যুক্তরাষ্ট্রে কাজের স্বপ্ন দেখা হাজার হাজার ভারতীয় টেক পেশাজীবীর জন্য নতুন করে অনিশ্চয়তার মেঘ। সাম্প্রতিক সময়ে United States Embassy in India থেকে জারি করা H-1B ভিসা সংক্রান্ত সতর্কবার্তায় স্পষ্ট—ভেটিং প্রক্রিয়া আরও কড়াকড়ি হচ্ছে, ফলে সাক্ষাৎকার থেকে ভিসা অনুমোদন পর্যন্ত সময় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
এই সতর্কবার্তা শুধু ভিসা প্রার্থীদের জন্যই নয়, বরং গ্লোবাল ট্যালেন্ট মবিলিটি, আউটসোর্সিং মডেল এবং মার্কিন প্রযুক্তি সংস্থাগুলোর নিয়োগ কৌশলের জন্যও বড় সংকেত। ভারতীয় আইটি পেশাজীবীরা যারা অনসাইট রোল, ক্লায়েন্ট-ফেসিং প্রকল্প কিংবা স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমে কাজ করতে চান, তাঁদের পরিকল্পনায় এখন নতুন করে হিসেব-নিকেশ জরুরি।
H-1B ভিসা দীর্ঘদিন ধরেই ভারতীয় টেক প্রতিভাদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রবেশদ্বার। কিন্তু নিরাপত্তা যাচাই, ব্যাকগ্রাউন্ড চেক এবং প্রশাসনিক স্ক্রুটিনির মাত্রা বাড়ায় সময়সীমা অনিশ্চিত হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে চাকরির অফার, প্রকল্পের টাইমলাইন এবং ব্যক্তিগত জীবনের সিদ্ধান্তে।
এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে—এই বিলম্ব কতটা দীর্ঘস্থায়ী? ভারতীয় পেশাজীবীরা কীভাবে প্রস্তুতি নেবেন? আর বিশ্বব্যাপী ট্যালেন্ট মবিলিটির প্রবণতায় কী ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে?
H-1B ভিসা সতর্কবার্তা: কী বলছে মার্কিন দূতাবাস?

মার্কিন দূতাবাসের জারি করা নোটিসে মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে—ডকুমেন্টেশন, নিরাপত্তা যাচাই এবং প্রসেসিং টাইম। আবেদনকারীদের বলা হয়েছে, প্রয়োজনীয় কাগজপত্রে সামান্য অসঙ্গতিও বিলম্ব ডেকে আনতে পারে। ফলে সাক্ষাৎকারের পরও ভিসা অনুমোদনে সপ্তাহের পর সপ্তাহ লেগে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই কড়াকড়ি নতুন নয়; তবে সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা ও অভিবাসন নীতির পুনর্মূল্যায়নের ফলে এর মাত্রা বেড়েছে। প্রযুক্তি খাতে বিদেশি কর্মীদের ওপর নির্ভরশীলতা থাকলেও, নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানের ভারসাম্য রক্ষাই এখন নীতিনির্ধারকদের অগ্রাধিকার।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রশাসনিক প্রসেসিং বা ‘221(g)’। অনেক আবেদনকারী সাক্ষাৎকার সফলভাবে সম্পন্ন করলেও অতিরিক্ত যাচাইয়ের আওতায় পড়ছেন। এই ধাপে আবেদনকারীর প্রোফাইল, পূর্ববর্তী কর্মইতিহাস এবং নিয়োগকর্তার প্রকৃতি খুঁটিয়ে দেখা হচ্ছে।
ফলে H-1B আবেদনকারীদের জন্য পরামর্শ—ভ্রমণ পরিকল্পনা, চাকরির যোগদানের তারিখ এবং ব্যক্তিগত প্রতিশ্রুতি নির্ধারণে যথেষ্ট বাফার রাখা।
ভারতীয় টেক পেশাজীবীদের উপর প্রভাব: ক্যারিয়ার, পরিবার ও অনিশ্চয়তা


