টাটা সন্স–এর অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন আবারও সামনে এনে দিলেন টাটা ট্রাস্টস-এর জ্যেষ্ঠ ট্রাস্টি বিজয় সিংহ। সম্প্রতি তিনি দাবি করেছেন, টাটা সন্স থেকে তাঁর অপসারণ কোনও আকস্মিক সিদ্ধান্ত ছিল না; বরং এটি ছিল “আগে থেকেই পরিকল্পিত ও সংগঠিত” একটি প্রক্রিয়া। তাঁর কথায়, অপসারণের পুরো ঘটনাটিই চালানো হয়েছিল একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে।
কর্পোরেট ভারতের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ গ্রুপগুলির একটিতে এ ধরনের প্রকাশ্য অভিযোগ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ টাটা গ্রুপের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত, ক্ষমতার ভারসাম্য ও পরিচালন কাঠামো বহুদিন ধরেই আলোচনার কেন্দ্রে। এমন অবস্থায় এক উচ্চপদস্থ ট্রাস্টির এই মন্তব্য পুরো বিষয়টিকে আরও জটিল করছে।
বিজয় সিংহ মনে করেন, তাঁর অপসারণের ঘটনায় স্বচ্ছতার ঘাটতি ছিল। তদন্ত, রিপোর্ট বা মতামত নেওয়ার মতো কোনও প্রক্রিয়া ছাড়াই তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয়, যা প্রতিষ্ঠানের নৈতিক মানদণ্ডের সঙ্গে খাপ খায় না বলে দাবি তাঁর। এই অভিযোগ কর্পোরেট গভর্নেন্সের দিক থেকেও জরুরি প্রশ্ন তুলছে।
এদিকে টাটা সন্স–এর তরফে এখনো পর্যন্ত কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে কর্পোরেট মহল মনে করছে, এই ঘটনার ছায়া গ্রুপের দীর্ঘমেয়াদি কার্যপদ্ধতির ওপর পড়তে পারে।
বিতর্কের সূত্রপাত: কেন উত্তপ্ত হচ্ছে টাটা সন্স বোর্ডরুম?

বিজয় সিংহের অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে টাটা সন্স বোর্ডের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার পদ্ধতি। তাঁর বক্তব্য, বোর্ডের একটি অংশ আগে থেকেই একটি নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছে গিয়েছিল, এবং তাঁকে সরানোর কার্যক্রমটি ছিল তারই ফলাফল।
কিছু শিল্প–বিশ্লেষকের মতে, টাটা ট্রাস্টস এবং টাটা সন্স বোর্ডের মধ্যে ক্ষমতার প্রয়োগ নিয়ে চাপা অসন্তোষ বহুদিনের। বিশেষত গুরুত্বপূর্ণ নীতি নির্ধারণ বা কৌশলগত বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দুটি পক্ষের মতবিরোধ গোষ্ঠীটিকে আগেও বিব্রত অবস্থায় ফেলেছিল। বিজয় সিংহের মন্তব্য সেই পুরনো ক্ষতকেই আবার উস্কে দিয়েছে।
এছাড়াও, কর্পোরেট বোর্ডে স্বচ্ছতা ও যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ—এই বিষয়গুলো এখন আন্তর্জাতিক মানেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে একজন ট্রাস্টির এমন অভিযোগ বোর্ডের সিদ্ধান্ত গ্রহণের নৈতিকতার ওপর সরাসরি প্রশ্ন তোলে।
সিংহ প্রশ্ন তুলেছেন, কেন তাঁকে যথাযথ ব্যাখ্যা না দিয়েই সরানো হল? কেন একটি অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন বা শৃঙ্খলাভঙ্গের উল্লেখও বোর্ডের সিদ্ধান্তে ছিল না? এসব প্রশ্নের উত্তর না পাওয়ায় গ্রুপের গভার্ন্যান্স নিয়ে নতুন বিতর্ক জন্ম নিয়েছে।
টাটা ট্রাস্টস বনাম টাটা সন্স: অন্তর্দ্বন্দ্বের দীর্ঘ ইতিহাস

