নতুন বছরের শুরুতেই উদ্বেগ বাড়াল কলকাতার বাতাস। জানুয়ারি মাসে PM2.5-এর গড় মাত্রা অনুমোদিত সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ায় ভারতের দূষিত রাজধানী শহরগুলির তালিকায় তৃতীয় স্থানে উঠে এসেছে কলকাতা। শীতকালীন আবহাওয়া, যানবাহনের নির্গমন, নির্মাণকাজের ধুলো—সব মিলিয়ে মহানগরের বায়ু মান আবারও প্রশ্নের মুখে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, এই সূক্ষ্ম কণার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব শিশু, প্রবীণ এবং শ্বাসকষ্টে ভোগা মানুষের জন্য বিশেষভাবে ক্ষতিকর। জানুয়ারিতে বায়ু স্থবিরতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দূষণ আটকে পড়ছে শহরের উপরেই—ফলে পরিস্থিতি দ্রুত খারাপের দিকে যাচ্ছে।
দূষণ শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়, এটি অর্থনীতি ও জীবনের গুণমানের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। স্কুলে অনুপস্থিতি, কর্মক্ষমতা হ্রাস, হাসপাতালের ভিড়—সবই বাড়ছে দূষণের প্রত্যক্ষ প্রভাবে। প্রশ্ন উঠছে, নগর পরিচালনা ও নীতিনির্ধারণে আমরা কি এখনও যথেষ্ট দ্রুত ও কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছি?
এই প্রেক্ষাপটে কলকাতার অবস্থান শুধু একটি র্যাঙ্কিং নয়—এটি একটি সতর্কবার্তা। এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে, বলছেন পরিবেশবিদরা।
জানুয়ারিতে কলকাতার PM2.5 কেন এতটা বেড়েছে

শীতকালে উত্তর ভারতের মতো কলকাতাতেও তাপমাত্রা কমলে বায়ুস্তর স্থবির হয়ে পড়ে। এর ফলে যানবাহন, ডিজেল জেনারেটর, ইটভাটা ও নির্মাণস্থল থেকে নির্গত সূক্ষ্ম কণা উপরের দিকে ছড়াতে পারে না। জানুয়ারিতে এই প্রভাব সবচেয়ে তীব্র হয়।
কলকাতায় যানবাহনের ঘনত্ব বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। পুরনো ডিজেল বাস ও ট্রাকের নির্গমন এখনও বড় সমস্যা। পাশাপাশি মেট্রো ও রাস্তা সম্প্রসারণের কাজ চলায় ধুলো নিয়ন্ত্রণে ঘাটতি থাকলে PM2.5 দ্রুত বেড়ে যায়।
আরেকটি বড় কারণ হলো পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের জ্বালানি পোড়ানো। শীতকালে ঘরোয়া আগুন, আবর্জনা পোড়ানো এবং শিল্পাঞ্চল থেকে আসা দূষণ বাতাসে মিশে শহরের উপর আটকে থাকে। বৃষ্টিপাত কম থাকায় প্রাকৃতিকভাবে বাতাস পরিষ্কার হওয়ার সুযোগও কমে যায়।
এই সব মিলিয়ে জানুয়ারিতে কলকাতার বায়ু মান ধারাবাহিকভাবে ‘খারাপ’ থেকে ‘অত্যন্ত খারাপ’ স্তরে পৌঁছেছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য স্পষ্ট হুমকি।
ভারতের অন্য রাজধানী শহরের তুলনায় কলকাতার অবস্থান
দীর্ঘদিন ধরেই দিল্লি দূষণের প্রতীক হিসেবে পরিচিত। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অন্য রাজধানী শহরগুলিও দ্রুত সেই তালিকায় উঠে আসছে। জানুয়ারিতে PM2.5 মাত্রার ভিত্তিতে কলকাতা তৃতীয় স্থানে থাকা মানে, সমস্যাটি আর আঞ্চলিক নয়—এটি জাতীয় নগর সংকট।
কলকাতার ক্ষেত্রে একটি বড় পার্থক্য হলো আর্দ্রতা। বেশি আর্দ্রতা থাকলে দূষণ কণা ভারী হয়ে নিচে নেমে আসে, যা শ্বাস নেওয়ার সময় ফুসফুসে ঢোকার ঝুঁকি বাড়ায়। ফলে তুলনামূলক কম দৃশ্যমান ধোঁয়া থাকলেও স্বাস্থ্যঝুঁকি সমান বা বেশি হতে পারে।
অন্যদিকে, কিছু রাজধানী শহর শীতে সাময়িক দূষণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জোরদার করলেও কলকাতায় সেই উদ্যোগ এখনও খণ্ডিত। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, নির্মাণস্থলের নজরদারি এবং আবর্জনা পোড়ানো রোধ—এই তিন ক্ষেত্রেই বাস্তবায়নের ঘাটতি স্পষ্ট।
এই তুলনা দেখিয়ে দেয়, কলকাতাকে শুধু দিল্লির সঙ্গে তুলনা করলেই হবে না; বরং নিজের নগর বাস্তবতায় দ্রুত সমাধান খুঁজতে হবে।
স্বাস্থ্যঝুঁকি ও নাগরিক জীবনে দূষণের প্রভাব
PM2.5 কণা এতটাই সূক্ষ্ম যে এটি নাক ও গলার প্রাকৃতিক প্রতিরোধ ভেদ করে সরাসরি ফুসফুসে প্রবেশ করতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাবে হাঁপানি, ব্রঙ্কাইটিস, হৃদরোগ এমনকি স্ট্রোকের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
শহরের হাসপাতালগুলো জানুয়ারিতে শ্বাসকষ্ট ও অ্যালার্জি সংক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ার কথা জানাচ্ছে। শিশুদের স্কুলে উপস্থিতি কমছে, খেলাধুলা সীমিত হচ্ছে—যা তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের উপর প্রভাব ফেলছে।
দূষণের অর্থনৈতিক প্রভাবও কম নয়। কর্মক্ষমতা হ্রাস, চিকিৎসা খরচ বৃদ্ধি এবং উৎপাদনশীল সময় নষ্ট—সব মিলিয়ে শহরের সামগ্রিক ক্ষতি হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বায়ু মান উন্নত না হলে দীর্ঘমেয়াদে নগর অর্থনীতির উপর চাপ আরও বাড়বে।
এই পরিস্থিতিতে নাগরিক সচেতনতা যেমন জরুরি, তেমনই প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের গতি ও কঠোরতা সমানভাবে প্রয়োজন।
জানুয়ারিতে PM2.5 সীমা ছাড়ানো কলকাতার জন্য স্পষ্ট সতর্কবার্তা। ভারতের তৃতীয় সর্বাধিক দূষিত রাজধানী শহর হিসেবে অবস্থান মানে, সমস্যাটি আর উপেক্ষা করার নয়। শীতকালীন বায়ু স্থবিরতা, যানবাহন ও নির্মাণজনিত দূষণ—সবকিছুর সমন্বিত মোকাবিলা এখন সময়ের দাবি।
নাগরিক আচরণ, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং কঠোর নীতিনির্ধারণ—এই তিনের সমন্বয় ছাড়া বায়ু মান উন্নত করা সম্ভব নয়। এখনই পদক্ষেপ না নিলে আগামী শীতগুলো আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। কলকাতার বাতাস বাঁচানো মানে শহরের ভবিষ্যৎ বাঁচানো।





