রণবীর সিং অভিনীত বহু প্রতীক্ষিত চলচ্চিত্র ‘ধুরন্ধর’ মুক্তির আগেই প্রবল বিতর্কে জড়িয়ে পড়ল। অ্যাকশন-থ্রিলার ঘরানার এই ছবির ট্রেলার প্রকাশের পর থেকেই পাকিস্তানে ক্ষোভ বাড়ছে। কারণ ছবির এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র নাকি অনুকরণ করেছে করাচির নিহত পুলিশ অফিসার আলি রাজার জীবন, যা তাঁর পরিবার সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করছে।
সামনে এসে অভিযোগ তুলেছেন আলি রাজার বিধবা—তিনি দাবি করেছেন, ছবিতে তাঁর স্বামীর জীবন ও চরিত্রকে বিকৃত, অতিরঞ্জিত এবং বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, ছবির ট্রেলারে দেখানো কিছু দৃশ্য নাকি তাঁর স্বামীর স্মৃতিকে অসম্মান করছে। তিনি প্রকাশ্যে জানিয়েছেন—এই ঘটনায় তিনি আইনি পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত।
এদিকে নির্মাতা সংস্থা ও বলিউডের অভ্যন্তরে এই অভিযোগ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। কেউ বলছেন এটি সম্পূর্ণ কাকতালীয় চরিত্র নির্মাণ, আবার কারও মতে পাকিস্তানে সংবেদনশীল পরিস্থিতি মাথায় রেখেই নির্মাতাদের আরও সতর্ক হওয়া উচিত ছিল। এর মধ্যে বিতর্ককে আরও উস্কে দিয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার তীব্র প্রতিক্রিয়া।
বলিউডে বিতর্ক নতুন কিছু নয়, তবে এবার অভিযোগের ধরন অত্যন্ত সংবেদনশীল। এক মৃত পুলিশ আধিকারিকের পরিচয় এবং তাঁর পরিবারের আবেগের সঙ্গে বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ফলে ‘ধুরন্ধর’ মুক্তির আগেই আন্তর্জাতিক স্তরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
করাচি পুলিশের বিধবার অভিযোগ: ‘আমার স্বামীর স্মৃতিকে অপমান’

বিধবার দাবি, ‘ধুরন্ধর’-এর কেন্দ্রীয় খলচরিত্র বা অ্যামবিগিওয়াস পুলিশ অফিসারের নানা আচরণ ও সংলাপ তাঁর স্বামীর বাস্তব জীবনের সঙ্গে ভয়ঙ্করভাবে মিল। তিনি অভিযোগ করেছেন যে, তাঁর অনুমতি ছাড়াই চলচ্চিত্রটি তাঁদের ব্যক্তিগত ইতিহাস ব্যবহার করেছে—এটি নৈতিকতার পরিপন্থী।
তিনি আরও বলেছেন, তাঁর স্বামী পাকিস্তানের মাটিতে কর্তব্যরত অবস্থায় প্রাণ দিয়েছেন। দেশে তাঁকে সম্মান দেওয়া হয়। অথচ বলিউডের একটি বড় বাজেটের ছবি তাঁকে বিকৃত চরিত্রে উপস্থাপন করছে। তাঁর বক্তব্য, “হিরোকে শক্তিশালী দেখানোর জন্য আমার স্বামীর সম্মান নষ্ট করা হলে আমি নীরব থাকব না।”
পাকিস্তানের সামাজিক মাধ্যমে এই অভিযোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগেনি। বহু মানুষ বলছেন, আন্তর্জাতিক সিনেমায় দক্ষিণ এশিয়ার সুরক্ষা বাহিনীকে নেতিবাচকভাবে দেখানোর প্রবণতা বেড়েছে। কেউ কেউ ভারতের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েনকেও এই বিতর্কের পেছনে কারণ হিসেবে দেখছেন।
নির্মাতাদের প্রতিক্রিয়া: ‘চরিত্রটি কল্পিত, বাস্তব কারও সঙ্গে সম্পর্ক নেই’

