উত্তরবঙ্গের রাজনীতির পারদ এখন তুঙ্গে। লোকসভা নির্বাচনের দামামা বাজার পর থেকেই শাসক-বিরোধী যুযুধান দুই পক্ষই ময়দানে নেমেছে। তবে এই রাজনৈতিক উত্তাপের মাঝেই প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষত এখনও টাটকা জলপাইগুড়ির বিস্তীর্ণ এলাকায়। গত কয়েক দিনের ঝড়ে তছনছ হয়ে যাওয়া জনজীবন স্বাভাবিক করতে এবার সরাসরি ময়দানে নামলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
নির্বাচনী প্রচারের মঞ্চ থেকে তিনি কেবলমাত্র রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আক্রমণই করলেন না, বরং মানবিকতার পরিচয় দিয়ে ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানোর কড়া বার্তা দিলেন। মুখ্যমন্ত্রী সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, নির্বাচনী বিধি চালু থাকলেও মানুষের দুর্দশা লাঘবে প্রশাসনের হাত গুটিয়ে বসে থাকার জো নেই। বিশেষ করে যাঁদের মাথা গোঁজার ঠাঁই টুকুও অবশিষ্ট নেই, তাঁদের জন্য বিশেষ ত্রাণের ব্যবস্থা করার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
উত্তরবঙ্গের এই সফর যেমন রাজনৈতিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই দুর্যোগ কবলিত মানুষের মনে আশার আলো জাগিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি করে দ্রুত ক্ষতিপূরণ প্রদানের কাজ শুরু হবে। নির্বাচনী কমিশনের কাছ থেকে বিশেষ অনুমতি নিয়ে হলেও গৃহহীনদের ঘর তৈরির জন্য আর্থিক সাহায্য পৌঁছে দেওয়া হবে বলে তাঁর দাবি।
নির্বাচনী আবহে মানবিক মমতা: ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় বিশেষ নজর
উত্তরবঙ্গের মানুষের সঙ্গে বরাবরই মুখ্যমন্ত্রীর এক আত্মিক টান রয়েছে। নির্বাচনী প্রচারের ব্যস্ত সূচি সামলেও তিনি পৌঁছে গিয়েছেন ময়নাগুড়ি ও সংলগ্ন গ্রামগুলোতে। সেখানে গিয়ে তিনি কেবল ভাষণ দেননি, বরং দুর্গতদের অভাব-অভিযোগ মন দিয়ে শুনেছেন। মুখ্যমন্ত্রী প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছেন যাতে কোনও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ সাহায্যের আওতা থেকে বাদ না পড়েন।

মুখ্যমন্ত্রীর এই সফর রাজনৈতিক মহলে যেমন চর্চার বিষয় হয়েছে, তেমনই সাধারণ মানুষও একে ইতিবাচকভাবে দেখছেন। প্রচারের মঞ্চ থেকে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “ভোট আসবে যাবে, কিন্তু মানুষের জীবন আগে। ঝড়ে যাঁদের ঘর ভেঙেছে, তাঁদের প্রতি আমরা সংবেদনশীল।” তিনি আরও জানান যে, আবাসন প্রকল্পের টাকা কেন্দ্র আটকে রাখলেও রাজ্য সরকার নিজের তহবিল থেকেই ঘর তৈরির অর্থ বরাদ্দ করার পথ খুঁজছে।
প্রশাসনের তৎপরতা ও ত্রাণ বিলি: মুখ্যমন্ত্রীর কড়া নির্দেশ
জলপাইগুড়ি জেলা প্রশাসনকে সতর্ক করে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, ত্রাণ বিলিতে যেন কোনও ধরনের স্বজনপোষণ বা রাজনীতি না হয়। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা যেন সঠিক সময়ে ত্রিপল, খাবার এবং আর্থিক অনুদান পান, তা নিশ্চিত করতে হবে। উত্তরবঙ্গের কৃষি ও চা শ্রমিকদের ওপর এই ঝড়ের প্রভাব ব্যাপক, তাই তাঁদের কর্মসংস্থানের বিষয়টি নিয়েও তিনি চিন্তিত।

বিকেল গড়াতেই যখন রাজনৈতিক জনসভা শুরু হয়, তখন তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে উন্নয়নের খতিয়ান। জলপাইগুড়ির এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে কীভাবে রাজ্য সরকার রাত জেগে মানুষের সেবা করেছে, তার বর্ণনা দেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, উদ্ধারকাজ থেকে শুরু করে অস্থায়ী শিবিরের ব্যবস্থা করা—প্রশাসন সবক্ষেত্রেই সফলভাবে কাজ করছে। তিনি আরও দাবি করেন, বিরোধীরা কেবল কুৎসা রটায়, কিন্তু বিপদের সময় মানুষের পাশে একমাত্র তৃণমূলই থাকে।
উত্তরবঙ্গের রাজনীতি ও উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি: আগামীর পথ
জলপাইগুড়ির এই বিপর্যয়কে কেন্দ্র করে বিরোধী দলগুলোও আসরে নেমেছে। তারা অভিযোগ তুলছে, ত্রাণ বিলিতে বৈষম্য করা হচ্ছে। তবে মুখ্যমন্ত্রী এই সমস্ত অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে তথ্যের ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, ডিজিটাল পেমেন্টের মাধ্যমে সরাসরি উপভোক্তাদের অ্যাকাউন্টে টাকা পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে যাতে মাঝপথে কোনও অনিয়ম না হয়।

নির্বাচনী এই যুদ্ধক্ষেত্রে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মাস্টারস্ট্রোক হল ‘ত্রাণ ও মমতা’। তিনি বুঝিয়ে দিতে চাইছেন, ভোট মানে কেবল বোতাম টেপা নয়, ভোট মানে দায়বদ্ধতা। উত্তরবঙ্গের চা বাগান অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে তিনি নতুন করে মজুরি বৃদ্ধির আশ্বাসও দিয়েছেন। কৃষকদের ফসল বিমার সুবিধা যাতে দ্রুত পাওয়া যায়, তার জন্য আলাদা পোর্টাল খোলার প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি।
পরিশেষে বলা যায়, নির্বাচনী লড়াই যতই তীব্র হোক না কেন, জলপাইগুড়ির আর্ত মানুষের কান্নাই এখন বড় ইস্যু। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিশেষ ত্রাণের আশ্বাস উত্তরবঙ্গের মানুষের মনে কিছুটা হলেও স্বস্তি এনেছে। প্রশাসনের তৎপরতা এবং মুখ্যমন্ত্রীর ব্যক্তিগত তদারকি নিশ্চিতভাবেই দুর্গতদের পুনর্বাসনে গতি আনবে। এখন দেখার বিষয়, নির্বাচনী ডামাডোলের মাঝে এই ত্রাণ প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছতার সঙ্গে সম্পন্ন হয়। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিপদের দিনে মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচনী লড়াইয়ে এক ধাপ এগিয়ে থাকলেন।






