ত্রিস্তরীয় ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া বা Special Intensive Revision (SIR) ঘিরে নির্বাচন কমিশনকে কেন্দ্র করে নতুন করে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, তৃণমূল কংগ্রেস সাংসদ মহুয়া মৈত্র দিল্লির পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানায় মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (CEC) জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ জমা দেন। অভিযোগে তিনি FIR দায়ের করে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
মহুয়া মৈত্রের অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে SIR-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত, ভোটার তালিকা ব্যবস্থাপনা, নির্বাচন কমিশনের IT ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ এবং ভোটার নিবন্ধনের Form 6-এ পরিবর্তনের বিষয়গুলি। তাঁর দাবি, কমিশনের দুই সদস্য—সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক যোশী—বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন। এই দাবি প্রকাশিত একটি সংবাদ প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তাঁর অভিযোগে উঠে এসেছে।
তবে বিষয়টি নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অবস্থান ভিন্ন। কমিশনের সূত্রের বক্তব্য, SIR-সহ নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তগুলি সর্বসম্মতভাবেই নেওয়া হয়েছে এবং কমিশনের অভ্যন্তরীণ নোট বা পর্যবেক্ষণকে স্বাভাবিক প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেখা উচিত। ফলে মহুয়া মৈত্রের অভিযোগ এবং কমিশনের বক্তব্য—দুই দিকই বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
অভিযোগ জমা দেওয়ার সময় মহুয়া FIR নথিভুক্ত করে তদন্ত শুরু করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা, গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং প্রাসঙ্গিক নথি ও প্রমাণ সংরক্ষণের আবেদন জানিয়েছেন। তবে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, অভিযোগ জমা দেওয়ার সময় পর্যন্ত পুলিশ FIR নথিভুক্ত করেনি।
SIR নিয়ে মহুয়া মৈত্রের অভিযোগ কী?

মহুয়া মৈত্রের অভিযোগে মূলত নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তিনি দাবি করেছেন, গত কয়েক মাসে ভোটার সংযোজন, নাম বাদ দেওয়া, পুনর্বহাল এবং ভোটার নিবন্ধন প্রক্রিয়া সংক্রান্ত একাধিক সিদ্ধান্তে দুই নির্বাচন কমিশনার আপত্তি জানিয়েছিলেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এমন আপত্তির সংখ্যা অন্তত ১৪টি।
এর পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনের কেন্দ্রীয় IT ব্যবস্থার ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তৃণমূল সাংসদ। তাঁর অভিযোগ, মাঠপর্যায়ের Electoral Registration Officer (ERO) এবং Booth Level Officer (BLO)-দের ভূমিকা পাশ কাটিয়ে ভোটার তালিকা সংক্রান্ত ব্যবস্থাপনায় কেন্দ্রীয় সফটওয়্যার ব্যবহারের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে।
Form 6 নিয়েও অভিযোগ করেছেন মহুয়া। নতুন ভোটার হিসেবে নাম নথিভুক্ত করার জন্য ব্যবহৃত এই ফর্মে SIR-সংক্রান্ত একটি অতিরিক্ত প্রশ্ন যুক্ত করার বিষয়টি তিনি প্রশ্নের মুখে এনেছেন। তাঁর দাবি, এমন পরিবর্তনের জন্য সংশ্লিষ্ট নিয়ম পরিবর্তনের প্রয়োজন ছিল। প্রকাশিত প্রতিবেদনে দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এই অভিযোগগুলিকে এখনও প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে দেখা যায় না। এগুলি মহুয়া মৈত্রের অভিযোগ ও তাঁর রাজনৈতিক-আইনি অবস্থান। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে পাল্টা বলা হয়েছে, কমিশনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তগুলি বৈধ প্রক্রিয়া মেনেই এবং সর্বসম্মতভাবে নেওয়া হয়েছে।
FIR-এর দাবি, আইনি সুরক্ষা নিয়েও প্রশ্ন