টাটা ট্রাস্টস টাটা সন্স–এর প্রায় দু’তৃতীয়াংশ শেয়ার ধারণ করে, ফলে বহু বড় সিদ্ধান্তে ট্রাস্টসের ভূমিকা অত্যন্ত প্রভাবশালী। আর ঠিক এখানেই শুরু হয় দ্বন্দ্বের মূল।
অনেকেই মনে করছেন—
বোর্ড মিটিং, কোম্পানির দিকনির্দেশনা ও কৌশলগত বিষয়ে টাটা ট্রাস্টস এবং টাটা সন্স–এর পরিচালনা পর্ষদের মধ্যে মতবিরোধ মাঝে মাঝেই প্রকাশ পেয়েছে। বিশেষত সেই সময় যখন শীর্ষ নেতৃত্ব বদলের সিদ্ধান্ত বা বড় বিনিয়োগের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে ভোটাভুটি হয়েছে।
বিজয় সিংহের মন্তব্য অনুসারে, ট্রাস্টসের কিছু সদস্যকে ইচ্ছাকৃতভাবে টার্গেট করা হচ্ছিল। এমনকি তিনি ইঙ্গিত দেন, প্রতিষ্ঠানের ভিতরে সিদ্ধান্ত–প্রক্রিয়াকে নির্দিষ্ট এক পক্ষ নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাইছিল।
কর্পোরেট মহল এই পরিস্থিতিকে “পাওয়ার সেন্টার দ্বন্দ্ব” হিসেবে দেখছে। বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠীগুলিতে নেতৃত্ব, নীতি নির্ধারণ ও ক্ষমতার বিভাজন নিয়ে মতবিরোধ নতুন নয়; তবে টাটা গ্রুপের মতো ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানে এই ধরনের প্রকাশ্য অভিযোগ বিরল।
বিভিন্ন অর্থনীতিবিদের মতে, নেতৃত্বের পর্যায়ে সামান্য অসঙ্গতি থাকলেও তা সংযতভাবে মিটিয়ে ফেলারই রীতি ছিল টাটা–পরিবেশে। সিংহের অভিযোগ সেই প্রচলিত ইমেজকেই চ্যালেঞ্জ করছে।
অপসারণের পরে কী? সামনে কোন পথে এগোবে টাটা গ্রুপ?

বিজয় সিংহের অভিযোগ সামনে আসার পর কর্পোরেট দুনিয়ায় একটাই প্রশ্ন—এতে টাটা গ্রুপের ভবিষ্যৎ কৌশল কতটা প্রভাবিত হবে?
প্রথমত, গভার্ন্যান্স সংক্রান্ত প্রশ্ন উঠলে বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থা নড়ে। আজকের গ্লোবাল মার্কেটে শেয়ারহোল্ডাররা নীতি ও স্বচ্ছতাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেন। টাটা গ্রুপের মতো বহুজাতিক গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে এই বিষয়গুলো আরও বেশি গুরুত্ব বহন করে।
দ্বিতীয়ত, অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ অনেক সময় বড় সিদ্ধান্তে বিলম্ব ঘটায়। নতুন প্রকল্পে অনুমোদন, বিনিয়োগ বা নেতৃত্ব নির্বাচনে যদি মতের বিভাজন তৈরি হয়, তবে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে ব্যবসায়িক গতি ও প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে।
তৃতীয়ত, টাটা গ্রুপ ইতিমধ্যে অটোমোবাইল, আইটি, স্টিল, এয়ারলাইন্স–সহ বহু গুরুত্বপূর্ণ খাতে রূপান্তরের পর্যায়ে। এই মুহূর্তে নেতৃত্বে স্থিতাবস্থা ও বোর্ডের সুষম সিদ্ধান্ত অত্যন্ত জরুরি। সিংহের অভিযোগ দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় ‘বিভ্রান্তির ছায়া’ ফেলতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের একাংশের মত।
বিভিন্ন বিশ্লেষক মনে করেন, পরিস্থিতি সামাল দিতে টাটা সন্সের উচিত দ্রুত ও স্বচ্ছ ব্যাখ্যা প্রদান করা। না হলে এই ঘটনা কর্পোরেট ব্র্যান্ড ইমেজেও নেগেটিভ প্রভাব ফেলতে পারে।
বিজয় সিংহের দাবি টাটা গ্রুপের অভ্যন্তরীণ থিতু অবস্থাকে আবারও আলোচনায় এনেছে। যদিও গ্রুপের ভিতরে মতভেদ নতুন নয়, কিন্তু একজন শীর্ষ পরামর্শদাতার এই অভিযোগ নীতি, স্বচ্ছতা এবং ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে।
এখন নজর থাকবে টাটা সন্সের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ার দিকে। যদি গ্রুপ পরিষ্কার ব্যাখ্যা দিতে সক্ষম হয়, তবে বিতর্ক থামতে পারে। নইলে এই ঘটনাই ভবিষ্যতে কর্পোরেট গভর্ন্যান্স নিয়ে আরও বড় আলোচনার সূচনা করতে পারে।