প্রযোজক সংস্থা এবং পরিচালকের পক্ষ থেকে অবশ্য পরিষ্কার বার্তা এসেছে—ছবির কাহিনি সম্পূর্ণ কল্পিত, কোনো বাস্তব ব্যক্তির সঙ্গে মিল থাকলে তা নিছকই কাকতালীয়। তাঁরা জোর দিয়ে বলেছেন, ছবির স্ক্রিনপ্লে একাধিক আইনি পরামর্শকের পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে গেছে।
তবে অনেক ফিল্ম বিশ্লেষকের মতে, কেবল ‘কাকতালীয়’ বললেই দায় ঝেড়ে ফেলা যায় না। পাকিস্তানে নিহত পুলিশ অফিসারের ঘটনাটি যেভাবে আলোচিত হয়েছিল, তাতে চলচ্চিত্রের চরিত্রের সঙ্গে কিছু ভিজ্যুয়াল ও পরিস্থিতিগত মিল তৈরি হয়েছে বলেই মনে করছেন তাঁরা। বিশেষত সোশ্যাল মিডিয়ায় তুলনা করে পোস্ট করা ছবিগুলিই এখন বিতর্কের প্রধান জ্বালানি।
বলিউডের অভ্যন্তরে বেশ কিছু সূত্র বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারের কথা মাথায় রেখে নির্মাতারা হয়তো শীঘ্রই একটি সংশোধিত বিবৃতি দিতে পারেন। বিতর্ক প্রশমনের জন্য ট্রেলারেও কিছু পরিবর্তন আনার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
রণবীর সিংয়ের নীরবতা: সচেতন কৌশল নাকি চাপের ফল?

এই মুহূর্তে পুরো বিতর্কের সবচেয়ে লক্ষণীয় দিক—রণবীর সিং এখনও একটি শব্দও বলেননি। তাঁর নীরবতাকে অনেকেই সচেতন পিআর কৌশল বলে মনে করছেন। কারণ তিনি জানেন, যে কোনো মন্তব্য পরিস্থিতিকে আরও অগ্নিগর্ভ করে তুলতে পারে।
রণবীরের ঘনিষ্ঠ মহল বলছে, অভিনেতার পক্ষে এই মুহূর্তে মন্তব্য করা ঝুঁকিপূর্ণ। ছবির প্রচার শুরু হলেও বিতর্ক তুঙ্গে, ফলে তিনি অপেক্ষা করছেন প্রযোজনার তরফে বড় পরিসরের প্রতিক্রিয়া আসা পর্যন্ত। রণবীরের আগের কিছু ছবি নিয়েও বিভিন্ন সময়ে রাজনীতি-সংক্রান্ত ক্ষোভ দেখা গিয়েছিল—এই অভিজ্ঞতার কারণেই অভিনেতা এবার আরও হিসেবি ও সতর্ক।
অন্যদিকে পাকিস্তানের মিডিয়া ইতিমধ্যেই রণবীরকে আক্রমণের লক্ষ্য করছে। তাদের বক্তব্য—হাই-প্রোফাইল বলিউড স্টাররা প্রায়ই প্রতিবেশী দেশের চরিত্রকে ভুলভাবে উপস্থাপন করেন। এই মন্তব্যগুলি আরও চাপ বাড়াচ্ছে।
‘ধুরন্ধর’ একটি কমার্শিয়াল অ্যাকশন থ্রিলার—এই কথাই বারবার বলছে নির্মাতা দল। কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, পুলিশ বাহিনীর সম্মান, এবং ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডির বিষয় জড়িত থাকলে তা নিছক বিনোদনের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকে না। করাচির নিহত পুলিশ অফিসারের বিধবার অভিযোগ প্রমাণ করে—সিনেমার প্রভাব সীমান্ত পেরিয়ে আবেগ, রাজনীতি এবং নৈতিকতার সংলাপে পৌঁছে যায়।
ছবিটি মুক্তির আগে নির্মাতা দল কী পরিবর্তন আনে, কিংবা পাকিস্তানের পরিবারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক আইনি নোটিশ পাঠানো হয় কিনা—এগুলি এখন কেন্দ্রীয় প্রশ্ন। একেই বলে চলচ্চিত্র মুক্তির আগেই স্বতন্ত্র ‘ড্রামা’। তবে এই বিতর্ক কতটা প্রভাব ফেলবে ছবির বক্স অফিস সম্ভাবনায়—সেই উত্তর দেবে সময়ই।






