অবস্থান, আন্তর্জাতিক সীমান্তের নিকটতা ও রেল-সড়ক-আকাশপথের সংযোগ—সব মিলিয়ে প্রকল্পটি কেবল ধর্মীয় স্থাপনা নয়, এক বৃহৎ আর্থ-সামাজিক রূপান্তরের অনুঘটক। মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী, পরিকল্পনায় রয়েছে পরিবেশবান্ধব নকশা, পর্যটক-সহায়ক অবকাঠামো এবং স্থানীয় কর্মসংস্থানের বিস্তৃত সুযোগ।
এই ঘোষণার পরই রাজ্য রাজনীতির পাশাপাশি পর্যটন ও সংস্কৃতি মহলে শুরু হয়েছে আলোচনা—বাংলা কি এবার আধ্যাত্মিক পর্যটনের বিশ্বমানচিত্রে নতুন কেন্দ্র হয়ে উঠতে চলেছে?
শিলিগুড়িতে ‘শিব মহাতীর্থ’: প্রকল্পের রূপরেখা ও তাৎপর্য


প্রস্তাবিত ‘শিব মহাতীর্থ’ প্রকল্পের কেন্দ্রে থাকবে বিশ্বের সর্বোচ্চ মহাকাল মূর্তি—যার উচ্চতা, নকশা ও স্থাপত্য ভারতীয় মন্দির শিল্পে নতুন মানদণ্ড স্থাপন করবে। সরকারি সূত্রে জানা যাচ্ছে, এই তীর্থ কমপ্লেক্সে থাকবে ধ্যানকেন্দ্র, যজ্ঞশালা, প্রদক্ষিণপথ, সাংস্কৃতিক মঞ্চ ও তীর্থযাত্রী সুবিধা কেন্দ্র।
এই প্রকল্পের তাৎপর্য শুধু মূর্তির উচ্চতায় সীমাবদ্ধ নয়। পরিকল্পনায় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে আধ্যাত্মিক পর্যটনের অভিজ্ঞতা—যেখানে দর্শনার্থীরা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি সংস্কৃতি, সংগীত ও লোকঐতিহ্যের স্বাদ পাবেন। উত্তরবঙ্গের শৈল্পিক ধারা ও প্রাকৃতিক পরিবেশকে নকশায় অন্তর্ভুক্ত করার কথাও ভাবা হচ্ছে।
রাজ্য সরকারের দাবি, প্রকল্পটি সম্পূর্ণ হলে শিলিগুড়ি একদিকে যেমন কাশী-উজ্জয়িনীর মতো তীর্থশহরের সঙ্গে তুলনীয় হবে, তেমনই আধুনিক পর্যটন পরিকাঠামোর দিক থেকেও আন্তর্জাতিক মান স্পর্শ করবে। এর ফলে ধর্মীয় পর্যটন, হেরিটেজ ট্যুরিজম ও ইকো-ট্যুরিজম—তিন ধারাই একসূত্রে মিলবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন বৃহৎ তীর্থ প্রকল্প উত্তরবঙ্গের ব্র্যান্ডিংয়ে যুগান্তকারী ভূমিকা নিতে পারে। পাহাড় ও চা-বাগানের গণ্ডি পেরিয়ে শিলিগুড়ি পরিচিত হতে পারে ‘আধ্যাত্মিক প্রবেশদ্বার’ হিসেবে।
উত্তরবঙ্গের অর্থনীতি ও পর্যটনে নতুন দিগন্ত

