আন্তর্জাতিক কূটনীতির মঞ্চে আবারও উত্তাপ ছড়াল নেটো জোট ও ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ঘিরে। সাম্প্রতিক বক্তব্যে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট জানিয়েছেন, নেটো মিত্রদের কাছ থেকে প্রত্যাশিত সমর্থন না পাওয়ায় তিনি গভীরভাবে অসন্তুষ্ট। তাঁর অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র একতরফাভাবে জোটের আর্থিক ও সামরিক বোঝা বহন করছে, অথচ ইউরোপীয় দেশগুলো প্রতিশ্রুত প্রতিরক্ষা ব্যয় পূরণ করছে না।
বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নেটোর ভূমিকা নিয়ে ট্রাম্পের মন্তব্য আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। তিনি দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের করদাতাদের অর্থ দিয়ে ইউরোপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে, কিন্তু এর সমান দায়িত্ব ভাগ করে নিচ্ছে না অন্যান্য সদস্য দেশ।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই বক্তব্য কেবল রাজনৈতিক নয়—এটি নেটোর ভবিষ্যৎ কাঠামো ও পশ্চিমা জোটের ঐক্য নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলছে। ইউক্রেন সংকট, রাশিয়ার সঙ্গে উত্তেজনা এবং প্রতিরক্ষা বাজেট—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।
আসন্ন মার্কিন নির্বাচনের আগে এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপরও বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ, ট্রাম্প পুনরায় ক্ষমতায় এলে নেটো নীতিতে বড় পরিবর্তন আসতে পারে—এমন আশঙ্কাও প্রকাশ পাচ্ছে ইউরোপীয় মহলে।
নেটোর প্রতিরক্ষা ব্যয় নিয়ে ট্রাম্পের প্রধান অভিযোগ
ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই নেটোর প্রতিরক্ষা ব্যয় কাঠামোর সমালোচক। তাঁর মতে, জোটের সদস্য দেশগুলোকে নিজেদের জিডিপির কমপক্ষে ২ শতাংশ প্রতিরক্ষায় ব্যয় করার প্রতিশ্রুতি থাকলেও অনেক দেশ তা মানছে না। ফলে যুক্তরাষ্ট্রকে বাড়তি আর্থিক দায় বহন করতে হচ্ছে।
ট্রাম্পের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি ও অর্থনৈতিক ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে ইউরোপীয় দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে। কিন্তু একই সময়ে তারা প্রতিরক্ষা ব্যয়ে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করছে না। তাঁর ভাষায়, “আমেরিকা আর বিশ্বের নিরাপত্তার জন্য বিনা মূল্যে পাহারা দিতে পারে না।”
এই মন্তব্য ইউরোপীয় কূটনৈতিক মহলে অস্বস্তি তৈরি করেছে। অনেক দেশ ইতিমধ্যে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর ঘোষণা দিলেও তা এখনও যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশার তুলনায় কম বলে মনে করছেন ট্রাম্পপন্থীরা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নেটোর শক্তি মূলত ঐক্যের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সদস্যদের মধ্যে আর্থিক দায়িত্ব নিয়ে বিভাজন বাড়লে জোটের কার্যকারিতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ইউক্রেন যুদ্ধ ও নেটোর ভূমিকা নিয়ে বাড়ছে মতবিরোধ
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর নেটো জোটের ঐক্য নতুন করে পরীক্ষার মুখে পড়েছে। ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে, কিন্তু এই সহায়তার মাত্রা নিয়ে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে।
ট্রাম্প মনে করেন, ইউক্রেনকে সমর্থন দেওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র অতিরিক্ত দায় নিচ্ছে। তিনি দাবি করেছেন, ইউরোপীয় দেশগুলোকেই এই সংঘাতের প্রধান বোঝা বহন করা উচিত, কারণ ভৌগোলিকভাবে তারা সংঘাতের কাছাকাছি।
অন্যদিকে বর্তমান মার্কিন প্রশাসন ও ইউরোপীয় নেতারা মনে করেন, ইউক্রেনকে সমর্থন দেওয়া পশ্চিমা নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রাশিয়ার আগ্রাসন থামাতে না পারলে ভবিষ্যতে ইউরোপের অন্যান্য দেশও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
এই দ্বন্দ্ব নেটোর অভ্যন্তরে রাজনৈতিক বিভাজনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ট্রাম্প ক্ষমতায় এলে ইউক্রেন নীতিতে বড় পরিবর্তন আসতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ট্রাম্পের অবস্থান নেটোর ভবিষ্যৎকে কোথায় নিয়ে যাবে?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের বক্তব্য কেবল বর্তমান পরিস্থিতির প্রতিফলন নয়—এটি ভবিষ্যৎ নীতির ইঙ্গিতও হতে পারে। তিনি অতীতে নেটোকে “পুরনো” বা “অপ্রয়োজনীয়” বলে উল্লেখ করেছিলেন, যদিও পরে কিছুটা অবস্থান নরম করেন।
যদি তিনি পুনরায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন, তাহলে নেটোর প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি কমে যেতে পারে—এমন আশঙ্কা রয়েছে। এতে ইউরোপীয় দেশগুলোকে নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হতে পারে।
একই সঙ্গে নেটোর ভেতরে নেতৃত্বের ভারসাম্যও বদলে যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমলে জার্মানি, ফ্রান্স বা অন্যান্য বড় ইউরোপীয় শক্তির ভূমিকা বাড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, নেটো দুর্বল হলে তা শুধু ইউরোপ নয়, বৈশ্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকেও প্রভাবিত করবে। কারণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে এই জোট পশ্চিমা নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে কাজ করে আসছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেটো নিয়ে অসন্তোষ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রতিরক্ষা ব্যয়, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং জোটের ভবিষ্যৎ—সবকিছু মিলিয়ে পরিস্থিতি অত্যন্ত সংবেদনশীল।
বর্তমানে নেটো এখনও ঐক্যবদ্ধ থাকলেও অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য স্পষ্ট হয়ে উঠছে। আগামী মার্কিন নির্বাচন এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে এই জোটের ভবিষ্যৎ পথ।
একথা নিশ্চিত—ট্রাম্পের বক্তব্য শুধু রাজনৈতিক বিতর্ক নয়, বরং পশ্চিমা বিশ্বের নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।






