হরিয়ানার নুহ জেলায় ঈদ-উল-আজহার নামাজ শেষ হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই দুই গ্রামে হিংসাত্মক সংঘর্ষের ঘটনা ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, পৃথক দুটি ঘটনায় অন্তত ১২ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর বলে হাসপাতাল সূত্রে খবর।
প্রশাসনের দাবি, সংঘর্ষের পেছনে সাম্প্রদায়িক কারণ নয়, বরং দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত ও স্থানীয় বিরোধ কাজ করেছে। তবে উৎসবের দিন এমন ঘটনা সামনে আসায় এলাকায় আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ঈদের নামাজ শেষে গ্রামবাসীরা বাড়ি ফেরার সময় দুই পক্ষের মধ্যে বচসা শুরু হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই সেই বচসা বড় আকার ধারণ করে এবং সংঘর্ষে রূপ নেয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, উভয় পক্ষই একে অপরের দিকে পাথর ছোড়ে এবং লাঠি ও ধারালো অস্ত্র ব্যবহার করে।
নুহ জেলা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একাধিকবার উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। ফলে এই নতুন সংঘর্ষ প্রশাসনের জন্য বাড়তি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পুলিশ পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং ভবিষ্যতে যাতে কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, সেদিকে বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে।
নিজামপুর গ্রামে পুরনো পঞ্চায়েত বিরোধ ঘিরে সংঘর্ষ

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে নুহ জেলার নিজামপুর গ্রামে। প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে যে পুরনো পঞ্চায়েত নির্বাচন সংক্রান্ত বিরোধ থেকেই নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়। ঈদের নামাজ শেষে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীর মধ্যে তর্কাতর্কি শুরু হলে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, দুই পক্ষের মধ্যে বহুদিন ধরেই রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব বিস্তার নিয়ে মতবিরোধ চলছিল। সেই পুরনো বিরোধই উৎসবের দিনে নতুন করে বিস্ফোরিত হয়। সংঘর্ষ চলাকালীন গ্রামজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং বহু পরিবার নিজেদের বাড়ির ভিতরে আশ্রয় নেয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, দুই গোষ্ঠী একে অপরের দিকে পাথর ছোড়ে। পাশাপাশি লাঠি ও কুঠারের মতো অস্ত্রও ব্যবহার করা হয় বলে অভিযোগ। সংঘর্ষে অন্তত ছয়জন আহত হন। খবর পেয়ে আকেরা থানার পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
তবে আশ্চর্যের বিষয়, ঘটনার পরও কোনও পক্ষ এখনও আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করেনি। পুলিশ জানিয়েছে, অভিযোগ জমা পড়লে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আপাতত পরিস্থিতি শান্ত থাকলেও প্রশাসন সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
সিঙ্গার গ্রামেও পুরনো শত্রুতার জেরে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ

একই দিনে নুহ জেলার সিঙ্গার গ্রামেও আরেকটি সংঘর্ষের ঘটনা সামনে আসে। পুলিশ জানিয়েছে, এই ঘটনাটিও দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত শত্রুতা থেকে শুরু হয়েছিল। প্রথমে সামান্য কথা কাটাকাটি হলেও পরে তা হিংসাত্মক রূপ নেয়।
সংঘর্ষে অন্তত আরও ছয়জন আহত হন। এলাকাবাসীর অভিযোগ, পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল যে কিছু সময়ের জন্য গোটা গ্রামজুড়ে আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়। স্থানীয় ব্যবসা ও দৈনন্দিন কাজকর্মও সাময়িকভাবে ব্যাহত হয়।
বিছোর থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে উভয় পক্ষকে ছত্রভঙ্গ করে। প্রশাসনের তরফে দ্রুত হস্তক্ষেপ না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারত বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, আহতদের পুন্হানা কমিউনিটি হেলথ সেন্টারে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকদের মতে, আহতদের মধ্যে একজনের মাথায় গুরুতর আঘাত লেগেছে এবং তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য নালহারের শহিদ রাজা হাসান খান মেওয়াতি মেডিক্যাল কলেজে স্থানান্তর করা হয়েছে।
নুহে আইনশৃঙ্খলা নিয়ে নতুন প্রশ্ন, প্রশাসনের কড়া নজর

এই ঘটনা নতুন করে নুহ জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। গত কয়েক বছরে বিভিন্ন কারণে এই জেলা জাতীয় সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে এসেছে। ফলে সামান্য উত্তেজনাও প্রশাসনের কাছে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রামীণ এলাকায় দীর্ঘদিনের সামাজিক ও রাজনৈতিক বিরোধ অনেক সময় উৎসব বা বড় জনসমাগমের সময় হঠাৎ করে সামনে চলে আসে। তাই শুধুমাত্র পুলিশি ব্যবস্থা নয়, স্থানীয় স্তরে শান্তি ও সংলাপ বজায় রাখাও জরুরি।
পুলিশ বর্তমানে এলাকায় টহল বাড়িয়েছে এবং গুজব রুখতে সোশ্যাল মিডিয়ার ওপরও নজরদারি চালানো হচ্ছে। প্রশাসনের তরফে সাধারণ মানুষকে শান্ত থাকার আবেদন জানানো হয়েছে। পাশাপাশি কোনও উসকানিমূলক তথ্য ছড়ালে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় নেতৃত্বের একাংশও শান্তি বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, বিচ্ছিন্ন ঘটনার কারণে এলাকার সামগ্রিক সম্প্রীতির পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া উচিত নয়।
ঈদের মতো গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসবের দিনে নুহ জেলার দুটি গ্রামে সংঘর্ষের ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ বাড়িয়েছে। যদিও প্রশাসনের দাবি, এর পেছনে কোনও সাম্প্রদায়িক কারণ নেই এবং পুরনো ব্যক্তিগত বিরোধই মূল কারণ, তবুও ঘটনাটি স্থানীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে।
পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছে এবং আহতদের চিকিৎসা চলছে। তবে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা এড়াতে প্রশাসন, স্থানীয় নেতৃত্ব এবং সাধারণ মানুষের সমন্বিত উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। শান্তি ও সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখাই এখন নুহ জেলার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।