‘শিব মহাতীর্থ’ প্রকল্পের প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়বে উত্তরবঙ্গের অর্থনীতিতে। পর্যটক সংখ্যা বাড়লে হোটেল, পরিবহণ, হস্তশিল্প, স্থানীয় খাদ্য ও পরিষেবা খাতে কর্মসংস্থান তৈরি হবে। রাজ্য সরকারের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, নির্মাণ ও পরবর্তী পরিচালনা পর্যায়ে হাজার হাজার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে।
শিলিগুড়ি ইতিমধ্যেই উত্তর-পূর্ব ভারতের বাণিজ্যিক প্রবেশদ্বার। এই তীর্থ প্রকল্প যুক্ত হলে শহরের পরিকাঠামো উন্নয়নে গতি আসবে—রাস্তা, জল, বিদ্যুৎ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও স্মার্ট সিটি পরিষেবায় বিনিয়োগ বাড়বে। পর্যটন শিল্পের সঙ্গে যুক্ত ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসাও লাভবান হবে।
অন্যদিকে, সীমান্তবর্তী অবস্থানের কারণে এই তীর্থ আন্তর্জাতিক পর্যটকদেরও আকর্ষণ করতে পারে। নেপাল, ভুটান ও বাংলাদেশের পুণ্যার্থীরা সহজেই শিলিগুড়িতে পৌঁছতে পারবেন। ফলে ‘ক্রস-বর্ডার পিলগ্রিম ট্যুরিজম’ এক নতুন সম্ভাবনা হিসেবে উঠে আসছে।
পর্যটন বিশ্লেষকদের মতে, ধর্মীয় পর্যটন দীর্ঘস্থায়ী ও সিজন-নিরপেক্ষ। পাহাড়ে অফ-সিজনে পর্যটন কমলেও তীর্থযাত্রা বছরজুড়ে চলতে পারে—যা উত্তরবঙ্গের অর্থনীতিকে স্থিতিশীলতা দেবে।
ধর্ম, সংস্কৃতি ও রাজনীতি: বৃহৎ প্রকল্প ঘিরে বিতর্ক ও প্রত্যাশা

যেকোনো বৃহৎ ধর্মীয় প্রকল্পের মতোই ‘শিব মহাতীর্থ’ ঘিরে মতভেদও শুরু হয়েছে। সমর্থকদের মতে, এটি রাজ্যের সংস্কৃতি ও পর্যটনকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরবে। সমালোচকদের প্রশ্ন—অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের মাঝে এত বড় ধর্মীয় বিনিয়োগ কতটা যুক্তিসংগত?
রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে বারবার জোর দেওয়া হচ্ছে, প্রকল্পটি সাম্প্রদায়িক নয়—বরং সাংস্কৃতিক ও পর্যটনমুখী। বাংলার বহুত্ববাদী ঐতিহ্য বজায় রেখেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন, স্থানীয় জনসম্পৃক্ততা ও স্বচ্ছ অর্থায়নের বিষয়েও নজর রাখার প্রতিশ্রুতি মিলেছে।
সাংস্কৃতিক মহলের একাংশ মনে করছে, এই প্রকল্প বাংলার শৈব ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার সুযোগ। অন্যদিকে নাগরিক সমাজের দাবি—স্থানীয় মানুষের স্বার্থ, পরিবেশ ও পরিকাঠামোর ভারসাম্য যেন বজায় থাকে।
এই বিতর্কের মধ্যেই এক বিষয় স্পষ্ট—শিলিগুড়ি ও উত্তরবঙ্গকে কেন্দ্র করে রাজ্যের উন্নয়ন ভাবনায় এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে, যার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে পড়বে।
বিশ্বের সর্বোচ্চ মহাকাল মূর্তি ও ‘শিব মহাতীর্থ’—শিলিগুড়িকে ঘিরে এই ঘোষণা শুধু একটি স্থাপনার নয়, একটি দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। ধর্ম, পর্যটন ও অর্থনীতিকে একসূত্রে গাঁথার এই উদ্যোগ সফল হলে উত্তরবঙ্গ পাবে নতুন পরিচয়। চ্যালেঞ্জ থাকবে বাস্তবায়নে, কিন্তু সম্ভাবনার দিগন্ত নিঃসন্দেহে বিস্তৃত।






