আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি নাগরিকবান্ধব পরিষেবা দেওয়াই আধুনিক পুলিশ ব্যবস্থার অন্যতম লক্ষ্য। সেই ভাবনা থেকেই এবার থানাগুলিতে তৈরি করা হচ্ছে র্যাম্প, যাতে সিনিয়র সিটিজেন এবং বিশেষভাবে সক্ষম নাগরিকরা সহজে প্রবেশ করতে পারেন।
দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ ছিল, অধিকাংশ থানায় সিঁড়ি ছাড়া বিকল্প ব্যবস্থা নেই। ফলে হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী, লাঠি নিয়ে চলাফেরা করা প্রবীণ ব্যক্তি কিংবা শারীরিক প্রতিবন্ধকতায় ভোগা মানুষদের থানায় পৌঁছনোই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াত।
এই বাস্তব সমস্যাকে গুরুত্ব দিয়ে প্রশাসন একাধিক থানায় র্যাম্প নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। শুধু র্যাম্প নয়, ধীরে ধীরে গড়ে তোলা হচ্ছে ‘অ্যাক্সেসিবল পুলিশ স্টেশন’ মডেল।
নাগরিক পরিষেবা ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্তির এই পদক্ষেপকে সামাজিক দায়বদ্ধতার বড় উদাহরণ বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
থানায় র্যাম্প: প্রবীণ ও বিশেষভাবে সক্ষমদের জন্য সহজ প্রবেশাধিকার

নতুন করে নির্মিত র্যাম্পগুলি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে তৈরি করা হচ্ছে বলে প্রশাসনের দাবি। ঢালু কোণ, স্লিপ-প্রুফ পৃষ্ঠ এবং হ্যান্ডরেল—সবকিছুই রাখা হচ্ছে বিশেষভাবে সক্ষমদের কথা ভেবে।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রথম পর্যায়ে শহরাঞ্চলের ব্যস্ত থানাগুলিতে এই ব্যবস্থা চালু হয়েছে। পরবর্তী ধাপে গ্রামীণ ও মহকুমা স্তরের থানাগুলিতেও একই ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।
এই উদ্যোগের ফলে প্রবীণ নাগরিকদের থানায় অভিযোগ জানাতে বা আইনি সহায়তা নিতে আর শারীরিক কষ্ট সহ্য করতে হবে না। নাগরিক পরিষেবা ব্যবস্থায় এটি এক বড় পরিবর্তন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আইন সবার জন্য সমান হলেও পরিকাঠামো যদি সমান সুযোগ না দেয়, তবে সেই ন্যায়বিচার পূর্ণতা পায় না। র্যাম্প নির্মাণ সেই অসমতা দূর করারই একটি পদক্ষেপ।
অ্যাক্সেসিবল পুলিশ স্টেশন: শুধু র্যাম্প নয়, আরও সুবিধা

র্যাম্পের পাশাপাশি থানাগুলিতে আলাদা ‘সিনিয়র সিটিজেন হেল্প ডেস্ক’ চালু করার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। এখানে প্রশিক্ষিত কর্মীরা প্রবীণদের অভিযোগ গ্রহণ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করবেন।
বিশেষভাবে সক্ষম নাগরিকদের জন্য ব্রেইল সাইনেজ, বড় অক্ষরের নির্দেশিকা বোর্ড এবং বসার উপযুক্ত ব্যবস্থা রাখার কথাও ভাবা হচ্ছে। কিছু থানায় ইতিমধ্যেই পরীক্ষামূলকভাবে এই পরিষেবা শুরু হয়েছে।
পুলিশ আধিকারিকদের মতে, নাগরিকবান্ধব থানা গড়ে তুলতে হলে শুধু আইন প্রয়োগ নয়, সহানুভূতিশীল আচরণও জরুরি। তাই কর্মীদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে যাতে তাঁরা প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সঙ্গে সংবেদনশীল আচরণ করেন।
এই উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে পুলিশি ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা বাড়াবে বলেই মনে করা হচ্ছে।
সামাজিক অন্তর্ভুক্তি ও মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ

ভারতে প্রতিবন্ধী অধিকার আইন অনুযায়ী সরকারি ভবনগুলিকে ধাপে ধাপে অ্যাক্সেসিবল করে তোলার নির্দেশ রয়েছে। থানাগুলিতে র্যাম্প নির্মাণ সেই আইনি কাঠামোর সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সামাজিক অন্তর্ভুক্তির ধারণা বলছে, পরিকাঠামো এমন হওয়া উচিত যাতে সব নাগরিক সমানভাবে পরিষেবা পেতে পারেন। প্রবীণ নাগরিকদের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য।
সমাজবিদদের মতে, এই উদ্যোগ কেবল অবকাঠামোগত পরিবর্তন নয়; এটি প্রশাসনের মানসিকতারও পরিবর্তন। পুলিশ স্টেশন আর ভয়ের জায়গা নয়, বরং সহায়তার কেন্দ্র—এই বার্তাই দিতে চাইছে প্রশাসন।
নাগরিক সমাজের একাংশ এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে বলেছে, ভবিষ্যতে আদালত, হাসপাতাল ও অন্যান্য সরকারি অফিসেও একই ধরনের ব্যবস্থা জোরদার করা উচিত।
সিনিয়র সিটিজেন ও বিশেষভাবে সক্ষমদের জন্য থানায় র্যাম্প নির্মাণ নিছক অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়; এটি মানবিকতা ও অন্তর্ভুক্তির প্রতীক। নাগরিক পরিষেবা ব্যবস্থায় সমান সুযোগ নিশ্চিত করার পথে এটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
যদি পরিকল্পনা অনুযায়ী সব থানায় এই সুবিধা চালু হয়, তবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি জনবান্ধব প্রশাসনের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। আধুনিক, সংবেদনশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পুলিশ ব্যবস্থাই আগামী দিনের লক্ষ্য—এই উদ্যোগ সেই পথেই বড় পদক্ষেপ।






