শীতের শেষপ্রান্তে কলকাতার আকাশ আজ ঝকঝকে। সকালের হালকা ঠান্ডা, দুপুরে নরম রোদ—সব মিলিয়ে শহরের আবহাওয়া আপাতদৃষ্টিতে বেশ আরামদায়ক। ব্যস্ত রাস্তায় যানজট, অফিসপাড়ায় তৎপরতা, আর বিকেলের দিকে চায়ের দোকানে জমজমাট ভিড়—সবকিছুতেই যেন স্বস্তির ছোঁয়া।
তবে এই স্বস্তির ছবির আড়ালেই লুকিয়ে রয়েছে একটি বড় উদ্বেগ। আবহাওয়া মনোরম হলেও কলকাতার বায়ুগুণমান সূচক (AQI) এখনও ‘Poor’ বা খারাপ স্তরেই ঘোরাফেরা করছে। রোদেলা দিন ও পরিষ্কার আকাশ থাকা সত্ত্বেও বাতাসে ক্ষতিকর কণার মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বৈপরীত্য নতুন নয়। শীতের শেষে বা বসন্তের শুরুতে আকাশ পরিষ্কার থাকলেও যানবাহনের ধোঁয়া, নির্মাণকাজের ধুলো এবং স্থানীয় আবহাওয়াগত পরিস্থিতির কারণে বায়ুদূষণ দীর্ঘস্থায়ী হয়ে ওঠে। ফলে দিনের শেষে শহরবাসীর স্বাস্থ্যের ঝুঁকি থেকেই যায়।
আজকের কলকাতার আবহাওয়া তাই এক দ্বিমুখী বাস্তবতার ছবি তুলে ধরছে—একদিকে প্রশান্ত প্রকৃতি, অন্যদিকে নীরব পরিবেশগত সতর্কতা।
☀️ আজকের কলকাতার আবহাওয়া: রোদেলা আকাশ ও আরামদায়ক তাপমাত্রা

আজ কলকাতার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ঘোরাফেরা করছে ২৬ থেকে ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে। ভোর ও সকালের দিকে হালকা ঠান্ডা অনুভূত হলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আবহাওয়া হয়ে উঠছে বেশ আরামদায়ক। সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১৬–১৮ ডিগ্রির আশপাশে থাকায় গরম বা শীত—দুটোরই চরমভাব নেই।
এই ধরনের আবহাওয়া সাধারণত শহরবাসীর কাছে সবচেয়ে পছন্দের। সকালে হাঁটতে বেরোনো, পার্কে শরীরচর্চা কিংবা অফিসে যাওয়ার আগে হালকা রোদ পোহানো—সবই বেশ উপভোগ্য হয়ে ওঠে। পর্যটনপ্রেমীদের জন্যও এই সময়টি কলকাতা ঘোরার আদর্শ।
আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আপাতত বৃষ্টির সম্ভাবনা কম। আকাশ মূলত পরিষ্কার থাকবে এবং বাতাসের গতি মাঝারি মাত্রার। তবে রাতের দিকে হালকা শীতলতা টের পাওয়া যেতে পারে।
এই মনোরম আবহাওয়া যদিও দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে স্বস্তিদায়ক করে তুলছে, তবুও এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বায়ুদূষণের সমস্যাকে উপেক্ষা করা যাচ্ছে না।
🌫️ বায়ুদূষণের বাস্তবতা: কেন ‘Poor’ স্তরেই AQI?

আজকের AQI রিপোর্ট অনুযায়ী, কলকাতার বহু এলাকায় বায়ুগুণমান ‘Poor’ ক্যাটাগরিতে রয়েছে। অর্থাৎ বাতাসে সূক্ষ্ম কণিকা (PM2.5 ও PM10) স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর মাত্রায় উপস্থিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এর প্রধান কারণগুলির মধ্যে রয়েছে ক্রমবর্ধমান যানবাহন, পুরনো ডিজেল ইঞ্জিনের ব্যবহার এবং লাগাতার নির্মাণকাজ। শহরের বিভিন্ন প্রান্তে মেট্রো, ফ্লাইওভার ও আবাসন প্রকল্পের কাজ চলায় ধুলোর পরিমাণ বাড়ছে।
এছাড়াও শীতের শেষে বাতাসের উল্লম্ব চলাচল (vertical dispersion) তুলনামূলক কম থাকায় দূষিত কণাগুলি উপরের দিকে ছড়িয়ে যেতে পারছে না। ফলে আকাশ পরিষ্কার দেখালেও বাতাসের গুণমান খারাপ থেকে যাচ্ছে।
চিকিৎসকেরা সতর্ক করছেন, দীর্ঘদিন ধরে এই ধরনের AQI থাকলে শিশু, বয়স্ক এবং শ্বাসকষ্টে ভোগা মানুষদের বিশেষ সাবধানতা অবলম্বন করা জরুরি। চোখ জ্বালা, গলা খুসখুসে ভাব ও শ্বাস নিতে অস্বস্তি—এই উপসর্গগুলি ক্রমশ বাড়তে পারে।
🏙️ শহরবাসীর প্রভাব ও করণীয়: সতর্ক থাকাই এখন সবচেয়ে জরুরি

মনোরম আবহাওয়া অনেককেই বাইরে সময় কাটাতে উৎসাহিত করছে। তবে চিকিৎসক ও পরিবেশবিদরা বলছেন, এই সময়ে কিছু সতর্কতা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। বিশেষ করে সকালে ও রাতে, যখন দূষণের মাত্রা তুলনামূলক বেশি থাকে, তখন অপ্রয়োজনীয় বাইরে বেরোনো কমানো উচিত।
মাস্ক ব্যবহার, ঘরের ভেতরে এয়ার পিউরিফায়ার চালু রাখা এবং নিয়মিত জল পান করা—এই ছোট পদক্ষেপগুলি স্বাস্থ্যের ঝুঁকি অনেকটাই কমাতে পারে। যারা নিয়মিত হাঁটা বা জগিং করেন, তাদের জন্য দুপুরের পরের সময়টি তুলনামূলক নিরাপদ বলে মনে করা হচ্ছে।
দীর্ঘমেয়াদে অবশ্য সমস্যার সমাধান শুধু ব্যক্তিগত সতর্কতায় সম্ভব নয়। যানবাহনের নির্গমন নিয়ন্ত্রণ, সবুজায়ন বৃদ্ধি এবং নির্মাণকাজে ধুলো নিয়ন্ত্রণ—এই বিষয়গুলিতে প্রশাসনিক উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কলকাতার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরের ক্ষেত্রে উন্নয়ন ও পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখাই আগামী দিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
আজকের কলকাতার আবহাওয়া যেন দ্বৈত বার্তা বহন করছে। একদিকে ঝকঝকে রোদ ও আরামদায়ক তাপমাত্রা শহরবাসীকে স্বস্তি দিচ্ছে, অন্যদিকে স্থায়ীভাবে খারাপ বায়ুগুণমান নীরব সতর্ক সংকেত পাঠাচ্ছে।
এই মুহূর্তে প্রয়োজন সচেতনতা ও দায়িত্বশীল আচরণ। ব্যক্তিগত স্তরে সতর্কতা যেমন জরুরি, তেমনই দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য নীতিগত উদ্যোগও অপরিহার্য। তবেই ভবিষ্যতে কলকাতার রোদেলা আকাশ সত্যিকারের নির্মল বাতাসের প্রতিশ্রুতি দিতে পারবে।






