কলকাতার খাদ্যসংস্কৃতির মানচিত্রে যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান শুধু দোকান নয়, ইতিহাস—তাদের মধ্যে অন্যতম নাহুমস। নিউ মার্কেটের ভেতরে শতবর্ষী এই ইহুদি বেকারি বহু প্রজন্ম ধরে কেক, পেস্ট্রি, প্লাম কেক এবং ঐতিহ্যবাহী ইউরোপীয় বেকড পণ্যের মাধ্যমে শহরের স্মৃতির অংশ হয়ে উঠেছে। কিন্তু সেই নাহুমসই এবার কার্যত বন্ধ হওয়ার মুখে।
গ্যাস সংকটের কারণে নিয়মিত উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে বলে জানা গেছে। বেকারির চুল্লি, ওভেন এবং রান্নার যাবতীয় কাজ নির্ভর করে বাণিজ্যিক গ্যাস সরবরাহের উপর। সরবরাহ অনিয়মিত হয়ে পড়ায় প্রতিদিনের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, ফলে পরিষেবা চালু রাখা আর সম্ভব হচ্ছে না।
এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই কলকাতাবাসীর মধ্যে নস্টালজিয়া, উদ্বেগ এবং ক্ষোভ—তিনটিই একসঙ্গে দেখা যাচ্ছে। বহু মানুষ সামাজিক মাধ্যমে লিখছেন, “শুধু একটা দোকান নয়, আমাদের শৈশব বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।” ক্রিসমাসের সময় নাহুমসের কেক না হলে অনেক পরিবারের উৎসবই অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
নিউ মার্কেটের পুরনো ব্যবসায়ীরা বলছেন, গ্যাস সরবরাহ সমস্যাটি নতুন নয়, কিন্তু এবার পরিস্থিতি চরমে পৌঁছেছে। বিকল্প জ্বালানির ব্যবস্থা করা সহজ নয়, কারণ ঐতিহ্যবাহী বেকিংয়ের জন্য নির্দিষ্ট তাপমাত্রা ও ধারাবাহিকতা দরকার—যা ছাড়া সেই স্বাদ পাওয়া যায় না।
শতবর্ষের ঐতিহ্যের সামনে অনিশ্চয়তা

১৯০২ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বেকারি কলকাতার প্রাচীনতম খাদ্যপ্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে একটি। বাগদাদি ইহুদি পরিবার দ্বারা শুরু হওয়া এই দোকান ব্রিটিশ আমল থেকে আজ পর্যন্ত একই জায়গায় টিকে রয়েছে—যা নিজেই এক বিরল ঘটনা।
নাহুমস শুধু কেকের দোকান নয়; এটি কলকাতার বহুসাংস্কৃতিক ইতিহাসের প্রতীক। এখানে যেমন ক্রিসমাস কেকের ভিড় দেখা যায়, তেমনই পাসওভার বা অন্যান্য ইহুদি উৎসবেও বিশেষ খাবার প্রস্তুত করা হয়। শহরের অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান, আর্মেনিয়ান এবং ইহুদি সম্প্রদায়ের সঙ্গে এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
প্রজন্মের পর প্রজন্ম একই রেসিপি অনুসরণ করে তৈরি হয়েছে তাদের বিখ্যাত রিচ ফ্রুট কেক, মারজিপান, ব্রাউন ব্রেড এবং পেস্ট্রি। অনেকেই বলেন, “এই স্বাদ আর কোথাও নেই।” কারণ এতে শুধু উপাদান নয়, সময়ের ছাপ মিশে আছে।
কিন্তু বর্তমানে উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেলে সেই ঐতিহ্যও বিপন্ন হয়ে পড়বে। দোকান খোলা থাকলেও যদি পণ্য না থাকে, তবে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
গ্যাস সংকট কীভাবে থামিয়ে দিল চুল্লি

বড় বেকারি পরিচালনা করতে বিশাল পরিমাণ জ্বালানি দরকার হয়। নাহুমসের মতো পুরনো প্রতিষ্ঠানে এখনও ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে বেকিং হয়, যার জন্য দীর্ঘ সময় ধরে নির্দিষ্ট তাপমাত্রা বজায় রাখা জরুরি।
গ্যাস সরবরাহ অনিয়মিত হলে একদিকে উৎপাদন বন্ধ হয়, অন্যদিকে প্রস্তুত উপকরণ নষ্ট হয়ে যায়। ফলে আর্থিক ক্ষতিও বাড়ে। প্রতিদিনের কাঁচামাল—মাখন, ডিম, শুকনো ফল, ময়দা—সবই দ্রুত নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
বিকল্প হিসেবে বিদ্যুৎচালিত ওভেন ব্যবহার করা যেতে পারে, কিন্তু পুরনো অবকাঠামোতে তা স্থাপন করা সহজ নয়। উপরন্তু বিদ্যুৎ খরচও অত্যন্ত বেশি। ছোট বা মাঝারি ব্যবসার পক্ষে এটি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই সমাধান নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শহরের বহু রেস্তোরাঁ ও বেকারিই একই সমস্যায় ভুগছে। কিন্তু নাহুমসের ক্ষেত্রে বিষয়টি বেশি আলোচনায় এসেছে কারণ এটি একটি ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠান।
কলকাতার আবেগে ধাক্কা

নাহুমসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসংখ্য ব্যক্তিগত স্মৃতি। কেউ এখানে প্রথম জন্মদিনের কেক কিনেছেন, কেউ বিয়ের কেক, আবার কেউ বিদেশে যাওয়ার আগে শেষবারের মতো প্রিয় কেক নিয়ে গেছেন।
ক্রিসমাসের সময় দোকানের সামনে দীর্ঘ লাইন কলকাতার পরিচিত দৃশ্য। বহু মানুষ ভোর থেকে দাঁড়িয়ে থাকেন শুধু সেই বিখ্যাত প্লাম কেক পাওয়ার জন্য। এই অভিজ্ঞতা শহরের উৎসব সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে।
বেকারির কর্মীরাও উদ্বিগ্ন। অনেকেই দশকের পর দশক এখানে কাজ করছেন। উৎপাদন বন্ধ হলে তাদের জীবিকাও প্রশ্নের মুখে পড়বে।
সামাজিক মাধ্যমে বহু মানুষ প্রশাসনের হস্তক্ষেপ দাবি করছেন। কেউ বলছেন, “এটি শুধু ব্যবসা নয়, হেরিটেজ—সংরক্ষণ করা উচিত।” কেউ আবার বিকল্প জ্বালানির জন্য বিশেষ অনুমতির দাবি তুলেছেন।
নাহুমসের সম্ভাব্য বন্ধ হয়ে যাওয়া কলকাতার জন্য শুধু একটি দোকান হারানো নয়—একটি যুগের অবসান। শহরের পরিচয়, ইতিহাস এবং বহুসাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই প্রতিষ্ঠান যদি সত্যিই পরিষেবা বন্ধ করে দেয়, তবে তা সাংস্কৃতিক ক্ষতির সমান।
গ্যাস সংকট সাময়িক হলেও এর প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। এখন প্রশ্ন একটাই—এই শতবর্ষী বেকারিকে কি বাঁচানো যাবে? নাকি নিউ মার্কেটের ভেতরে একদিন শুধু স্মৃতি হয়ে থাকবে নাহুমসের নাম?
কলকাতাবাসী অপেক্ষায়—চুল্লি আবার জ্বলবে, নাকি ইতিহাসের পাতা উল্টে যাবে চিরতরে।






