বাংলা সিনেমায় শিশুদের দৃষ্টিভঙ্গি, তাদের নির্দোষ আবেগ এবং সরল সত্যকে বছরের পর বছর ধরে নতুন করে ব্যাখ্যা করে চলেছেন খ্যাতনামা পরিচালক জুটি নন্দিতা রায় ও শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। শিশু দিবসের বিশেষ উপলক্ষে তারা আবারও স্মরণ করলেন—কীভাবে শিশু অভিনেতাদের সঙ্গে কাজ করা তাদের ক্যারিয়ার এবং বাংলা সিনেমার গল্প বলার পদ্ধতিকে অসাধারণভাবে সমৃদ্ধ করেছে।
রামধনু, হাঁমি, হাঁমি ২ থেকে শুরু করে পোস্ত, কণ্ঠ ও প্রাক্তন—প্রতি ছবিতেই শিশু চরিত্ররা গল্পের আবেগী মেরুদণ্ড হয়ে থেকেছে। তাদের স্বাভাবিক, অকপট, অনাবিল অভিনয়ই পরিচালক জুটির সিনেমাকে আলাদা অবস্থানে তুলে ধরেছে।
শিশুদের সত্য ও দৃষ্টিভঙ্গি: নন্দিতা-শিবপ্রসাদের গল্প বলার মূল শক্তি
শৈশব মানেই অমলিন সততা, অনাবিল কল্পনা আর এমন এক দৃষ্টিভঙ্গি যা বড়দের চোখ এড়িয়ে যায়। নন্দিতা রায় ও শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বছরের পর বছর ধরে এই ‘শিশুর চোখে দেখা পৃথিবী’—কেই পর্দায় তুলে ধরেছেন।

তাদের বক্তব্যে উঠে এসেছে—
“শিশুদের জগতের স্বতঃস্ফূর্ততা, সত্য ও বিস্ময় আমাদের সবসময় টানে। রামধনু, হাঁমি ও হাঁমি ২—এই ছবিগুলো আমাদের সেই পথেই নিয়ে গেছে। শিশুদের মাধ্যমে আমরা নিজেদেরকেও নতুন করে দেখি।”
রামধনু-তে স্কুল অ্যাডমিশনের দুশ্চিন্তা, হাঁমি-তে বন্ধুত্ব ও ভুল বোঝাবুঝির সরলতা, হাঁমি ২-এ পরিবারের আবেগ—প্রতিটি গল্পই শিশুদের অদ্ভুত অথচ বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গিতে নির্মিত।
এই সিনেমাগুলো শুধু শিশু চরিত্র নিয়েই নয়, বরং সমাজ, শিক্ষা-ব্যবস্থা ও মানবিক সম্পর্ককে শিশুদের সহজ-সরল লেন্সে দেখানোর সাহসী প্রচেষ্টা।
শিশু অভিনেতাদের সঙ্গে কাজ করার অনন্য অভিজ্ঞতা
নন্দিতা-শিবপ্রসাদের ছবি গুলোর বড় সাফল্য এসেছে শিশু অভিনেতাদের স্বাভাবিক অভিনয় থেকে। সেটে তারা শুধু অভিনয়ই শেখায় না, বরং পরিচালক দম্পতির ভাষায়—“শিশুরা আমাদের শেখায় আরও বেশি।”

তারা স্মরণ করলেন এক মধুর ঘটনা—
পোস্ত-র সেটে এক শিশু অভিনেতাকে কিংবদন্তী সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় প্রশংসা করেছিলেন। কিন্তু শিশুটির প্রতিক্রিয়া ছিল আরওও নিষ্পাপ—
“সৌমিত্রদাও ওই সিনে ভালো করেছে!”
এই মন্তব্যেই উঠে আসে শিশুর মনের নিষ্পাপ সমতা—
কোনো অহংকার নেই, কোনো ভয় নেই, শুধু সত্যের সহজ উচ্চারণ।
পরিচালক জুটির প্রায় সব ছবিতেই শিশু অভিনেতারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। প্রাক্তন, কণ্ঠ, পোস্ত—সব ক্ষেত্রেই তাদের অভিনয় গল্পের আবেগীয় ভারসাম্য তৈরি করেছে।
শিশুদের পরিপূর্ণ বিকাশে পরিচালকদের ভূমিকা: সেটের ভেতরে থাকে নিরাপদ পরিসর

শুধু সিনেমায় নয়, পর্দার আড়ালেও শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ, স্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি করতে বরাবরই গুরুত্ব দিয়েছেন নন্দিতা ও শিবপ্রসাদ। তাদের ‘ডিরেক্টরস রুম’ প্রায়ই শিশুদের খেলার জায়গা হয়ে ওঠে—
যেখানে তারা স্বাধীনভাবে প্রকাশ করতে পারে, improvise করতে পারে, এমনকি কখনও কখনও পুরো দৃশ্যের আবেগও ঠিক করে দিতে পারে।
শিল্প নির্দেশক, সহ-পরিচালক ও শিল্পীরা প্রায়ই মন্তব্য করেন—
“এই পরিচালক জুটির কাছে শিশুরা অভিনয় শিখতে আসে না—তারা গল্পের অংশ হয়ে ওঠে।”
এই বিশ্বাসই শিশুদের মন খুলে অভিনয় করতে সাহায্য করে।
ভবিষ্যৎ পথচলা: নতুন প্রজন্মের শিশু অভিনেতারা তৈরি করছে নতুন গল্প

Alt text: ভানুপ্রিয়া ভুতের হোটেল ছবিতে শিশু অভিনেতাদের অংশগ্রহণ
বাংলা সিনেমায় শিশুদের কেন্দ্র করে গল্প লেখা এখন আর শুধু পরীক্ষামূলক নয়—এটি নতুন ট্রেন্ড, নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিচ্ছে।
নন্দিতা রায় ও শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এই ধারার অন্যতম চালিকাশক্তি।
তাদের প্রযোজনায় আসছে ‘ভানুপ্রিয়া ভুতের হোটেল’, পরিচালনায় অরিত্র মুখোপাধ্যায়, লেখায় জিনিয়া সেন—যেখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকবে শিশুদেরই।
এই সিনেমাগুলো প্রমাণ করে—
শিশুরা শুধু চরিত্র নয়, তারা গল্পের সত্য, নৈতিকতা এবং আবেগের প্রধান বাহক।
উপসংহার
শিশু দিবসের এই বিশেষ আবহে নন্দিতা-শিবপ্রসাদের বার্তা শুধু সিনেমার জন্য নয়—এটি স্মরণ করিয়ে দেয়,
শিশুরা আমাদের সমাজের সবচেয়ে নির্মল, সত্য ও মানবিক প্রতিচ্ছবি।
তাদের চোখে পৃথিবী মানে—
- বেশি কল্পনা
- বেশি সত্য
- কম জটিলতা
- বেশি অনুভব
এ কারণেই তাদের অভিনয় পর্দাকে আরও জীবন্ত করে তোলে।
এই গল্পটি যদি ভালো লেগে থাকে, শেয়ার করুন এবং বাংলা সিনেমায় শিশুদের অবদান নিয়ে আপনার মতামত কমেন্টে জানাতে ভুলবেন না। আরও সিনেমা ও এন্টারটেইনমেন্ট সংক্রান্ত খবর পেতে আমাদের নিয়মিত অনুসরণ করুন।






