“স্যার, আমি বেঁচে আছি”—এই একটি বাক্যই যেন আজ পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ার সবচেয়ে করুণ, সবচেয়ে লজ্জাজনক প্রতীক। যাঁর নাম সরকারি নথিতে ‘মৃত’, সেই মানুষটাই লাইনে দাঁড়িয়ে প্রমাণ দিচ্ছেন—তিনি জীবিত, সচেতন এবং ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে চান।
সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের একাধিক জেলায় এমন ঘটনার পর ঘটনা সামনে এসেছে, যেখানে জীবিত নাগরিকদের ভোটার তালিকায় ‘ডেড’ বা মৃত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের শুনানিতে হাজির হয়ে তাঁরা বলছেন—ভুলের শিকার হয়ে কার্যত তাঁদের নাগরিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে।
ভোটাধিকার কেবল একটি সাংবিধানিক অধিকার নয়, এটি নাগরিক অস্তিত্বের স্বীকৃতি। সেই স্বীকৃতির প্রশ্নে যখন একজন মানুষকে বলতে হয়—“আমি বেঁচে আছি”—তখন তা শুধু প্রশাসনিক ত্রুটি নয়, গণতন্ত্রের ভিত্তিতে আঘাত।
এই ঘটনাগুলি সামনে আসতেই ভোটার তালিকার নির্ভুলতা, তথ্য যাচাই প্রক্রিয়া এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে রাজ্যজুড়ে।
ভোটার তালিকায় ‘মৃত’ জীবিত মানুষ: কীভাবে ঘটছে এই ভুল?

পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকা হালনাগাদ করতে প্রতি বছরই চলে বিশেষ সংশোধন অভিযান। বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করেন বুথ লেভেল অফিসাররা (BLO)। কিন্তু বাস্তবে এই প্রক্রিয়ায় একাধিক স্তরে গাফিলতি ও ভুল তথ্য সংযোজনের অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, নামের মিল, ঠিকানার বিভ্রান্তি বা অসম্পূর্ণ যাচাইয়ের জেরে কোনও ভোটারকে মৃত হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। আবার কোথাও কোথাও অভিযোগ উঠছে—ভোটার স্থানান্তর বা ডুপ্লিকেট নাম সরানোর সময় ভুলবশত জীবিত নাগরিকদের নাম বাদ পড়ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হল, এই ভুলের খবর সংশ্লিষ্ট ভোটার অনেক সময় জানতেই পারেন না। নির্বাচন ঘোষণার মুখে বুথে গিয়ে জানতে পারেন—তাঁদের নাম তালিকায় নেই, কারণ তাঁরা ‘মৃত’।
এই পরিস্থিতি স্পষ্ট করে দেয়, ডিজিটাল ডেটাবেস ও মাঠপর্যায়ের যাচাইয়ের মধ্যে যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে, তার মূল্য দিচ্ছেন সাধারণ নাগরিকরা।
“স্যার, আমি বেঁচে আছি”—শুনানির লাইনে দাঁড়িয়ে অপমানের অভিজ্ঞতা

শুনানির দিনে দৃশ্যটা ছিল হৃদয়বিদারক। বৃদ্ধ, মধ্যবয়সী, এমনকি তরুণ নাগরিকরাও লাইনে দাঁড়িয়ে নিজেদের পরিচয় প্রমাণ করছেন। কারও হাতে আধার, কারও হাতে প্যান, আবার কেউ সঙ্গে এনেছেন হাসপাতালের রিপোর্ট—সবই একটাই কথা বলার জন্য: “আমি জীবিত।”
একজন মধ্যবয়সী ব্যক্তি বলেন, সরকারি কাগজে নিজেকে মৃত প্রমাণিত দেখে তাঁর পরিবার মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে। ব্যাঙ্ক, রেশন, স্বাস্থ্য পরিষেবা—সব ক্ষেত্রেই প্রশ্ন উঠছে তাঁর অস্তিত্ব নিয়ে। ভোটার তালিকার একটি ভুল কীভাবে দৈনন্দিন জীবনে ডমিনো এফেক্ট তৈরি করতে পারে, এই ঘটনাগুলি তার বাস্তব উদাহরণ।
অনেকে অভিযোগ করছেন, শুনানির প্রক্রিয়াও সহজ নয়। বারবার নথি জমা, দীর্ঘ অপেক্ষা, এবং অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে এটি এক ধরনের প্রশাসনিক হয়রানি।
এই পরিস্থিতি প্রশ্ন তোলে—ভোটার তালিকার মতো গুরুত্বপূর্ণ নথিতে ভুল হলে, তার দায়ভার কি শুধু নাগরিকের? নাকি প্রশাসনের জবাবদিহিতাও সমানভাবে নিশ্চিত হওয়া উচিত?
গণতন্ত্রের প্রশ্নে প্রশাসনিক জবাবদিহিতা কতটা প্রস্তুত?
ভোটার তালিকা কোনও সাধারণ নথি নয়। এটি নাগরিকের রাজনৈতিক অস্তিত্বের রেকর্ড। সেই তালিকায় ভুল মানে, কার্যত একজন মানুষকে গণতন্ত্রের বাইরে ঠেলে দেওয়া।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের ঘটনা শুধু প্রশাসনিক ভুল নয়, এটি কাঠামোগত সমস্যার ইঙ্গিত। পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, তথ্য যাচাইয়ের আধুনিক পদ্ধতি এবং স্বচ্ছ আপডেট মেকানিজম না থাকলে এই সমস্যা বারবার ফিরে আসবে।
নির্বাচন কমিশনের তরফে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে—প্রতিটি অভিযোগ গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হবে। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, ভুল হওয়ার পর সংশোধন নয়—ভুল যেন না হয়, সেই ব্যবস্থাই কি বেশি জরুরি নয়?
এই ঘটনাগুলি আসন্ন নির্বাচনের আগে ভোটার আস্থার উপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ গণতন্ত্র শুধু ভোট দেওয়ার অধিকার নয়, সেই অধিকার সুরক্ষিত থাকার বিশ্বাসও।
“স্যার, আমি বেঁচে আছি”—এই বাক্যটি যেন আজ পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকার প্রতীকী প্রতিবাদ। এটি শুধু একজন মানুষের আর্তনাদ নয়, এটি একটি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রশ্ন।
ভোটার তালিকায় ভুল মানে শুধু নাম বাদ পড়া নয়, এটি নাগরিক অধিকার, সামাজিক মর্যাদা এবং রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের উপর সরাসরি আঘাত।
এই মুহূর্তে প্রয়োজন স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং প্রযুক্তিনির্ভর নির্ভুলতা। নইলে ভবিষ্যতে আরও বহু মানুষকে হয়তো বলতে হবে—“আমি বেঁচে আছি”—নিজের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে।