H-1B ভিসার বিলম্ব মানেই শুধু কাগজপত্রের ঝামেলা নয়—এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ক্যারিয়ার গ্রোথ, আয় এবং পারিবারিক সিদ্ধান্ত। অনেক পেশাজীবী অনসাইট সুযোগের জন্য ভারতে বর্তমান চাকরি ছাড়েন বা দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পের প্রতিশ্রুতি দেন। ভিসা আটকে গেলে সেই পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।
বিশেষ করে মিড-লেভেল ও সিনিয়র টেক প্রফেশনালদের ক্ষেত্রে চাপ আরও বেশি। কারণ তাঁদের রোলগুলো প্রায়শই ক্লায়েন্ট ডেলিভারি ও স্ট্র্যাটেজিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত। ভিসা বিলম্ব মানে কোম্পানির জন্যও ক্ষতি, আবার কর্মীর জন্যও ক্যারিয়ার গ্যাপের আশঙ্কা।
পারিবারিক দিক থেকেও প্রভাব গভীর। সন্তানদের স্কুল ভর্তি, সঙ্গীর চাকরি বদল কিংবা বাসস্থান—সবকিছুই ভিসার ওপর নির্ভরশীল। অনিশ্চিত টাইমলাইন মানসিক চাপ বাড়াচ্ছে, যা কর্মক্ষমতাতেও প্রভাব ফেলছে।
এই পরিস্থিতিতে অনেকেই বিকল্প ভাবছেন—রিমোট রোল, শর্ট-টার্ম অনসাইট ভিজিট বা অন্য দেশের ওয়ার্ক ভিসা। ফলে ভারতীয় টেক ট্যালেন্টের গ্লোবাল মুভমেন্টে নতুন দিকনির্দেশনা দেখা যাচ্ছে।
বৈশ্বিক ট্যালেন্ট মবিলিটি: যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে নতুন গন্তব্য?

H-1B প্রক্রিয়ার জটিলতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বব্যাপী টেক ট্যালেন্ট মবিলিটিতে পরিবর্তন স্পষ্ট। কানাডা, ইউরোপের একাধিক দেশ এবং অস্ট্রেলিয়া দক্ষ প্রযুক্তি কর্মীদের জন্য তুলনামূলক দ্রুত ও স্বচ্ছ ভিসা প্রক্রিয়া দিচ্ছে।
কানাডার গ্লোবাল ট্যালেন্ট স্ট্রিম বা ইউরোপের ব্লু কার্ড স্কিম অনেক ভারতীয় পেশাজীবীর কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। এসব দেশে পরিবার নিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ ও নাগরিকত্বের পথ তুলনামূলক সহজ—যা দীর্ঘমেয়াদে নিরাপত্তা দেয়।
এদিকে মার্কিন কোম্পানিগুলিও কৌশল বদলাচ্ছে। অনেকে অফশোর সেন্টার শক্তিশালী করছে, আবার কেউ কেউ রিমোট-ফার্স্ট মডেলে ঝুঁকছে। ফলে “যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে কাজ” ধারণাটি ধীরে ধীরে “যেখানেই থাকি, গ্লোবাল প্রজেক্টে কাজ”—এই বাস্তবতায় রূপ নিচ্ছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র এখনও বিশ্বের বৃহত্তম টেক ইকোসিস্টেম। তাই H-1B-এর গুরুত্ব একেবারে কমে যাচ্ছে না; বরং প্রতিযোগিতা আরও বাড়ছে।
H-1B ভিসা নিয়ে মার্কিন দূতাবাসের সতর্কবার্তা একটি বড় বাস্তবতার ইঙ্গিত—গ্লোবাল ট্যালেন্ট মবিলিটি এখন আগের মতো সহজ নয়। ভারতীয় টেক পেশাজীবীদের জন্য এর অর্থ, আরও প্রস্তুত, আরও কৌশলী এবং আরও নমনীয় হওয়া।
ডকুমেন্টেশন নিখুঁত রাখা, নিয়োগকর্তার সঙ্গে বাস্তবসম্মত টাইমলাইন ঠিক করা এবং বিকল্প গন্তব্য বিবেচনায় রাখা—এই তিনটি বিষয় এখন অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে, কোম্পানিগুলোরও দায়িত্ব কর্মীদের মানসিক চাপ ও ক্যারিয়ার অনিশ্চয়তা বোঝা।
বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তি খাতে প্রতিভার চাহিদা কমেনি। বদলেছে কেবল পথ। আর সেই পথ খুঁজে নেওয়ার দক্ষতাই আগামী দিনের সাফল্যের চাবিকাঠি।