মহুয়া মৈত্র তাঁর অভিযোগে FIR নথিভুক্ত করে তদন্তের আবেদন জানিয়েছেন। তিনি চেয়েছেন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা নির্ধারণ করা হোক, দুই নির্বাচন কমিশনারসহ প্রয়োজনীয় সাক্ষীদের বক্তব্য নেওয়া হোক এবং তদন্তের স্বার্থে সংশ্লিষ্ট প্রমাণ সংরক্ষণ করা হোক।
এই অভিযোগের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনারদের আইনি সুরক্ষার প্রশ্নও সামনে এসেছে। মহুয়া মৈত্র নিজেই তাঁর অভিযোগে Chief Election Commissioner and Other Election Commissioners Act, 2023-এর Section 16-এর প্রসঙ্গ তুলেছেন। তাঁর বক্তব্য, সরকারি দায়িত্ব পালনের সঙ্গে যুক্ত আইনি সুরক্ষার পরিধি FIR নথিভুক্ত করা বা পুলিশের প্রাথমিক তদন্তের ক্ষেত্রে কীভাবে প্রযোজ্য হবে, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
অন্যদিকে, প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যাচ্ছে, পুলিশ অভিযোগ গ্রহণ করলেও FIR নথিভুক্ত করার বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে এগোয়নি। আনন্দবাজারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, থানার পক্ষ থেকে ২০২৩ সালের আইনের সুরক্ষার বিষয়টি মহুয়াকে জানানো হয়েছিল।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, অভিযোগ দায়ের হওয়া এবং FIR নথিভুক্ত হওয়া এক বিষয় নয়। FIR হলে তার ভিত্তিতে পুলিশি তদন্তের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে; আর অভিযোগ গ্রহণের পর FIR না-ও হতে পারে। এই মুহূর্তে মহুয়া মৈত্র FIR চাইলেও প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী পুলিশ এখনও FIR নথিভুক্ত করেনি।
নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য কী?

মহুয়া মৈত্রের অভিযোগের বিপরীতে নির্বাচন কমিশন সূত্রের বক্তব্য, SIR-সহ কমিশনের সিদ্ধান্তগুলি সর্বসম্মত ছিল। কমিশনের তরফে বলা হয়েছে, অভ্যন্তরীণ নোট, পর্যবেক্ষণ বা মতপার্থক্য থাকলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছিল।
এই অবস্থানটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ পুরো বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে নির্বাচন কমিশনের তিন সদস্যের মধ্যে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি। একদিকে রয়েছে দুই নির্বাচন কমিশনারের কথিত আপত্তির খবর; অন্যদিকে কমিশনের দাবি, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে কোনও ভিন্নমত ছিল না।
SIR-এর মতো বৃহৎ ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ায় ভোটার সংযোজন, নাম বাদ দেওয়া, পুনর্বহাল এবং ভোটার নিবন্ধনের নিয়ম নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক ও নাগরিক আগ্রহ থাকে। তাই কমিশনের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তার প্রভাব নির্বাচন ব্যবস্থার প্রতি জনআস্থার আলোচনাতেও পড়তে পারে।
তবে বর্তমানে প্রকাশ্যে থাকা তথ্যের ভিত্তিতে মহুয়া মৈত্রের অভিযোগকে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত বলে উল্লেখ করার সুযোগ নেই। FIR হবে কি না, তদন্ত শুরু হলে তার ফল কী দাঁড়াবে এবং নির্বাচন কমিশনের বক্তব্যের সঙ্গে অভিযোগের কতটা মিল বা অমিল রয়েছে—এসবই পরবর্তী আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপের উপর নির্ভর করবে।
SIR নিয়ে মহুয়া মৈত্রের এই অভিযোগ নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ, ভোটার তালিকা ব্যবস্থাপনা এবং CEC-এর আইনি সুরক্ষা—তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নকে একই আলোচনায় নিয়ে এসেছে। অভিযোগের পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনের পাল্টা বক্তব্যও সামনে রয়েছে।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ পরবর্তী পদক্ষেপ হবে পুলিশের অবস্থান এবং FIR সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত। পাশাপাশি, অভিযোগে উত্থাপিত ভোটার তালিকা, Form 6, IT ব্যবস্থাপনা এবং কমিশনের অভ্যন্তরীণ আপত্তি সংক্রান্ত বিষয়গুলি নিয়ে কোনও আনুষ্ঠানিক তদন্ত হলে তার ফলাফলই বিতর্কের পরবর্তী দিক নির্ধারণ করবে।






