বাংলার নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে উত্তাল রাজ্য-রাজনীতি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরাসরি সুপ্রিম কোর্ট-এর দ্বারস্থ হলেন রাজ্য নির্বাচন সংস্থা কর্তৃক প্রস্তাবিত SIR (Special Intensive Revision) ভোটার তালিকা প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে। মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ, এই সংশোধনী উদ্যোগে গণতান্ত্রিক অধিকার ক্ষুণ্ণ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকা সংশোধন একটি নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া হলেও, SIR ঘিরে যে রাজনৈতিক উত্তাপ তৈরি হয়েছে, তা এই ইস্যুকে প্রশাসনিক গণ্ডি ছাড়িয়ে সাংবিধানিক প্রশ্নে পরিণত করেছে। তৃণমূল কংগ্রেসের দাবি—এই পদ্ধতিতে বৈধ ভোটারদের নাম বাদ পড়ার ঝুঁকি রয়েছে, যা নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্রকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই পদক্ষেপ কেবল আইনি লড়াই নয়, বরং কেন্দ্র-রাজ্য এবং প্রশাসন-রাজনীতির টানাপোড়েনের এক নতুন অধ্যায়। রাজ্যের শাসকদল একে ‘ভোটাধিকার রক্ষার লড়াই’ হিসেবে দেখালেও বিরোধীদের মতে, এটি রাজনৈতিক চাপ তৈরির কৌশল।
এই পরিস্থিতিতে সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ কতটা দিকনির্দেশ দেবে এবং ভোটার তালিকা সংশোধনের ভবিষ্যৎ রূপরেখা কী হবে—সেদিকেই তাকিয়ে গোটা দেশ।
SIR ভোটার তালিকা কী এবং কেন বিতর্কের কেন্দ্রে

SIR বা Special Intensive Revision মূলত ভোটার তালিকার গভীর যাচাই প্রক্রিয়া। এর মাধ্যমে বাড়ি-বাড়ি যাচাই, নথি মিলিয়ে দেখা এবং ভোটারের অস্তিত্ব নিশ্চিত করার কথা থাকে। উদ্দেশ্য একটাই—ভুয়ো ভোটার বাদ দেওয়া এবং তালিকাকে আরও নির্ভুল করা।
তবে পশ্চিমবঙ্গে এই প্রক্রিয়া ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে তার সময় ও পদ্ধতি নিয়ে। শাসকদলের অভিযোগ, হঠাৎ করে ব্যাপক আকারে SIR চালু হলে বহু প্রকৃত ভোটারের নাম বাদ পড়তে পারে, বিশেষত পরিযায়ী শ্রমিক, সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে।
রাজ্য সরকারের যুক্তি, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে যদি গণহারে নাম কাটছাঁট হয়, তাহলে তা নির্বাচনী সমতার নীতির পরিপন্থী। এই কারণেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে রাজ্য সরকার বিষয়টিকে সাংবিধানিক গুরুত্ব দিয়ে দেখছে।
সুপ্রিম কোর্টে মামলার আইনি ও সাংবিধানিক দিক
সুপ্রিম কোর্টে দায়ের করা আবেদনে রাজ্য সরকারের মূল প্রশ্ন—SIR প্রক্রিয়া কি সংবিধানের অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নাগরিকের ভোটাধিকারকে ক্ষুণ্ণ করছে? ভোটাধিকারকে মৌলিক অধিকারের সমতুল্য ধরে নিয়ে আদালতের হস্তক্ষেপ চাওয়া হয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, আদালত যদি মনে করে যে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে বৈষম্যের সম্ভাবনা রয়েছে, তাহলে নির্বাচন সংস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও সীমিত নির্দেশিকা মানতে বলা হতে পারে। অতীতে ভোটার তালিকা, আধার সংযোগ এবং নাগরিক অধিকার সংক্রান্ত একাধিক মামলায় সুপ্রিম কোর্ট সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছে।
এই মামলার রায় ভবিষ্যতে শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, গোটা দেশের ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ার জন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে। ফলে রাজনৈতিক মহলের পাশাপাশি প্রশাসনিক স্তরেও এই মামলার দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখা হয়েছে।
রাজ্য রাজনীতি ও আসন্ন নির্বাচনের প্রভাব
SIR বিতর্ক এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন রাজ্যে আসন্ন নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক প্রস্তুতি তুঙ্গে। তৃণমূল কংগ্রেস এই ইস্যুকে গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার রক্ষার লড়াই হিসেবে তুলে ধরছে। অন্যদিকে বিরোধী দলগুলির বক্তব্য, ভোটার তালিকা শুদ্ধ করা হলে শাসকদলের আপত্তির কারণ নেই।
এই সংঘাত রাজ্যের রাজনৈতিক মেরুকরণ আরও তীব্র করতে পারে। গ্রাম থেকে শহর—ভোটার তালিকা নিয়ে উদ্বেগ ছড়ালে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে ভোটার উপস্থিতি ও নির্বাচনী ফলাফলে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভোটার তালিকা বিতর্ক যত বাড়বে, ততই নির্বাচনের আবহে অনিশ্চয়তা তৈরি হবে। আর সেই অনিশ্চয়তাই রাজনৈতিক দলগুলির কৌশল নির্ধারণে বড় ভূমিকা নেবে।
SIR ভোটার তালিকা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হওয়া মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সিদ্ধান্ত রাজ্য ও জাতীয় রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। এটি শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিরোধিতা নয়, বরং ভোটাধিকার ও সাংবিধানিক মূল্যবোধের প্রশ্নে এক উচ্চস্তরের আইনি লড়াই।
আদালতের রায় যে দিকেই যাক, এই মামলার প্রভাব পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী রাজনীতিতে দীর্ঘদিন অনুভূত হবে। ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্র বজায় রাখা—এই চ্যালেঞ্জের মুখেই দাঁড়িয়ে রয়েছে ভারতের গণতন্ত্র।






